ডান্ডির ঐতিহ্য থেকে শিক্ষা
নারায়ণগঞ্জে কন্টেইনার পোর্ট, নাকি ঐতিহাসিক বন্দর-পরিচয়ের পুনর্জাগরণ?
মোস্তফা করিম
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৪ পিএম
স্কটল্যান্ডের ঐতিহাসিক বন্দরনগরী ডান্ডি একসময় বিশ্বে পরিচিত ছিল ‘Jute, Jam and Journalism’—অর্থাৎ পাট, ফলের জ্যাম ও সাংবাদিকতার নগরী হিসেবে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ডান্ডির এই তিন শিল্পের বিকাশ বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ১৮৫০-এর দশক থেকে বাংলার কাঁচা পাটকে কেন্দ্র করে ডান্ডিতে পাটশিল্পের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। অন্যদিকে, অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে কিলার পরিবারের মার্মালেড বা ফলের জ্যাম উৎপাদন এবং বিশ শতকের শুরুতে সংবাদপত্র ও প্রকাশনা শিল্পের বিকাশ ডান্ডির এই স্বতন্ত্র পরিচয়কে আরও প্রতিষ্ঠিত করে। যদিও ‘Jute, Jam and Journalism’ কথাটির প্রথম প্রচলনের নির্দিষ্ট সাল নিশ্চিত নয়, উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুর দিকে এটি ডান্ডির ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের সঙ্গেও এই ঐতিহাসিক পরিচয়ের বিস্ময়কর মিল রয়েছে। পাটবাণিজ্যের আন্তর্জাতিক গুরুত্বের কারণে একসময় নারায়ণগঞ্জ পরিচিতি পেয়েছিল ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ হিসেবে। তবে ডান্ডি ও নারায়ণগঞ্জের ‘Jam’-এর মধ্যে একটি মজার অথচ তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ডান্ডির Jam ছিল ফলের জ্যাম—যা খাদ্যশিল্প, উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতীক। আর নারায়ণগঞ্জের Jam বলতে এখন অনেকটা বোঝায় ভয়াবহ যানজট! একসময় যে নগর পাটবাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিশ্বপরিচিতি পেয়েছিল, সেই নগরের মানুষ আজ সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে নগরজীবনের গতি হারাচ্ছে। ডান্ডির জ্যাম ছিল অর্থনীতির মিষ্টি স্বাদ, আর নারায়ণগঞ্জের জ্যাম যেন নাগরিক জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা। এই বৈপরীত্য নিছক শব্দের খেলা নয়; এটি নারায়ণগঞ্জের অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও পরিবহন ব্যবস্থার সংকটেরও প্রতিচ্ছবি।
ডান্ডির ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—শিল্প ও বাণিজ্যের বিকাশের সঙ্গে বন্দরের আধুনিকায়ন জরুরি। তবে সেই আধুনিকায়নের নামে নগরের ঐতিহাসিক পরিচয়, নদী ও পরিবেশগত ভারসাম্য বিসর্জন দেওয়া সমীচীন নয়।
এই প্রেক্ষাপটে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী নারায়ণগঞ্জের বরফকল এলাকায় প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। প্রশ্ন হচ্ছে, ঐতিহাসিক বন্দরনগরী নারায়ণগঞ্জের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিকাশে এই প্রকল্প কতটা যৌক্তিক? কন্টেইনার পরিবহনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রকল্পের অবস্থান, নদীর নাব্যতা, নৌযান চলাচল, পরিবেশ, নগরবাসীর জীবনযাত্রা এবং ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার ওপর এর প্রভাব অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।
অনেকে আশঙ্কা করছেন, ৪০ ফুট দীর্ঘ কন্টেইনারবাহী যানবাহন নারায়ণগঞ্জ শহরের সড়ক দিয়ে চলাচল করলে গোটা নগরী যানজটে স্থবির হয়ে পড়বে। তাঁদের এই আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়। কারণ, যে নগর ইতোমধ্যেই ভয়াবহ যানজটের ভারে ন্যুব্জ, সেখানে ভারী কন্টেইনারবাহী যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, এই সমস্যার সমাধানে চলমান রেল অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি কেন যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না? ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথে ডাবল ট্র্যাক নির্মাণ ও রেল যোগাযোগের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ রয়েছে। কন্টেইনার পরিবহনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রেলপথে স্থানান্তর করা গেলে সড়কের ওপর চাপ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তবে এ জন্য টার্মিনালের সঙ্গে সরাসরি রেল সংযোগ, পর্যাপ্ত লোডিং-আনলোডিং সুবিধা এবং কার্যকর মাল্টিমোডাল পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ডাবল ট্র্যাক নির্মাণ হলেই কন্টেইনার পরিবহনের সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়।
ডান্ডি তার পুরোনো পাটশিল্প হারালেও বন্দরকে বিলুপ্ত করেনি; বরং আধুনিক বাণিজ্য, সামুদ্রিক কার্যক্রম ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সঙ্গে যুক্ত করেছে। নারায়ণগঞ্জও পারে তার ঐতিহাসিক নদীবন্দরকে আধুনিকায়ন করতে। তবে প্রশ্ন হলো, সেই আধুনিকায়ন কি ঘনবসতিপূর্ণ নগরের গুরুত্বপূর্ণ নদীতীরকে কেন্দ্র করে কন্টেইনারের ভারী পরিবহনকেন্দ্র গড়ে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি নগরের ঐতিহাসিক বন্দর-পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হবে?
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশন, পৌরসভা এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ও বন্দরসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই নগরীর বাণিজ্যিক ও পরিবহন কার্যক্রমের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি ও অবকাঠামো নির্ধারিত ছিল। কিন্তু দেড় শতাব্দীরও বেশি সময়ের নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত সম্প্রসারণের ধারায় রেলওয়ে, বন্দর ও সরকারের বহু খাসজমি অবৈধ দখলে চলে গেছে। ফলে একসময় পরিকল্পিত বন্দরনগরীর জন্য সংরক্ষিত অনেক জায়গায় গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিত ও আইনগত জটিলতাপূর্ণ নগর বসতি।
অর্থাৎ বিষয়টি শুধু এই নয় যে বন্দর নগরের জায়গা দখল করছে; বরং ঐতিহাসিকভাবে বন্দর ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য সংরক্ষিত জায়গার বড় একটি অংশ নগর সম্প্রসারণের চাপে বেদখল হয়ে গেছে। তাই সরকারকে সংশ্লিষ্ট জমির প্রকৃত মালিকানা, রেকর্ড, সীমানা ও বর্তমান দখলদারত্ব যাচাই করে পর্যায়ক্রমে অবৈধ দখলমুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বন্দর ও রেলওয়ের নিজস্ব জমি উদ্ধার এবং সেগুলোর পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও অনেক ক্ষেত্রে কমতে পারে।
নারায়ণগঞ্জকে শুধু কন্টেইনার পরিবহনের একটি কেন্দ্র হিসেবে দেখলে চলবে না। এর রয়েছে পাটবাণিজ্য, শিল্প, নদীপথ, সংবাদপত্র ও নাগরিক সংস্কৃতির দীর্ঘ ঐতিহ্য। ডান্ডির ‘Jute, Jam and Journalism’ পরিচয় আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি নগরের প্রকৃত শক্তি তার বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে। তবে ডান্ডির ফলের জ্যামের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের যানজটের এই পার্থক্য আমাদের আরেকটি বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়—শুধু ঐতিহ্য ধরে রাখলেই হবে না, নগরকে বাসযোগ্য রাখার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। যে নগর একসময় বাণিজ্যের গতিতে এগিয়ে যেত, তাকে আজ যানজটের স্থবিরতা থেকে মুক্ত করাও উন্নয়নের অন্যতম শর্ত।
অতএব, নারায়ণগঞ্জে কন্টেইনার পোর্ট নির্মাণের যৌক্তিকতা নির্ধারণে শুধু বিনিয়োগ ও পণ্য পরিবহনের হিসাব যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, বিকল্প স্থান যাচাই, রেল ও নৌপথের সমন্বিত ব্যবহার, রাষ্ট্রীয় জমি উদ্ধার এবং নাগরিক অংশগ্রহণ। প্রয়োজনে বরফকল এলাকার প্রকল্পের পাশাপাশি শহরের বাইরে উপযুক্ত নদীতীরবর্তী স্থানে কন্টেইনার টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাবনাও তুলনামূলকভাবে যাচাই করতে হবে।
উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন নারায়ণগঞ্জের ঐতিহাসিক বন্দর-পরিচয়, নদী, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ নগরজীবনের জন্য নতুন সংকট তৈরি না করে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি আধুনিক বন্দরনগরী গড়ে তোলা, যেখানে শিল্প, বাণিজ্য, যোগাযোগ, পরিবেশ ও নাগরিক ঐতিহ্য পরস্পরের পরিপূরক হবে। একই সঙ্গে ডান্ডির মতো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতীকী ‘Jam’-এর স্বপ্ন দেখতে হবে, নারায়ণগঞ্জের বর্তমান যানজটের ‘Jam’ থেকে মুক্তির পথও খুঁজতে হবে।
আমাদের দাবি—বন্দর চাই, আধুনিকায়ন চাই, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির দখলমুক্তি চাই; কিন্তু ঐতিহ্য, নদী ও নগরবাসীর স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নয়।



