Logo
Logo
×

মতামত

ভবিষ্যতের জন্য আপনার কবজি সুস্থ রাখবেন যেভাবে

Icon

ডেভিড কক্স

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম

ভবিষ্যতের জন্য আপনার কবজি সুস্থ রাখবেন যেভাবে

কবজিকে নিয়ে আমরা সাধারণত তখনই ভাবি, যখন সেখানে ব্যথা শুরু হয়। অথচ প্রতিদিন টাইপ করা, লেখালেখি, ফোন ধরা, কাপ তোলা কিংবা খেলাধুলার মতো অসংখ্য কাজে নীরবে চাপ নিতে থাকে কবজি। 

অল্প বয়সে পাওয়া একটি চোটও হয়তো সেরে গেছে বলে মনে হতে পারে, কিন্তু তার প্রভাব থেকে যেতে পারে বছরের পর বছর। এমনকি দুই দশক পরও দেখা দিতে পারে আর্থ্রাইটিসের মতো জটিলতা। 

তাই বয়স বাড়ার অপেক্ষা না করে এখন থেকেই কবজির যত্ন নেওয়া জরুরি। সহজ কিছু ব্যায়াম ও অভ্যাস কীভাবে ভবিষ্যতে কবজিকে সুস্থ রাখতে পারে, জেনে নিন।

কবজি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

আমাদের কবজি অবিশ্বাস্য রকমের কার্যক্ষম। ভারী জিনিস তোলার মতো শক্তি, র‌্যাকেট খেলায় দ্রুতগতির বল সামলানোর মতো নমনীয়তা এবং ছবি আঁকার মতো সূক্ষ্ম কাজ করার প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ—সবই কবজির মাধ্যমে সম্ভব

টাইপ করা থেকে শুরু করে এক কাপ কফি ধরে রাখা—প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনে সচল ও সুস্থ কবজির গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ কবজি সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ধারণার চেয়েও অনেক আগে থেকেই এর যত্ন নেওয়া শুরু করা উচিত।

একজন টেনিস খেলোয়াড়ের অভিজ্ঞতাই এর উদাহরণ। ১৮ বছর বয়সে প্রতিযোগিতামূলক টেনিস খেলার সময় তার কবজিতে প্রথমে হালকা ব্যথা শুরু হয়। এক গ্রীষ্মের মধ্যেই সেই ব্যথা দ্রুত বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, টেনিস বল মারলেই কিংবা এমনকি দরজা খোলার চেষ্টা করলেও বাঁ হাতজুড়ে তীব্র যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ত।

সেই সময় পাওয়া চোটটি পরবর্তী বহু বছর তাকে ভুগিয়েছে। প্রায় দুই দশক পরও পুরোনো ওই চোট ভবিষ্যতে কবজিতে আর্থ্রাইটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। মধ্য ও পরবর্তী বয়সে এ ধরনের সমস্যা আশ্চর্যজনকভাবে সাধারণ।

কবজির ভেতরের জটিল কাঠামো

আমরা সাধারণত কবজিকে একটি মাত্র জোড় হিসেবে ভাবি। কিন্তু বাস্তবে এটি অত্যন্ত জটিল একটি কাঠামো, যেখানে একাধিক ছোট ছোট জোড় রয়েছে। কবজির এই কাঠামো তৈরি হয়েছে আটটি ছোট হাড়, যেগুলোকে কার্পাল হাড় বলা হয়, বাহুর দুটি লম্বা হাড় এবং হাতের তালুর ভেতরে থাকা পাঁচটি মেটাকার্পাল হাড়ের গোড়া দিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার সহকারী অধ্যাপক অ্যান্ড্রু আবাদি জানান, কবজির প্রতিটি লিগামেন্ট ও হাড় এবং বাহুর হাড়গুলোর সঙ্গে তাদের সংযোগ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। সেই ভারসাম্য নষ্ট হলেই কবজিতে আর্থ্রাইটিসের সমস্যা তৈরি হতে পারে।

চোটের সঙ্গে বয়স বাড়ার স্বাভাবিক প্রভাব যুক্ত হলে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।

কবজিকে সুস্থ রাখার অন্যতম বড় কারণ হলো আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি কমানো। কবজিতে বিভিন্ন ধরনের আর্থ্রাইটিস হতে পারে। এর মধ্যে সাধারণত তিনটি ধরন বেশি দেখা যায়—রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিস এবং আঘাতজনিত আর্থ্রাইটিস।

শেষের দুটি ক্ষেত্রে কবজির ছোট ছোট হাড়ের মধ্যকার কার্টিলেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় অথবা হাড়গুলোর স্বাভাবিক অবস্থান নষ্ট হয়ে যায়। কবজির লিগামেন্ট ও হাড়ে পুরোনো আঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কিংবা একই ধরনের হাতের কাজ বারবার করার কারণে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ—দুটিই এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কবজি পুনর্বাসনবিষয়ক গবেষক সারা লারসন বলেন, এ ধরনের ক্ষতি খুব সাধারণ কোনো পুনরাবৃত্তিমূলক মোচড়ের আন্দোলন থেকেও হতে পারে। আবার হাত সামনে বাড়িয়ে পড়ে গিয়ে কবজিতে আঘাত পেলেও এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তার ভাষায়, অনেক মানুষকে তিনি দেখেছেন যারা অল্প বয়সে কবজিতে চোট পেয়েছিলেন। পরে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ২০ বছর পর সেই পুরোনো আঘাতের কারণে নতুন করে সমস্যা দেখা দিয়েছে।

অনুমান করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি সাতজনের মধ্যে একজনের কবজিতে আর্থ্রাইটিস হতে পারে। এটি শুধু তীব্র ব্যথাই সৃষ্টি করে না, বরং পোশাক পরা কিংবা নিজের খাবার নিজে কাটার মতো দৈনন্দিন কাজও কঠিন করে দিতে পারে। দীর্ঘদিনের এই শারীরিক সমস্যার মানসিক চাপ বিষণ্নতার সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে।

আবাদির কবজিকে শরীরের একটি ‘সেন্টিনেল জয়েন্ট’ বা সতর্ক সংকেতদাতা জোড় হিসেবে বর্ণনা করেন। অর্থাৎ শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অবনতির কিছু প্রাথমিক লক্ষণও কবজির মাধ্যমে বোঝা যেতে পারে।

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত প্রায় অর্ধেক রোগীর ক্ষেত্রে শরীরের অন্য জোড়ে ছড়িয়ে পড়ার আগে কবজিতে এর লক্ষণ দেখা দিতে পারে। আবার মস্তিষ্কের কর্টেক্সের একটি বড় অংশ হাত, কবজি ও আঙুলের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে হাতের মুঠির শক্তি মস্তিষ্কের গঠন ও জ্ঞানীয় স্বাস্থ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে।

যারা ষাটের কোঠায় পৌঁছেও তুলনামূলক শক্তিশালী কবজি ধরে রাখতে পারেন—সাধারণত মুঠির শক্তি দিয়ে যা পরিমাপ করা হয়—তাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যও ভালো থাকার প্রবণতা দেখা যায়। তারা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া, পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙা কিংবা অস্টিওপোরোসিসের মতো হাড় দুর্বল করে দেওয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে তুলনামূলক কম থাকেন। এমনকি বেশি বয়সেও তাদের অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা কম।

এখন থেকেই প্রস্তুতি

কবজির যত্ন নেওয়ার আগে খাদ্যাভ্যাসের দিকেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নিউইয়র্কের আইকান স্কুল অব মেডিসিন অ্যাট মাউন্ট সিনাইয়ের অর্থোপেডিক সার্জন জাহেওন কিম।

ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজসমৃদ্ধ খাবার—যেমন ছোট কাঁটাযুক্ত মাছ, বিশেষ করে সার্ডিন এবং দুগ্ধজাত খাবার—অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।

শরীরের ওজনকে কবজির স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত মনে না হলেও অতিরিক্ত শরীরের চর্বি কমানো কবজির জোড়ের সামগ্রিক চলন ও ভারসাম্য উন্নত করতে পারে।

তবে লারসনের মতে, কবজির সমস্যা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো বাড়িতে নিয়মিত কিছু সহজ ব্যায়াম করা। এতে কবজি আরও শক্ত ও সহনশীল হয়ে উঠতে পারে এবং ভবিষ্যতের সমস্যা ঠেকাতে সাহায্য করতে পারে।

তিনি নিচের প্রতিটি ব্যায়াম ১০ বার করে তিন সেট, সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন করার পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ ১০ বার করার পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার ১০ বার এবং এরপর আরও একবার ১০ বার করতে হবে।

তবে আগে থেকে কোনো শারীরিক সমস্যা বা চোট থাকলে নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ব্যায়াম করার সময় কোনো ব্যথা অনুভূত হলে সঙ্গে সঙ্গে থেমে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

১. কাঁধের পেশি শক্ত করুন

কাঁধের প্রধান পেশিগুলোকে ডেলটয়েড বলা হয়। কাঁধের সঙ্গে কবজির সম্পর্ক সরাসরি মনে না হলেও লারসনের মতে, পুরো হাতের পেশিগুলো একসঙ্গে কাজ করে। তাই হাতের ওপরের অংশ শক্তিশালী হলে কবজির ওপর চাপও কমে।

লারসন বলেন, আমরা শুধু হাত ব্যবহার করি না, পুরো বাহুই ব্যবহার করি। কাঁধ দুর্বল হলে কবজির ওপর বেশি চাপ পড়ে। কিন্তু কাঁধ শক্তিশালী হলে তা কবজিকে সুরক্ষা দেয় এবং তার ওপরের চাপ কমায়।

কাঁধের পেশি শক্ত করার সহজ একটি উপায় হলো দুই হাত শরীরের দুই পাশে ছড়িয়ে দাঁড়ানো। হাত সোজা রাখতে পারেন, আবার সামান্য বাঁকিয়েও রাখতে পারেন। এবার ধীরে ধীরে দুই হাত মাথার ওপরের দিকে তুলুন এবং একইভাবে ধীরে ধীরে নিচে নামিয়ে আনুন। এভাবে ১০ বার করুন।

২. মুঠির শক্তি বাড়ান

মুঠির শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম কবজির স্থিতিশীলতা উন্নত করতে পারে। এতে বাহুর ভেতরের ফ্লেক্সর ও এক্সটেনসর নামের পেশিগুলো শক্তিশালী হয়। এসব পেশি কবজির দুই পাশ দিয়ে আঙুলের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং কোনো কিছু শক্ত করে ধরতে সাহায্য করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের ব্যায়াম আগে থেকেই কবজিতে ব্যথা থাকা ব্যক্তিদেরও উপকার করতে পারে।

আবাদিরের মতে, বাহুর সব পেশি কবজির দুই পাশ দিয়ে হাতের সঙ্গে একটি পুলি-ব্যবস্থার মতো সংযুক্ত।

এ ব্যায়ামের জন্য হ্যান্ড থেরাপি বল বা থেরাপিউটিক পুটি ব্যবহার করা ভালো। তবে টেনিস বলও ব্যবহার করা যেতে পারে।

বল বা পুটি হাতের তালুতে রেখে ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড যতটা সম্ভব শক্ত করে চেপে ধরুন। এরপর হাত ছেড়ে ৫ সেকেন্ড বিশ্রাম নিন। আবার একইভাবে চেপে ধরুন। প্রতিটি হাতে ১০ বার করুন।

৩. কবজিতে ধীরে ধীরে চাপ ও নমনীয়তা বাড়ান

কবজির জোড় ও টেনডনের ওপর চাপ কমানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো হালকা ওজন বা প্রতিরোধ ব্যবহার করে কবজি ভাঁজ ও সোজা করার ব্যায়াম।

এতে কবজির হাড়ও শক্ত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে ‘ডিসইউজ অস্টিওপেনিয়া’ প্রতিরোধে, যেখানে দীর্ঘদিন ব্যবহার না করার কারণে হাড় দুর্বল হয়ে যায়।

আবাদির বলেন, হাড়ের ওপর নিয়মিত চাপ পড়লে তা শক্তিশালী হতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে নতুনভাবে গঠিত হয়।

এ ব্যায়ামের জন্য একটি চেয়ারে বা টেবিলের পাশে বসুন। টেবিলের ওপর বাহু রাখুন এবং হাতের কবজি টেবিলের কিনারার বাইরে ঝুলিয়ে রাখুন। হাতে প্রায় ৩ থেকে ৭ কেজি ওজন নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ফ্লেক্সন: হাতের তালু ওপরের দিকে রেখে কবজি শরীরের দিকে ভাঁজ করুন। এরপর ধীরে ধীরে নিচে নামিয়ে আনুন।

এক্সটেনশন: এবার হাতের তালু নিচের দিকে রেখে হাতটি ওপরের দিকে তুলুন এবং আবার ধীরে ধীরে নামিয়ে আনুন।

ওজন না থাকলে রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড ব্যবহার করা যেতে পারে। ব্যান্ডের এক প্রান্ত টেবিলের পায়ের নিচে আটকে অন্য প্রান্ত কবজির ওপর ধরে ব্যায়াম করতে হবে।

ফ্লেক্সন ও এক্সটেনশন—দুটিই ১০ বার করে করুন।

কিমের মতে, যারা দীর্ঘ সময় টাইপ করেন বা লেখালেখি করেন, তাদের কবজির জোড়ের জন্য এই ব্যায়াম বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে।

৪. কবজি ঘোরানোর ব্যায়াম করুন

সবশেষে রয়েছে কবজি ঘোরানোর দুটি গুরুত্বপূর্ণ নড়াচড়া—সুপিনেশন ও প্রোনেশন। এগুলো কবজির নড়াচড়ার পরিসর এবং সামগ্রিক কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

ফ্লেক্সন ও এক্সটেনশনের মতো এই ব্যায়ামও টেবিলের ওপর হাত রেখে হালকা ওজন বা রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড ব্যবহার করে করা যায়।

টেবিলের কিনারার ওপর হাত রাখুন এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি ওপরের দিকে রাখুন। এবার ধীরে ধীরে কবজি ঘুরিয়ে হাতের তালু নিচের দিকে করুন। এরপর আবার আগের অবস্থানে ফিরুন। এবার বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে হাতের তালু ওপরের দিকে আনুন।

এভাবে ১০ বার করুন।

কবজিকে সুস্থ রাখতে তাই শুধু ব্যথা শুরু হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রতিদিনের কাজের চাপ, পুরোনো আঘাত এবং বয়স বাড়ার প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে অল্প বয়স থেকেই কবজির শক্তি ও নমনীয়তা ধরে রাখার চেষ্টা করা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

সূত্র: বিবিসি

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন