Logo
Logo
×

মতামত

র‌্যাব থেকে এসআরবি: নাম বদল, নাকি সত্যিকারের সংস্কার?

Icon

মাহাফুজ কাজী রিজু

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩২ পিএম

র‌্যাব থেকে এসআরবি: নাম বদল, নাকি সত্যিকারের সংস্কার?

মাহাফুজ কাজী রিজু, শিক্ষার্থী,ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি

র‌্যাব —বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় একটি পরিচিত ও শক্তিশালী নাম। সন্ত্রাস, মাদক, অস্ত্র, মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে এই বাহিনীর ভূমিকা যেমন অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তেমনি গত দুই দশকে বাহিনীটিকে ঘিরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও বারবার আলোচনায় এসেছে।

সেই প্রেক্ষাপটে র্যা ব বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি নামে নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের প্রস্তাব নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় সংস্কার উদ্যোগ।

তবে একজন আইন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই একটি নতুন বাহিনী তৈরি করছি, নাকি পুরোনো বাহিনীকে নতুন একটি নাম ও নতুন আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসছি?

প্রস্তাবিত ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় র্যা বের পরিবর্তে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তল্লাশি, জব্দ, গ্রেপ্তার ও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অপরাধ তদন্তের ক্ষমতাও নতুন বাহিনীকে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। নাগরিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি অভিযোগ প্রতিকার কমিটি এবং সদস্যদের জন্য বিস্তারিত শৃঙ্খলা বিধানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

প্রথম দেখায় এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন মনে হতে পারে। কিন্তু একজন আইন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার প্রশ্ন একটু ভিন্ন—আমরা কি সত্যিই একটি নতুন বাহিনী তৈরি করছি, নাকি পুরোনো বাহিনীকে নতুন একটি নাম ও নতুন আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসছি?

খসড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, র্যা বের জনবল, সম্পদ, তহবিল, দায়-দায়িত্ব, চলমান মামলা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম এসআরবির অধীনে স্থানান্তরের প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির ধারাবাহিকতা অনেকাংশেই বজায় থাকছে। এমনকি অভিযান পরিচালনা, গ্রেপ্তার, তল্লাশি ও তদন্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার বড় অংশও বহাল থাকছে।

এখানেই আমার মূল উদ্বেগ। সংস্কার মানে শুধু নাম পরিবর্তন নয়।

একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে সংস্কার করতে হলে তার নাম, পোশাক বা সাংগঠনিক কাঠামোর পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তার ক্ষমতার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, স্বাধীন জবাবদিহি এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নিশ্চিত শাস্তি।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলে যে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একইভাবে ৩২ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করে। আর ৩৩ অনুচ্ছেদ গ্রেপ্তার ও আটক ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট সাংবিধানিক সুরক্ষা দিয়েছে।

অর্থাৎ একজন অপরাধীও যখন গ্রেপ্তার হন, তখন তিনি তার মৌলিক অধিকার হারিয়ে ফেলেন না। রাষ্ট্র তাকে শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু সেই শাস্তি হতে হবে আইনের মাধ্যমে এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।

এখানে ‘আইনের শাসন’ এবং ‘রাষ্ট্রের ক্ষমতা’—এই দুটি বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা অবশ্যই এমন একটি বিশেষায়িত বাহিনী চাই, যারা মাদক, সন্ত্রাস, অস্ত্র, মানবপাচার, সাইবার অপরাধ ও সংঘবদ্ধ অপরাধের মতো জটিল অপরাধ মোকাবিলা করতে সক্ষম। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা এমন একটি বাহিনীও চাই, যার সদস্যরা জানবেন—ক্ষমতা যত বেশি, জবাবদিহিও তত বেশি।

এসআরবির খসড়ায় অভিযোগ প্রতিকার কমিটি রাখার বিষয়টি অবশ্যই ইতিবাচক। নাগরিকদের অভিযোগ তদন্ত এবং অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করার ক্ষমতা এই কমিটিকে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এখানেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়—সুপারিশ কি যথেষ্ট?

যদি কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে এবং সেই অভিযোগ তদন্তকারী কাঠামোর সিদ্ধান্ত কেবল সুপারিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ভুক্তভোগী কতটা কার্যকর প্রতিকার পাবেন?

আমার মতে, এই জায়গায় আরও শক্তিশালী স্বাধীন জবাবদিহি ব্যবস্থা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রতিকার কমিটিতে শুধু বাহিনী বা প্রশাসনের প্রতিনিধিত্ব থাকলে চলবে না, মানবাধিকার, আইন, বিচার প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের স্বাধীন প্রতিনিধিত্ব আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অভিযোগের তদন্ত যেন অভিযুক্ত বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গ্রেপ্তার ও তল্লাশির ক্ষমতা।

খসড়া আইনে নির্দিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে এসআরবির সদস্যদের তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণের বাধ্যবাধকতার কথাও বলা হয়েছে।

আমার প্রশ্ন হলো—আইনে ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি রাখা হয়েছে?

কারণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োজনীয় হলেও সেই ক্ষমতা যদি যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তা নাগরিকের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন নিরপরাধ মানুষকে ভুলভাবে গ্রেপ্তার করা শুধু একটি প্রশাসনিক ভুল নয়, এটি তার স্বাধীনতা, সম্মান এবং সামাজিক জীবনের ওপর সরাসরি আঘাত।

আর এ কারণেই সংবিধানের ৩১, ৩২ ও ৩৩ অনুচ্ছেদকে নতুন আইনের কেন্দ্রে রাখতে হবে।

আরেকটি বিষয় আমাকে ভাবায়—র্যা বের পুরোনো সদস্য, সম্পদ, মামলা ও প্রশাসনিক দায়-দায়িত্ব যদি প্রায় সম্পূর্ণভাবে এসআরবিতে স্থানান্তরিত হয়, তাহলে অতীতের অভিযোগ ও দায়ের কী হবে?

নতুন একটি প্রতিষ্ঠানের নাম গ্রহণ করলেই পুরোনো প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য দায় মুছে যেতে পারে না। বরং যে অভিযোগগুলো অতীতে উঠেছে, সেগুলোর তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হওয়া উচিত। কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধ করে থাকেন, তার দায় ব্যক্তিগতভাবে নির্ধারিত হওয়া উচিত; আবার কোনো সদস্য যদি অভিযোগ থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হন, তাকেও ন্যায়বিচার দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান বদলানো যায়, কিন্তু আইনের দায় থেকে পালানো যায় না।

আমার কাছে এসআরবি গঠনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে এর নাম বা লোগো নয়, বরং এর সদস্যরা আইনের কাছে কতটা জবাবদিহি করবেন, সেটি।

আমি মনে করি, নতুন আইনে কয়েকটি বিষয় আরও স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা দরকার।

প্রথমত, বাহিনীর প্রতিটি অভিযান যথাসম্ভব নথিবদ্ধ ও পরবর্তীতে পর্যালোচনাযোগ্য হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, গ্রেপ্তার ও তল্লাশির ক্ষেত্রে আইনি শর্ত ভঙ্গ হলে কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, হেফাজতে থাকা ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী নজরদারি ও স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

চতুর্থত, বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে এমন একটি কাঠামো থাকা উচিত, যেখানে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রভাব তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে।

পঞ্চমত, অতীতে সংঘটিত অভিযোগ ও মামলাগুলোর ক্ষেত্রে নতুন বাহিনীর দায়িত্ব ও দায় স্পষ্ট করতে হবে।

সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—এসআরবি যেন কোনো সরকারের রাজনৈতিক হাতিয়ার না হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো রাজনৈতিক দল, সরকার বা ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। তারা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান। তাদের দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংবিধান ও আইনের প্রতি আনুগত্য রেখে কাজ করা।

আমরা এমন একটি বাহিনী চাই না, যে শুধু শক্তিশালী। আমরা এমন একটি বাহিনী চাই, যে শক্তিশালী এবং একই সঙ্গে আইনের কাছে জবাবদিহিমূলক।

রযাে বের জায়গায় এসআরবি আসতে পারে। নাম পরিবর্তন হতে পারে। নতুন পোশাক, নতুন লোগো, নতুন কাঠামোও হতে পারে। কিন্তু প্রকৃত সংস্কার তখনই হবে, যখন একজন সাধারণ নাগরিক পুলিশের বা এসআরবির সামনে দাঁড়িয়ে মনে করবেন—“রাষ্ট্র আমার বিরুদ্ধে নয়—রাষ্ট্র আইন অনুযায়ী আমার সুরক্ষার জন্য।”

আমার দৃষ্টিতে, একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সফলতার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তা নয়; বরং কতটা আইনসম্মতভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়েছে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার হলে কতটা কার্যকরভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছে।

তাই র্যা ব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনকে আমি স্বাগত জানাই—তবে শর্ত একটাই: এটি যেন শুধু নাম পরিবর্তনের সংস্কার না হয়।

এটি যেন হয় ক্ষমতার সংস্কার, জবাবদিহির সংস্কার এবং সর্বোপরি আইনের শাসনের সংস্কার।

কারণ একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্ত্রে নয়—তার শক্তি নিহিত থাকে সেই বাহিনীকেও আইনের অধীনে রাখার সক্ষমতায়।

লেখক:

মাহাফুজ কাজী রিজু

আইন বিভাগ (এলএল.বি.)

ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন