রোকেয়া হলের গেট
‘যেখানে অপেক্ষা করত প্রেম, বন্ধুত্ব আর আমাদের তারুণ্য’
শফিকুল ইসলাম বেবু
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০০ পিএম
বয়স মানুষকে বদলে দেয়। বদলে দেয় পরিচয়, পদ-পদবি, দায়িত্ব। কিন্তু কিছু কিছু জায়গা আছে, যেখানে দাঁড়ালেই মানুষ আবার নিজের তারুণ্যে ফিরে যায়।
ঠিক তেমনই একটি দৃশ্য দেখলাম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী বেগম রোকেয়া হলের সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে আমার বন্ধু লুৎফর রহমান। আজ তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর। অসংখ্য শিক্ষকের অভিভাবক, হাজারো শিক্ষার্থীর অনুপ্রেরণা। কিন্তু সেই মুহূর্তে তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন আর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর নন—তিনি সেই ১৯৮৫ সালের লাজুক, স্বপ্নবাজ তরুণ, যার হৃদয়ে প্রথম প্রেমের গোপন আলো জ্বলছিল।
আমি কিছুক্ষণ দূর থেকে তাঁকে দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, তিনি রোকেয়া হলকে দেখছেন না; তিনি দেখছেন চার দশকেরও বেশি পুরোনো এক বিকেলকে।
১৯৮৫ সালে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, এরশাদবিরোধী আন্দোলন, সেশনজট—সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেটে যায় জীবনের আটটি বছর। সেই আট বছরে আমরা শুধু পরীক্ষা দিইনি, দিয়েছি আন্দোলনের মিছিলে স্লোগান, দিয়েছি বন্ধুত্বের পরীক্ষা, দিয়েছি ভালোবাসারও পরীক্ষা।
সেই সময় বিকেল মানেই ছিল এক উৎসব।
হলের আয়নায় নয়, ছেলেদের হলের ছোট্ট আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কেউ তিব্বত স্নো মাখছে, কেউ মুখে পাউডার, কেউ নতুন শার্ট পরে চুল আঁচড়াচ্ছে। বন্ধুদের ঠাট্টা—‘আজ বুঝি রোকেয়া হলে জরুরি মিটিং আছে?’
আমরা সবাই জানতাম, সেই ‘মিটিং’-এর নাম ছিল ভালোবাসা।
আজকের ছেলেমেয়েরা হয়তো বুঝবে না, তখন একটি ফোনকল করারও উপায় ছিল না। মোবাইল ফোন ছিল না, মেসেঞ্জার ছিল না, ইমো কিংবা হোয়াটসঅ্যাপও ছিল না।
তখন প্রেমের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি ছিল একটি ছোট্ট কাগজের স্লিপ।
সেই স্লিপে লেখা থাকত— ‘জেসমিন, একটু নিচে আসবে?’ অথবা, ‘আজ বিকেল পাঁচটায় টিএসসিতে অপেক্ষা করব।’
তারপর শুরু হতো অপেক্ষা।
রোকেয়া হলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো তীর্থের কাকের মতো। হলের ভেতরে কোনো ছাত্রী ঢুকলেই সবাই একসঙ্গে ছুটে যেত—
‘আপু, একটু কষ্ট করে এটা দিয়ে দেবেন?’
দৃশ্যটা এমন ছিল যেন নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে ব্যালট দেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে।
সেই প্রেমিকদের সারিতে আমার বন্ধু লুৎফর রহমানও ছিল।
আমরা একই বিভাগের ছাত্র—পরিসংখ্যান বিভাগ। আমি, লুৎফর রহমান, জেসমিন নাহার এবং আরও অনেকেই একই ক্লাসে পড়তাম।
ক্লাসের ফাঁকে, লাইব্রেরির সিঁড়িতে, কার্জন হলের ছায়ায় কিংবা টিএসসির আড্ডায় আমরা বুঝতে শুরু করলাম—লুৎফর আর জেসমিনের মধ্যে নীরবে একটি গল্প লেখা হচ্ছে।
বন্ধুরা সন্দেহ করত।
‘কিছু একটা আছে!’
লুৎফর অস্বীকার করত, জেসমিন লজ্জায় মাথা নিচু করত। কিন্তু প্রেম কি কখনও গোপন থাকে?
একদিন সন্দেহ সত্যি হয়ে গেল।
সেই প্রেমে নাটক ছিল না। ছিল না সিনেমার নায়ক-নায়িকার মতো সংলাপ। ছিল না লাইলী-মজনুর মরুভূমি কিংবা রোমিও-জুলিয়েটের ট্র্যাজেডি। ছিল শুধু বিশ্বাস, সম্মান আর অপেক্ষা।
অবশেষে সেই প্রেম বিয়ের পূর্ণতা পেল।
আজ তাদের দাম্পত্য জীবনেরও চৌত্রিশ বছর।
কিছুদিন আগে জেসমিনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—
‘কেমন আছো?’
সে হেসে বলেছিল,
‘খুব ভালো আছি। লুৎফরের মতো স্বামী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। যদি আরেকটা জন্ম থাকে, সেখানেও যেন লুৎফরকেই পাই।’
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
মনে হচ্ছিল, এত বছরের সংসারের পরও যদি একজন স্ত্রী এমন কথা বলতে পারেন, তাহলে বুঝতে হবে—ভালোবাসা এখনও বেঁচে আছে।
আমার নিজের জীবনেও একদিন প্রেম এসেছিল।
কিন্তু সেই প্রেম সংসার হয়ে ওঠেনি।
বিয়ে হয়নি।
তবুও আজও মনে হয়, ভালোবাসা কোথাও হারিয়ে যায়নি। মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক থাকে, যাদের কোনো সামাজিক পরিচয় নেই, তবু তারা হৃদয়ের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় সারাজীবন বেঁচে থাকে।
তাই মনে হয়, প্রেমের মৃত্যু হয় না।
কিছু প্রেম সংসারে বেঁচে থাকে, কিছু প্রেম স্মৃতিতে।
রোকেয়া হলের গেটের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এই গেট শুধু একটি ছাত্রাবাসের প্রবেশপথ নয়। এটি আমাদের প্রজন্মের অপেক্ষার ইতিহাস। এখানে দাঁড়িয়ে কত তরুণ বুক কাঁপিয়ে প্রথম প্রেমের কথা বলেছে, কত চিঠি হাতবদল হয়েছে, কত চোখের ভাষা শব্দের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে।
আজ প্রযুক্তি মানুষকে কাছে এনেছে, কিন্তু সেই অপেক্ষার সৌন্দর্য কেড়ে নিয়েছে।
একটি ‘সিন’ বা ‘অনলাইন’ এখন সেকেন্ডে দেখা যায়; অথচ একসময় একটি ছোট্ট স্লিপের উত্তরের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতাম। সেই অপেক্ষার প্রতিটি মিনিটেই ছিল হৃদস্পন্দনের শব্দ।
বন্ধু লুৎফরকে রোকেয়া হলের সামনে দাঁড়িয়ে দেখে মনে হলো, সময় সত্যিই অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আমরা সবাই জীবনের শেষ বিকেলের দিকে হাঁটছি।
তবু কিছু বিকেল কখনো শেষ হয় না।
রোকেয়া হলের সেই গেট আজও দাঁড়িয়ে আছে।
হয়তো সে এখনও অপেক্ষা করছে—কোনো এক লুৎফরের জন্য, কোনো এক জেসমিনের জন্য, কিংবা আমাদের মতো কিছু মানুষের জন্য, যারা ফিরে এসে একবার শুধু বলতে চায়—
‘ধন্যবাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তুমি আমাদের শুধু শিক্ষিত করোনি; তুমি আমাদের মানুষ হতে, ভালোবাসতে এবং স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে শিখিয়েছ।’
শফিকুল ইসলাম বেবু একজন সহপাঠী, একজন সাক্ষী, একজন স্মৃতিবাহী।



