মিম হবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্ত্র, সোশ্যাল মিডিয়া হবে ‘যুদ্ধক্ষেত্র’
শায়েরি ঘোষ
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০৯:৫৬ পিএম
প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ১৯৪৯ সালের এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমি জানি না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কোন অস্ত্র দিয়ে লড়া হবে। তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ হবে লাঠি আর পাথর দিয়ে।
আজকের বাস্তবতায় সেই কথার নতুন ব্যাখ্যা হলো আমি জানি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী দিয়ে লড়া হবে। সেটি হলো মিম দিয়ে।
শুনতে বিষয়টি হাস্যকর লাগলেও, যেকোনো বড় রাজনৈতিক ঘটনার সময় মাত্র কয়েক মিনিট সামাজিক মাধ্যমে কাটালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনো ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি হওয়ার আগেই মিম ছড়িয়ে পড়ে। আর সেগুলো দ্রুত মানুষের ধারণা ও মতামত গঠন করতে শুরু করে।
বর্তমান সময়ে যুদ্ধ শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয় না। যুদ্ধ হয় বর্ণনা ও ন্যারেটিভের মাধ্যমেও। আর সেই ন্যারেটিভ সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সক্ষম মাধ্যমগুলোর একটি হলো মিম।
দীর্ঘদিন ধরে মিমকে নিছক ইন্টারনেটভিত্তিক হাস্যরস হিসেবে দেখা হতো—এক ধরনের হালকা, গুরুত্বহীন সংস্কৃতি হিসেবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিম অনেক বড় কিছুতে পরিণত হয়েছে। এটি এখন রাজনৈতিক অস্ত্রে রূপ নিয়েছে।
মজার বিষয় হলো, মিম খুব কম ক্ষেত্রেই প্রচারণা বা ‘প্রোপাগান্ডা’ বলে মনে হয়। যদিও বাস্তবে অনেক সময় সেটিই কাজ করে। প্রচলিত প্রচারণা সাধারণত বক্তব্য, বিজ্ঞাপন, সংবাদপত্রের প্রচারাভিযান বা রাজনৈতিক ভাষণের মাধ্যমে আসে। কিন্তু মিম আসে হাস্যরসের মোড়কে—একটি ভাইরাল ভিডিও বা ছবি হিসেবে, যা মানুষ বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করে শুধু মজার বলে। আর সম্ভবত এই বিনোদনমূলক উপস্থাপনাই একে সবচেয়ে শক্তিশালী করে তুলেছে।
বর্তমানে মতাদর্শগত বার্তা ছড়িয়ে দিতে মিম অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। আবেগনির্ভর কনটেন্ট হওয়ায় মিম দ্রুত ভাইরাল হয় এবং অন্য যেকোনো রাজনৈতিক বার্তার চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ প্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মিমের সঙ্গে যুক্ত হয়। সমালোচনামূলক চিন্তা পরে আসে—অনেক সময় আসে না বললেই চলে।
একটি মিম অত্যন্ত জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতাকে কয়েক সেকেন্ডে সরল করে দিতে পারে: নায়ক বনাম খলনায়ক, দেশপ্রেমিক বনাম বিশ্বাসঘাতক, নিপীড়িত বনাম নিপীড়ক। এতে মানুষ মনে করে তারা বিষয়টি বুঝে ফেলেছে। যদিও বাস্তবতার গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ অনেকের যুক্তি—এত সময় কোথায়?
আজকের মানুষ তথ্যের চাপে বিপর্যস্ত। দীর্ঘ রিপোর্ট বা নীতিগত বিশ্লেষণ পড়া অধিকাংশ মানুষের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। ফলে রাজনীতি এখন অনেকের কাছে পৌঁছায় ইনস্টাগ্রাম রিল, হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড, টুইট ও মিমের মাধ্যমে। ভাইরাল কনটেন্ট মানুষের তাৎক্ষণিক বোঝার চাহিদা পূরণ করে, ফলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অনেক সময় তথ্যভিত্তিক হওয়ার বদলে আবেগনির্ভর হয়ে পড়ে।
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক দলগুলো এখন অনলাইন ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশাল ডিজিটাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। আধুনিক নির্বাচন শুধু মাঠে নয়, স্মার্টফোনের পর্দাতেও লড়া হয়। এখন নির্বাচন নির্ধারিত হয় শুধু ভাষণ, ইশতেহার বা প্রতিশ্রুতিতে নয়; বরং হ্যাশট্যাগ, মিম পেজ, ইনফ্লুয়েন্সার নেটওয়ার্ক এবং বিরোধীদের লক্ষ্য করে চালানো ট্রল প্রচারণার মাধ্যমেও।
বিশেষ করে ভারতে মিম সংস্কৃতি এখন প্রায় রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ছোট-বড় প্রতিটি ঘটনা মুহূর্তেই কনটেন্টে পরিণত হয়, আর যেকোনো বিতর্ক শুরু হয় মিম যুদ্ধ দিয়ে। সমর্থক ও সমালোচক—উভয় পক্ষই এই ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে, অনেক সময় না বুঝেই রাজনৈতিক বার্তা আরও ছড়িয়ে দেয়।
গত এক দশকের প্রায় প্রতিটি বড় আন্তর্জাতিক সংঘাত সামাজিক মাধ্যমে সমান্তরাল এক ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করেছে। যেখানে ভাইরাল ন্যারেটিভই জনমত নির্ধারণ করে। ফলে যুদ্ধের লক্ষ্য শুধু ভূখণ্ড দখল নয়; মানুষের মনে বিজয়ের ধারণা প্রতিষ্ঠা করাও।
এই কাজের জন্য মিম অত্যন্ত উপযোগী। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নিয়ে দীর্ঘ সম্পাদকীয় পড়ার চেয়ে অনেকের কাছে কয়েকটি আবেগঘন মিম দেখা সহজ ও আকর্ষণীয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও আবেগপ্রবণ কনটেন্টকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার এই যুগে মিম সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
আজ একটি মিম শেয়ার করা মানে শুধু হাস্যরস ছড়ানো নয়; এটি অনেক সময় ব্যক্তির রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও বহিঃপ্রকাশ। এ কারণেই মিম-ভিত্তিক প্রচারণা প্রচলিত প্রোপাগান্ডা থেকে আলাদা। এখানে মানুষ শুধু বার্তার ভোক্তা নয়, বরং নিজেরাই সেটির প্রচারক হয়ে ওঠে।
অবশ্যই, মিম নিজে স্বভাবগতভাবে ক্ষতিকর নয়। রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও হাস্যরস বহুদিন ধরেই ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানের সমালোচনার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সমাজে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিবাদের ভাষা।
সমস্যা হলো, ইন্টারনেট এখন সেই ব্যঙ্গকে অভূতপূর্ব মাত্রায় ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। আগে একটি রাজনৈতিক কার্টুন হয়তো সীমিতসংখ্যক পাঠকের কাছে পৌঁছাত এবং পরদিন হারিয়ে যেত। কিন্তু একটি মিম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে—অনেক সময় সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট ছাড়া—এবং জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে।
আধুনিক সংঘাতের অস্ত্র এখন শুধু সামরিক নয়; বরং ক্রমশ মানসিক ও ডিজিটাল হয়ে উঠছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র এখন একটি ৬.৯ ইঞ্চির মোবাইল ফোনের পর্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
ভবিষ্যতের যুদ্ধ হয়তো বোমা দিয়ে শুরু হবে না।
শুরু হতে পারে একটি ট্রেন্ড দিয়ে।
সূত্র: এনডিটিভি



