ভাড়ারদহ বিলের এক অপার্থিব প্রাপ্তি: ‘উত্তুরে ল্যাঞ্জা হাঁস’
এ কে এম ফজলুল হক
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ০১:৩৩ পিএম
২০২০ সালেও যেখানে কেবল ধান, গম, সরিষা কিংবা আলুর চাষ হতো আজ সেই ভাড়ারদহ বিল পরিণত হয়েছে প্রাণ ও প্রকৃতির এক মোহনীয় মিলনস্থলে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ‘ইআইআর’ প্রকল্পের মাধ্যমে বদরগঞ্জ উপজেলার ভাড়ারদহ বিলটি দখলমুক্ত ও খনন করার পর এর রূপ সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
খননকৃত বিলের প্রশস্ত পাড়ে রোপণ করা হয়েছে শতাধিক দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষ, যা এখন সবুজের সমারোহে বিলটিকে এক অনন্য রূপ দান করেছে। বিলের স্বচ্ছ নীল জল আর আকাশের নীলিমা যেন মিতালিতে মেতেছে। এই নিস্তব্ধতা ভেঙে জলকেলিতে মেতে থাকে পানকৌড়ি, মাছরাঙা আর পাতি সরালির ঝাঁক। তাদের কিচিরমিচির আর খুনসুটি দর্শনার্থীদের মন ভরিয়ে দেয়। প্রকৃতি যেন এখানে তার নিজস্ব রঙে সেজেছে।
বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তাদের মতে, বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা বিলে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পাখিদের খাবার (শেওলা, ছোট মাছ, শামুক ইত্যাদি) থাকে না। কিন্তু ভাড়ারদহ বিলে প্রাকৃতিকভাবে খাবারের সংস্থান এবং পাড়ে ফুল ও ফলের গাছ থাকায় এটি পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। পাখিদের এই আবাসস্থল রক্ষায় উপজেলা প্রশাসন প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে।
বিলটিকে ইজারা বহির্ভূত রাখা হয়েছে, যার ফলে বছরের প্রায় আট মাস পাখিরা এখানে নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারে। কেবল প্রজননকালীন চার মাস তারা বনে-জঙ্গলে থাকে, আর শীতের শুরুতে আগমন ঘটে পরিযায়ী পাখিদের। বিলটিতে গিরিয়া হাঁস, দলপিপি, জুলময়ূর, ডাহুক, সরালি, পাতি সরালি, মাছরাঙার, পানকৌড়ি, শালিক, ঘুঘু, কোকিল, হাঁড়িচাচা, দোয়েল, ফিঙে, শ্বেতাক্ষি, বউ কথা কও, বেনে বউ, পাপিয়া, কাবাসি, বুলবুলি, হুদহুদ, সোহেলি, চাচপাখি, লরীয়তী, বন ভরত, খঞ্জনা, চাতক, টুনটুনি, বিভিন্ন প্রজাতির বক সহ নান প্রকার পাখির আনাগোনা দেখা যায়।
পরিযায়ী পাখিদের জগতে উত্তুরে ল্যাঞ্জা হাঁস এক বিস্ময়ের নাম। এদের রাজকীয় অবয়ব এবং সরুলম্বা লেজের নান্দনিকতার কারণে এদেরকে পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে 'অ্যারিস্টোক্র্যাট' বা অভিজাত পাখি বলা হয়। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে সংরক্ষিত এই পাখিটি সাধারণত শীতকালে হাকালুকি হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, বাইক্কা বিল বা নিঝুম দ্বীপের মতো বড় জলাশয়গুলোতে দেখা যায়।
এই পাখিটিকে ঘিরে আমার এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্প আছে। ২০২৪ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরে গিয়েও মনের মতো ছবি মেলেনি। এ বছর পাখিটি তিস্তা নদীতে এসেছিল; বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ ও খাইরুল ইসলাম চমৎকার ছবি তুলেছেন। দুর্ভাগ্যবশত সেদিন আমি তাদের সঙ্গী হতে পারিনি। দু’দিন পর খাইরুল ভাইকে নিয়ে তিস্তা হন্যে হয়ে খুঁজলেও পাখিটির আর দেখা মেলেনি। বারবার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় পাখিটির প্রতি আমার আগ্রহ আর আবেগ চরমে পৌঁছায়।
অবশেষে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো আমারই খনন করা ভাড়ারদহ বিলে। বিলটিতে যখন ল্যাঞ্জা হাঁসটিকে দেখলাম, প্রথমটায় নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। প্রবল উত্তেজনা আর আবেগ সামলে নিয়ে ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করলাম। লেন্সের ফ্রেমে যখন সেই রাজকীয় হাঁসটি ধরা দিল, তখন যে আনন্দ আর তৃপ্তি অনুভব করেছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
পুরুষ হাঁসের লেজের মাঝখানের দুটি পালক সূঁচালো ও লম্বা থাকে, যার কারণেই এদের নাম হয়েছে ‘ল্যাঞ্জা’। এদের পরিযান বা মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া সত্যিই বিস্ময়কর। এরা পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া পাখি। এদের ওড়ার ক্ষিপ্র গতি এবং অনেক উচ্চতা দিয়ে ওড়ার ক্ষমতার কারণে এদের আকাশের 'জেট প্লেন' বলা হয়। এমনকি হিমালয়ের মতো সুউচ্চ পর্বতমালা পাড়ি দেওয়ার রেকর্ডও এদের রয়েছে বলে জানা যায়। শীতকালে সাইবেরিয়ার জলাভূমিগুলো বরফে ঢেকে যায়, তাই খাবারের সন্ধানে এরা আমাদের দেশে চলে আসে। তখন দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার নদ-নদী, হাওর-বাঁওড়, বিল-ঝিলে দেখা মেলে।
ভাড়ারদহ বিলের মতো ছোট জলাশয়ে পাখিটিকে পাওয়া এক অবিশ্বাস্য প্রাপ্তি; যদি সুরক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা থাকে, তবে ভবিষ্যতে এখানে হয়তো নীলশির, খুন্তি হাঁস বা নাগতা হাঁসের মতো আরও দুর্লভ পাখির দেখা মিলবে- এমনটাই আমার বিশ্বাস।
লেখক: প্রকৌশলী ও আলোকচিত্রী



