বৈশ্বিক অভিবাসন প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি মূল্যায়নে নিউইয়র্কে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক মাইগ্রেশন রিভিউ ফোরামে (আইএমআরএফ) একত্রিত হয়েছে বিভিন্ন দেশের সরকার। তবে নিরাপদ অভিবাসনের জন্য তৈরি গ্লোবাল কমপ্যাক্ট ফর মাইগ্রেশন কি সত্যিই অভিবাসীদের জীবনমান উন্নত করতে পেরেছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর উত্তর ‘হ্যাঁ’।
অভিবাসনকে আরও নিরাপদ ও মানবিক করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাভিত্তিক প্রথম বৈশ্বিক চুক্তি হলো ২০১৮ সালে গৃহীত ‘গ্লোবাল কমপ্যাক্ট ফর সেফ, অর্ডারলি অ্যান্ড রেগুলার মাইগ্রেশন’। তবে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ২০২৫ সালের ‘গ্লোবাল ওভারভিউ অব মাইগ্রেশন রুটস’ প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে অভিবাসনের চিত্রকে মিশ্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন রুটে অভিবাসনের ধরণ বদলালেও যাত্রাপথের ঝুঁকি এখনও অত্যন্ত গুরুতর। কিছু ক্ষেত্রে তা আরও বেড়েছে।
২০২৫ সালে সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট দিয়ে ইতালি ও মাল্টায় পৌঁছেছেন প্রায় ৬৬ হাজার ৫০০ জন, যা আগের বছরের প্রায় সমান। অন্যদিকে, ইস্টার্ন মেডিটেরেনিয়ান রুটে গ্রিস, সাইপ্রাস ও বুলগেরিয়ায় পৌঁছানো মানুষের সংখ্যা ৩০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ওয়েস্ট আফ্রিকান আটলান্টিক রুট হয়ে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানো মানুষের সংখ্যা ৬২ শতাংশ কমে গেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আগমনের সংখ্যা কমে যাওয়া মানেই নিরাপদ যাত্রা নয়। ইস্টার্ন মেডিটেরেনিয়ান রুটে এক বছরে মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ওয়েস্ট আফ্রিকান আটলান্টিক রুটেও মৃত্যুর সংখ্যা খুব বেশি কমেনি। ফলে সমুদ্রে মৃত্যুঝুঁকি বেড়েছে। আর সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুটে ২০২৫ সালে এক হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অভিবাসনপথগুলোর একটি হিসেবে রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর হলে বা রুট পরিবর্তিত হলে যাত্রাপথ আরও দীর্ঘ, জটিল ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। মানুষ চলাচল বন্ধ করে না, বরং বৈধ পথ কমে গেলে তারা বাধ্য হয় অনিয়মিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাত্রা করতে।
এদিকে, সুদানের চলমান সংকট পুরো অঞ্চলের অভিবাসন পরিস্থিতিকে বদলে দিয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সংঘাত শুরুর তিন বছর পর দেশটি এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতি সংকটের মুখে। এক সময় বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ১৫ লাখ ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ এখনও বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আরও বেশি সুদানি নাগরিককে পূর্ব ও মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুটে দেখা যাচ্ছে। অনেকের জন্য এসব যাত্রা কোনো পছন্দ নয়, বরং বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা।
প্রতিবেদন আরও বলছে, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চল বৈশ্বিক অভিবাসনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ২০২৫ সালে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে ইউরোপে অনিয়মিতভাবে পৌঁছানো প্রতি তিনজনের একজন ওই অঞ্চল থেকে আসছেন।
এছাড়া বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ, খরা, বন্যা ও তাপপ্রবাহের মতো কারণগুলোও অভিবাসনের চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব অনেক দেশে ২০ শতাংশেরও বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে—উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা, বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের পথ বাড়ানো, তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়ন এবং আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা বৃদ্ধি।
নিউইয়র্কে চলমান আইএমআরএফে বিশ্বের ১৩০টি দেশ গ্লোবাল কমপ্যাক্ট বাস্তবায়নে সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, অভিবাসন এমন একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা যা কেবল যৌথ ও মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমেই কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, যদি নিরাপদ ও নিয়মিত পথ বাড়ানো যায়, শ্রমিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় এবং মানবপাচার চক্র দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ে, তাহলে কম মানুষ প্রাণ হারাবে এবং আরও বেশি মানুষ ও সমাজ উপকৃত হবে।
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর: মাকসুদা রিনা



