পশ্চিমবঙ্গে ভোটযুদ্ধ
নারী ভোটারদের ওপর ভর করেই কি টিকে থাকবেন মমতা?
মাকসুদা রিনা
প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬, ১২:০৬ পিএম
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও নির্বাচনী ইতিহাস সম্পর্কে কমবেশি আমরা সবাই জানি। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের শেষ দফার ভোট শেষ হয়েছে বুধবার। ভোট শেষ হতেই দেশটির কয়েকটি সংস্থা বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশ করে। তবে এসব জরিপে সম্ভাব্য ফলাফলের বিভক্ত চিত্র উঠে এসেছে। কিছু জরিপ ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয়ের পূর্বাভাস দিয়েছে। আবার কিছু বলছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসই ক্ষমতায় থাকবে।
তবে ভোটের লড়াইয়ে উত্তরবঙ্গে বিজেপি অত্যন্ত ভালো ফল করলেও এখন পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গে মমতার শক্ত ঘাঁটি ভেদ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বিশ্লেষকরা গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে করে আসছেন ভোটে স্বচ্ছ পদ্ধতি অনুসরণ করা বিশ্বাসযোগ্য জরিপ সংস্থাগুলো এক্সিট পোলের মাধ্যমে মোটামুটি সঠিক ভোট শতাংশ নির্ধারণ করতে পারলেও আসনসংখ্যার পূর্বাভাস দেওয়া অত্যন্ত অনিশ্চিত। বারবারই এই ধারণা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে ধারাবাহিক নির্বাচনে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই সিভোটার এবার শুধুমাত্র ভোট শতাংশ বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আসন পূর্বাভাসের ঝুঁকি নিতে চায়নি।
দুইটি সমান্তরাল চিত্র
দীর্ঘ সময় মাঠপর্যায়ে কাজ করা এবং নিয়মিত ট্র্যাকার জরিপের ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী পরিস্থিতিতে দুটি ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে।
প্রথম চিত্র অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেসের নিম্নস্তরের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রবল অসন্তোষ এবং ক্ষোভ রয়েছে। যা সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রায় ১০ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে বিজেপিকে পিছনে ফেলেছিল। এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে অন্তত ৫ শাতাংশ ভোটের সুইং দরকার।
দ্বিতীয় চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন ও সূক্ষ্ম। এখানে স্বীকার করা হচ্ছে যে তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ রয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে বলা হচ্ছে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও রাজ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। বিশেষ করে নারী-কেন্দ্রিক বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প তৃণমূলকে এগিয়ে রাখতে পারে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, আবারও নারী ভোটাররাই মমতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন।
প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
২০২৪ সালের পর হওয়া বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচন—হরিয়ানা, ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট্র, দিল্লি ও বিহারে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা দেখা গেছে। ক্ষমতাসীন দলগুলো নারী ভোটারদের জন্য নির্দিষ্ট কল্যাণমূলক সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিরোধীরা আরও বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভোটাররা তুলনামূলক বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতিকেই বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করেছেন।
দিল্লির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা গেলেও, সেখানেও নারী ভোটারদের মধ্যে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দল বেশি ভোট পেয়েছিল। তবে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা বেশি থাকা এবং নারী ভোটারের উপস্থিতি তুলনামূলক কম হওয়ায় ফলাফল ভিন্ন হয়েছে। অন্য রাজ্যগুলোতে নারী ভোটারদের বেশি উপস্থিতি ক্ষমতাসীনদের পক্ষে গেছে।
ভোটের হার ও প্রবণতা
পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে ভোট পড়ে ৯৩.১৯ শতাংশ। নারী ভোটারদের উপস্থিতি পুরুষদের তুলনায় মাত্র ২ শতাংশ বেশি ছিল। দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনে ভোট পড়ে ৯১.৬৬ শতাংশ, যেখানে একই ধরনের সামান্য পার্থক্য দেখা যায়।
তবে দীর্ঘমেয়াদি জরিপে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। উত্তরবঙ্গে নারী ভোটে কোনো পক্ষই স্পষ্টভাবে এগিয়ে নেই। কিন্তু দক্ষিণবঙ্গে তৃণমূল প্রায় ৪ শতাংশ নারী ভোটে এগিয়ে। এই সামান্য ব্যবধানই কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্ধারক হতে পারে।
বিশেষ করে কলকাতা, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং নদীয়া—এই পাঁচটি জেলায় ১০৮টি আসন রয়েছে। যেখানে ২০২১ সালে তৃণমূল ৯৭টি আসনে জয়ী হয়েছিল। বিজেপির পক্ষে সরকার গঠন করতে হলে এই এলাকায় শক্ত অবস্থান তৈরি করা জরুরি।
এক্সিট পোল বিভিন্ন আসন পূর্বাভাস দিলেও সিভোটার তা থেকে বিরত রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চতুর্থবারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হন, তবে তার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবেন দক্ষিণবঙ্গের নারী ভোটাররা।
তবে সবকিছুই নির্ভর করছে চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর—যার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ভোট গণনা পর্যন্ত।
এনডিটিভি থেকে ভাষান্তর



