বাংলাদেশের নির্বাচন
শেষমেশ কার গলায় মালা শোভা পাবে?
প্রিন্সিপাল সাব্বির উদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:১৬ পিএম
আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি এই প্রথম বাংলাদেশের ইতিহাসে একসাথে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অন্তবর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন ভোট যাতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয় তার জন্যে সব ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
ইতোমধ্যে ব্যালট বাক্স দেশের তিনশো আসনের সর্বত্র পৌছে গেছে। সব স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ভোটার কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি লাগানো হয়েছে। উৎসবমুখর পরিবেশে যাতে ভোট মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রদান করতে পারে সেজন্যে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে। দেশব্যাপী পুলিশ, বিজিবি, আনসার, র্যাব ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা ভোট কেন্দ্র নিরাপত্তা বিধানে থাকবে।
এবারই প্রথম সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের মাঠে আছে। তারা সকলেই একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। মূলত ভোটের মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দিতা হচ্ছে জামাতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সাথে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট। ইতোমধ্যে দু জোটের মধ্যে অভিযোগ, পালটা অভিযোগ এবং নানা অনিয়মের কথা বলে হচ্ছে।
জামাতে ইসলামী এবং বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দল বিএনপি নিজ নিজ নির্বাচনীয় ইশতেহার ঘোষণা করেছে।উভয় দলই দেশের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা দেয়ার কথা ঘোষণা করেছে।
এবারই আরেকটা প্রধান দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় ভোটের মাঠে অনুপস্থিত আছে। তাদের নেত্রীসহ বড় বড় নেতারা ঐতিহাসিক ২৪ জুলাই গণঅভ্যূত্থানে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। সে থেকে আওয়ামী লীগ ও তার নেতাকর্মীরা পুরোপুরিভাবে দৃশ্যের বাইরে আছে। একটি রাজনৈতিক দলের এমন করুণ পরিনতি গত সত্তর বছরে হয়েছে কিনা তা অনেকের প্রশ্ন।
নির্বাচন নিয়ে নানা সমিকরণ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে গেছে। তাছাড়া ২০২৫ ও ২০২৬ এর শুরুতে বিভিন্ন জরিপে দেখা যায় যে, দুদলের মধ্যে খুব বেশি ব্যবধান দেখা যাচ্ছে না। গত দুটি জরিপে দেখা যায় বিএনপি ৩৪.৭ ভোট পেয়েছে। অপরদিকে জামাত পেয়েছে ৩৩.৬ ভোট। তার মানে উভয় দলগুলোর মধ্যে পার্থক্য শতকরা এক ভাগ। অর্থ্যাৎ উভয় দলের সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাষ পাওয়া যাচ্ছে।
সর্বশেষ জরিপে দেখা যাচ্ছে জামাত ১০৫টি আসন পাবে আর বিএনপি পাবে ১০১টি আসন। ঠিক এই সময়ে আরেকটা জরিপে বিএনপি পাবে ২০৮টি আসন আর জামাত পাবে ৪৬টি আসন। এভাবে করে যে যার মতো জরিপ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আসল বল জনগণের কোটে। জনগণ কাকে শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়ে সরকার গঠন করার সুযোগ করে দেয় সেটাই দেখার পালা।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত যে এবার নির্বাচন অন্য সময়ের চেয়ে একটি ভিন্ন। যত জরিপ করানো হোক না কেন শেষ পর্যন্ত কার মুখে হাসি দেখা যায় তা বলা একটু মুস্কিলই বলা যায়।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক জিয়া জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। তার সাম্প্রতিক বিভিন্ন সময়ে বক্তব্যে বিজয়ের কথা জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা: শফিকুর রহমানের বক্তব্যে ও অনুরুপ আশাবাদ ফুটে উঠে।
এবারকার নির্বাচনের মাঠে জামাতের অস্বাভাবিকভাবে আত্মপ্রকাশ অনেককে নির্বাচনের হিসেব নিকেশ নতুন করে কষতে হচ্ছে। আবার অনেকে বুঝে উঠতে পারছে না পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
অনেকে জামাতকে পাত্তা দিতে চাচ্ছে না। তারা মনে করছে যে জামাত বিগত নির্বাচনে শতকরা ৭/৮ ভাগ ভোট পেয়েছিল। এই দলের পক্ষে কিভাবে সরকার গঠন করা সম্ভব? এই প্রশ্ন অনেকেই ছুড়ে দেন।
আসলে ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের পর পরিস্থিতি অনেক চেঞ্জ হয়ে গেছে। জামাতের অবস্থা ও অনেক চেঞ্জ হয়েছে এটা অনেক বিশেষজ্ঞদের মত। সুতরাং জামাতকে অতীত দিয়ে বিচার করলে ভূল হবে। জামাত ভোটের মাঠে অনেক এগিয়ে গেছে। তারা আজ সবচেয়ে সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খলিত দল। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় এতো দমন-পীড়ন সত্ত্বে জামাত তার শক্তি ধরে রেখে তা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ঘটিয়েছে যার প্রমাণ আজকের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
তাদের ছাত্র সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রধান পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে নিরুনকুশ বিজয় পেয়েছে। এর ফলে ভোটের মাঠে তাদের সক্ষমতা সবার নজরে এসেছে। ছাত্রসংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক নারী ভোট পড়ায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনাস্থাই প্রকাশ পাচ্ছে।
১২ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনে সব সমীকরণ পালটে যাবে বলে মনে হচ্ছে। কোনো জরিপ আদতে টিকবে কিনা তা ১২ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচন প্রমাণ করে দিবে।
আমরা চাই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। আর সবাই যেন তাদের ইচ্ছামত নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে তার নিশ্চয়তা। এটাই গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার প্রথম সোপান। আমরা অন্তবর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনর কাছ থেকে এই ধরনের নিশ্চয়তা চাই।
পরিশেষে কার গলায় শেষমেশ বিজয়ের মালা পড়বে তা দেখার জন্যে আমাদেরকে ৪৮ ঘন্টার মতো সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে। যার গলায়ই মালা পড়ুক আমরা সাধারণ জনগণ চাই শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এবং পরে দেশে শান্তি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত ও বজায় রাখা।
লেখক: শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সিনিয়র সাংবাদিক



