হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বাধা, জাতিসংঘের প্রস্তাব ঘিরে প্রশ্ন
সালাহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:১৪ এএম
হাদি হত্যাকাণ্ড তদন্তে বাধা, জাতিসংঘের প্রসঙ্গ ও ইনকিলাব মঞ্চ রাজনীতির অস্বস্তিকর প্রশ্ন, শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু থেকেই জটিলতা ও বিতর্কে ঘেরা। প্রশাসনের একাধিক সূত্রের দাবি, তদন্তের স্বার্থে হাদীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে চলাফেরা করা ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেলে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে তদন্তের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ অবস্থায় হত্যাকাণ্ডের বিচার ও তদন্ত নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েম সরাসরি রাষ্ট্রের একটি অংশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারদা সূর্যসেন হলে শহীদ শরিফ ওসমান হাদির গ্রাফিতি উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, শহীদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকারীরা গ্রেপ্তার না হলে এবং এ হত্যার বিচার না হলে আমরা ধরে নেব এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রাষ্ট্রের একটি অংশ জড়িত। একই ধরনের প্রশ্ন তুলছে ইনকিলাব মঞ্চও। তবে এই ধারাবাহিক বক্তব্য ও আন্দোলনের ধরন এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেখানে যারা হাদী হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চান, তাদের মধ্যেই অনাস্থা ও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
জাতিসংঘ প্রসঙ্গ ন্যায়বিচার নাকি কৌশল?
উপদেষ্টাদের মধ্যে কোনো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক কি সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত? এটি শুধুমাত্র প্রাসঙ্গিক নয়, বরং হত্যার চেইন ও আন্তর্জাতিক সংযোগ বোঝার জন্য কেন্দ্রীয় প্রমাণ। তাদের রক্ষার কৌশল হিসেবে কি জাতিসংঘকে এই বিষয়ে সামনে আনা হচ্ছে? এ ধরনের হস্তক্ষেপ স্বাভাবিকভাবে সাধারণ তদন্ত প্রক্রিয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে, এবং আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্তদের রক্ষার সুযোগ তৈরি করে। ডিপ স্টেট বা ক্ষমতাশীল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণে কি এই ধরনের তদন্ত আয়োজিত হচ্ছে, যাতে ফলাফল নির্দিষ্ট মহলের অনুকূলে যায়? অথবা কি এটি সময়ক্ষেপণের একটি কৌশল, যা অভিযুক্তদের দেশে থেকে পালানোর সুযোগ দেয়? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এটি কি শুধুই একটি স্বাভাবিক তদন্ত, নাকি ক্ষমতার ছায়ার নীচে পরিকল্পিত একটি খেলা, যেখানে ন্যায়বিচার ও সত্যের স্থলভাগ হ্রাস পাচ্ছে? এখনও সময় আছে। প্রমাণ ও তথ্য অনুসন্ধান করে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা মিলে যদি যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে দেশের ন্যায়বিচার বিপন্ন হবে।
এই প্রেক্ষাপটে আরও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা। সরকার জানিয়েছে, হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হবে।বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যত দ্রুত সম্ভব এই মামলার তদন্তের জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরকে প্রস্তাব দেওয়া হবে। সরকার পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অটল।
হাদি হত্যার বিচার দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চ প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিল। সন্ধ্যা ৭টার দিকে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে সংগঠনটির একাধিক সদস্য যমুনার দিকে অগ্রসর হন। তবে আন্তর্জাতিক আইন মতে, জাতিসংঘের তদন্ত প্রসঙ্গটি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের ভাষায়, কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সরাসরি তদন্ত জাতিসংঘের এখতিয়ারভুক্ত নয়।
জাতিসংঘ সাধারণত তখনই তদন্তে যুক্ত হয়, যখন সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানায় এবং ঘটনাটি গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ বা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে। একক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড তা যত আলোচিতই হোক সাধারণত জাতিসংঘের সরাসরি তদন্তের আওতায় পড়ে না।
এ প্রশ্নও উঠছে, সরকার কি এই বাস্তবতা জানে না? নাকি জাতিসংঘের প্রসঙ্গ সামনে এনে দেশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রক্রিয়াকে দীর্ঘসূত্রতায় ফেলার কৌশল নেওয়া হচ্ছে? সমালোচকদের আশঙ্কা, এতে নির্বাচনের পর অভিযুক্তরা দেশ ছাড়ার সুযোগ পেতে পারে।
নির্বাচন ও চট্টগ্রাম বন্দর
মিল খুঁজছেন অনেকে এই বিতর্কের মধ্যেই আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারের একটি অংশ নির্বাচনের আগেই চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিতে চাপ প্রয়োগ করছে। হাদী ছিলেন ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম কণ্ঠ। ফলে প্রশ্ন উঠছে এই আন্দোলনের কারণেই কি হাদী রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর’ হয়ে উঠেছিলেন? এই প্রশ্নের সঙ্গে তার হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।
ইনকিলাব মঞ্চের ভেতরের রূপান্তর
হাদী হত্যার পর ইনকিলাব মঞ্চের ভেতরের পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন বাড়ছে। অনেকের মতে, সংগঠনটির চরিত্র হাদীর মৃত্যুর পর নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। বিশেষ করে আলোচনায় এসেছে জাবের নাম। পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, হাদী জীবিত থাকাকালে ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান ছিল একরকম, আর তার মৃত্যুর পর তা হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। হাদী জীবিত থাকতেই একাধিকবার জামায়াত ও এনসিপির প্রকাশ্য সমালোচনা করেছিলেন। তার বক্তব্য, লাইভ ও সাক্ষাৎকারে এটি স্পষ্ট ছিল। তুলনামূলকভাবে তিনি বিএনপির রাজনীতির প্রতি সফট কর্নার রাখতেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন যা তার আশপাশের লোকজন জানতেন।
এই বাস্তবতা থাকা সত্ত্বেও তার আসনে এনসিপি একজন রিকশাচালক প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়। এটি কি হাদীকে কার্যত ব্লক করার কৌশল ছিল? এরপর হাদীর মৃত্যু। এর ঠিক পরপরই দেখা যায়, ইনকিলাব মঞ্চে জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্টদের অবাধ প্রবেশ। সালাউদ্দিন আম্মারদের মতো ব্যক্তিদের সংগঠনে জায়গা করে দেওয়া হয় যারা হাদী বেঁচে থাকতে সেখানে প্রবেশের সুযোগই পাননি। প্রশ্ন তাই আরও স্পষ্ট হাদী বেঁচে থাকলে কি এই দখল সম্ভব হতো?
হাদীর হত্যাকে কেন্দ্র করে অন্য কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে? যদি সত্যিই হাদীর আদর্শই মুখ্য হতো, তাহলে তার রাজনৈতিক অবস্থান, বক্তব্য ও স্বপ্ন আজও বহাল থাকত। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। এটি কি সহানুভূতির রাজনীতি, নাকি একটি লাশকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার নতুন সমীকরণ?



