‘বিপদের বন্ধু’ অ্যাপ
জরুরি সহায়তায় মানবিক রাষ্ট্রের নতুন নজির গড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ
শারমীন আঁখি
প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম
প্রায় ১০০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দে প্রতিদিন অর্ধশতাধিক বিপদগ্রস্ত মানুষকে উদ্ধার ও তাৎক্ষণিক সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ‘বিপদের বন্ধু’ নামে একটি অ্যাপভিত্তিক প্রকল্পে নীতিগত অনুমোদনের বিষয়ে ইতিবাচক হয়েছে সরকার। প্রযুক্তি ও মানবিকতার সমন্বয়ে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে যেকোনো নাগরিক জরুরি বিপদে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তার আবেদন করতে পারবেন। আবেদন পাওয়ার পর সরকারের বিশেষায়িত উদ্ধার ও সহায়তা টিম প্রতিদিন অন্তত ৫০ জন বা তার বেশি মানুষকে সরাসরি উদ্ধার কিংবা প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেবে। প্রকল্পটির সার্বিক তদারকির দায়িত্ব থাকবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হাতে।
স্বচ্ছতা নিশ্চিতে দুদকের কঠোর নজরদারি
প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সরাসরি সুপারভাইজারের ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে অ্যাপের মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সরকারি সময় ও অর্থের অপচয় করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
বাস্তবায়নের পথে অগ্রগতি
সম্প্রতি পরিকল্পনা সচিবের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর আজ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে প্রকল্পটির লিখিত প্রস্তাবনা জমা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে যুগ্ম সচিবের তত্ত্বাবধানে ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোফাইল (ডিপিপি) প্রস্তুতের কাজ চলছে। সরকারি নথির ‘সবুজ পাতায়’ অন্তর্ভুক্তির পর এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পুনরায় পরিকল্পনা সচিবের দপ্তরে পাঠানো হবে।
বৈশ্বিক মডেল হওয়ার সম্ভাবনা
প্রকল্পটির মূল প্রস্তাবক আনবিক সৃজনশীল গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব দি আবদুল্লাহ আল মাসুম। তিনি ১২টি নতুন আইডিয়ার স্রষ্টা হিসেবে পরিচিত, যার মধ্যে তিনটি ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়ে সমাজে উল্লেখযোগ্য কল্যাণ বয়ে এনেছে। তার মতে, একটি নতুন আইডিয়াই নোবেল পুরস্কার কিংবা বিশ্বব্যাপী বিপ্লব ঘটাতে পারে। যেমন ড. ইউনূস একটি আইডিয়ার জন্য নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন! একটি আইডিয়া একজন উদ্যোক্তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দশজন ধনীর একজনে পরিণত করতে পারেন। যেমন ফেসবুক আইডিয়াটির মাধ্যমে মার্ক জুকারবার্গ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দশ ধনীর একজন হয়েছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, এই উদ্যোগ বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্তত ৩০টি দেশে অনুসরণযোগ্য মডেল হয়ে উঠবে।
প্রস্তাবিত ধারণাটি নিয়ে প্রায় ৭০ হাজার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ওপর সমীক্ষা চালানো হয়েছে, যেখানে সব শ্রেণির মানুষ একে একটি যুগান্তকারী ও ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ সচিব সাইদুর রহমান বলেন, এটি একটি অত্যন্ত জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ। যথাযথভাবে ডিপিপি প্রস্তুত করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ সচিব শাকিল আখতার জানান, প্রকল্পটি যদি সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত ও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে বাংলাদেশ মানবিকতার ক্ষেত্রে বিশ্বের জন্য এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠবে।
প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিকতার এই মেলবন্ধন ইতিহাসের এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। পুরো জাতি এখন ‘বিপদের বন্ধু’ প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। ডেইলি বিজনেস ফাইল পত্রিকার প্রধান সম্পাদক অভি চৌধুরীসহ একাধিক গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বও এই জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
লেখক: শারমীন আঁখি, সাবেক সংবাদকর্মী, বিবিসি।



