নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে বিতর্ক: সুপ্রিম কোর্টে রিট
স্টাফ রিপোর্টার :
প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে একটি রিট পিটিশন দায়ের হওয়ায় দেশে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা ওই রিটে নির্বাচন ও গণভোটের বৈধতা, নিরপেক্ষতা এবং সাংবিধানিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
রিট পিটিশন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, এটি কোনো সাধারণ নির্বাচন-সংক্রান্ত বিরোধ নয়। বরং এতে নির্বাহী বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক কাঠামো সরাসরি আলোচনায় এসেছে।
রিটে কী বলা হয়েছে
সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে দায়ের করা রিটে বলা হয়, নির্বাচন আচরণবিধি ২০২৫ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO) ১৯৭২ লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি।
রিটে দাবি করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। নির্বাচন আচরণবিধির ২০ ও ২৭ বিধি এবং RPO-এর ৯১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। রিটে উল্লেখ করা হয়, একবার রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে নির্বাহী বিভাগ প্রচারণায় নামলে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহারের অভিযোগ
রিটে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, গণভোটের পক্ষে প্রচারণার জন্য একটি সরকার পরিচালিত ওয়েবসাইট ব্যবহার করা হয়েছে। রিটকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ভোটারদের মতামত প্রভাবিত করতে রাষ্ট্রের অবকাঠামো ব্যবহারের নজিরবিহীন ঘটনা। আইন বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সরকারি কর্মকর্তারা যদি প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন, তবে তা নিরপেক্ষ প্রশাসনের ধারণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একজন জ্যেষ্ঠ সাংবিধানিক বিশ্লেষক বলেন, “এটি ব্যক্তিগত অনিয়মের বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহারের প্রশ্ন।”
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে
রিটে নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তাকে অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পিটিশনকারী জানান, ২০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রমাণ সংযুক্ত করে কমিশনকে নোটিশ দেওয়া হয়। কমিশন নোটিশ গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সংবিধানের ১১৯ ও ১২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সাবেক এক নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা বলেন, “কমিশনের নীরবতাও এক ধরনের সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।” ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা সংবিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট
রিটে একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রিটকারীর যুক্তি, নির্বাচন ও গণভোট দুটি ভিন্ন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। এগুলো একসঙ্গে আয়োজন করলে ভোটার বিভ্রান্তি, প্রচারণার সীমারেখা অস্পষ্ট হওয়া এবং সংসদীয় নির্বাচনের গুরুত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
একজন সাংবিধানিক আইন অধ্যাপক বলেন, “গণভোটের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার মান আরও বেশি হওয়া প্রয়োজন।”
জনস্বার্থ মামলা হিসেবে রিট
রিটটি জনস্বার্থ মামলা হিসেবে দায়ের করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও নাগরিক অধিকার হুমকির মুখে পড়লে যে কোনো নাগরিক আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। রিটে নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা বেআইনি ঘোষণা, নির্বাচন ও গণভোট প্রস্তুতিতে স্থগিতাদেশ এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আদালতের সিদ্ধান্ত
আইন বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার প্রভাব কেবল আসন্ন নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আদালতের রায় ভবিষ্যতে রাষ্ট্রক্ষমতা, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক সীমারেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। শুনানি ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে রাষ্ট্র নিজেই যদি প্রচারণায় যুক্ত হয়, তবে সেই নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ থাকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন আদালতের ওপরই নির্ভর করছে।



