বয়সের সঙ্গে বদলায় শরীরের পুষ্টির চাহিদা
অনলাইন ডেস্ক :
প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ভালো থাকতে সুষম খাবার দরকার, এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের প্রয়োজন এক থাকে না। যে খাবার শৈশবে খুব দরকার, তা প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে কম প্রয়োজন হতে পারে। আবার বয়স বাড়লে কিছু পুষ্টি উপাদানের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। তাই সুস্থ থাকতে বয়স অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি।
পুষ্টি ও বয়সের সম্পর্ক বোঝাতে একটি পুরোনো উদাহরণ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যে খাদ্য সংকটের কারণে সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছিল। প্রতিটি পরিবার নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার পেত, যাতে সবাই অন্তত ন্যূনতম পুষ্টি পায়। তখন চিনি রেশনভুক্ত থাকলেও দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য চিনি বরাদ্দ ছিল না।
১৯৫৩ সালে চিনি রেশনিং উঠে গেলে প্রাপ্তবয়স্কদের চিনি খাওয়ার পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যায়। অনেক বছর পর গবেষকরা লক্ষ করেন, জীবনের শুরুতে কম চিনি খাওয়ার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ওপর পড়ে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় যুক্তরাজ্যে ১৯৫১ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রায় ৬৩ হাজার মানুষের স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, যেসব শিশু গর্ভাবস্থা ও জীবনের প্রথম এক হাজার দিনে কম চিনি পেয়েছিল, তাদের পরবর্তী জীবনে হৃদরোগ, হার্ট ফেইলিউর ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলক কম ছিল।
এ থেকে বোঝা যায়, সব বয়সেই অতিরিক্ত চিনি ক্ষতিকর। তবে শুধু চিনি নয়, বয়সভেদে ভিন্ন ভিন্ন পুষ্টি উপাদান শরীরের জন্য বেশি প্রয়োজন হয়।
শৈশব ও কৈশোরে পুষ্টির গুরুত্ব
শৈশব ও কৈশোরে শরীর এবং মস্তিষ্ক দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই সময়ে পর্যাপ্ত শক্তি ও পুষ্টি না পেলে তার প্রভাব সারা জীবনে থেকে যেতে পারে। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের চর্বি শিশুদের জন্য উপকারী হলেও বড়দের ক্ষেত্রে তা সীমিত রাখা ভালো।
এই বয়সে আয়রন, আয়োডিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এবং বিভিন্ন ভিটামিন শরীরের গঠন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফল, শাকসবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজ নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছোট মাছ, ডাল, শাক এবং মৌসুমি ফল শিশুদের জন্য সহজলভ্য ও পুষ্টিকর উৎস।
গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ভবিষ্যতে হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
কিশোর বয়স ও বিশের দশক
কৈশোর ও বিশের দশক হলো হাড় ও পেশি গঠনের শেষ ধাপ। পড়াশোনা, কাজ এবং মানসিক চাপ এই সময়ে বাড়ে, ফলে শরীরের পুষ্টির চাহিদাও বৃদ্ধি পায়।
এই বয়সে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, আয়রন, প্রোটিন এবং বি ভিটামিন বিশেষভাবে প্রয়োজন। যাদের মাসিক হয়, তাদের আয়রনের ঘাটতির ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই শাকসবজি, ডাল, মাছ, ডিম এবং পরিমিত মাংস খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি।
ফল, শাকসবজি ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার শুধু শরীর নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
মধ্য বয়সে খাদ্যাভ্যাস
মধ্য বয়সে এসে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে খাবার বাছাই করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই সময়ে হাড় ক্ষয়, ওজন বৃদ্ধি এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এই বয়সে হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা এবং হাড় ও পেশির শক্তি বজায় রাখা প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য, বাদাম, ডাল, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার নিয়মিত খেলে সুস্থ বার্ধক্যের সম্ভাবনা বাড়ে।
সামুদ্রিক মাছের ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি বয়সের সঙ্গে পেশি ক্ষয় রোধে পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ জরুরি।
বার্ধক্যে পুষ্টির ভূমিকা
বয়স বাড়লে শরীরের শক্তির চাহিদা কমে যায়, কিন্তু পুষ্টির প্রয়োজন কমে না। বরং এই সময়ে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এবং ভালো মানের প্রোটিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
দুধ, দই, ছোট মাছ, শাকসবজি এবং ডাল থেকে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। রোদে কিছু সময় কাটালে এবং তৈলাক্ত মাছ খেলে ভিটামিন ডি পাওয়া সম্ভব, যা বাংলাদেশের আবহাওয়ায় তুলনামূলক সহজ।
এই বয়সে হজমের সমস্যা বাড়তে পারে। ফল ও শাকসবজিতে থাকা ফাইবার অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন ডি বা প্রিবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট উপকার দিতে পারে।
জীবনের প্রতিটি ধাপে শরীরের পুষ্টির চাহিদা আলাদা। শৈশবে সঠিক খাবার ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করে, যৌবনে তা সুস্থ অভ্যাসে রূপ নেয়, মধ্য বয়সে রোগের ঝুঁকি কমায় এবং বার্ধক্যে জীবনমান ভালো রাখতে সহায়তা করে। বয়স অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাসে সচেতন পরিবর্তন আনলে দীর্ঘদিন সুস্থ ও সক্রিয় থাকা সম্ভব।
সূত্র : বিবিসি



