‘লুটিয়াল আগলিজ’ কী, কীভাবে এটি নারীদের প্রভাবিত করে?
এলা কিপলিং
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩১ পিএম
মাসিক শুরুর কয়েক দিন আগে হঠাৎ করেই নিজেকে কম আকর্ষণীয় মনে করেন অনেক নারী। কারও মুখে ব্রণ ওঠে, কারও ত্বক নিস্তেজ হয়ে যায়, আবার কেউ অকারণেই ক্লান্ত, বিরক্ত বা মন খারাপ অনুভব করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই অভিজ্ঞতাকে বলা হচ্ছে ‘লুটিয়াল আগলিজ’।
কিন্তু এটি কি শুধুই মনের ভুল, নাকি এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাসিক চক্রের একটি স্বাভাবিক হরমোনগত পরিবর্তনই এসব শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের জন্য দায়ী।
‘এটা কি শুধু আমারই মনে হচ্ছে, নাকি আমি পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত মানুষ?’— টিকটকের ক্যামেরার সামনে এমন প্রশ্ন ছুড়ে দেন ৩০ বছরের এক নারী।
ভিডিওটি ২৪ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে এবং শত শত নারী মন্তব্য করে জানিয়েছেন, তারাও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান।
একজন লিখেছেন, ‘এটা যেন হুবহু আমার কথাই।’ আরেকজনের মন্তব্য, ‘এতটা বাস্তব হতে পারে, ভাবতেই পারিনি।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের হাজারো ভিডিও ছড়িয়ে রয়েছে, যেখানে নারীরা ‘লুটিয়াল আগলিজ’ নামে পরিচিত এক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন।
তাদের দাবি, মাসিক শুরুর আগের কয়েক দিনে তাদের চেহারা, ত্বক, শরীর ও মানসিক অবস্থায় এমন পরিবর্তন আসে, যা তাদের নিজেকে কম আকর্ষণীয় মনে করায়।
লুটিয়াল ফেজ কী?
লুটিয়াল ফেজ হলো মাসিক চক্রের দ্বিতীয়ার্ধ, যা ডিম্বস্ফোটনের পর শুরু হয় এবং মাসিক শুরুর মাধ্যমে শেষ হয়। এ সময় শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়, আর প্রোজেস্টেরনের মাত্রা বেড়ে যায়।
নারীর হরমোন বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক ডা. লুইস নিউসন বলেন, এই হরমোনগত পরিবর্তন শুধু মানসিক অবস্থাই নয়, ত্বক, ঘুম এবং শরীরের ওপরও প্রভাব ফেলে।
তার ভাষায়, ‘হরমোন ত্বক ও কোলাজেনকে প্রভাবিত করে। ফলে অনেকের ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, উজ্জ্বলতা কমে, ব্রণ দেখা দেয়। শরীরে পানি জমে ফোলাভাব তৈরি হতে পারে এবং স্তনের আকৃতিতেও পরিবর্তন আসে।’
মনে হয় মস্তিষ্ক ধীরে কাজ করছে
লন্ডনের ২৫ বছর বয়সী অভিনেত্রী ও আতিথেয়তা খাতের কর্মী এলেনা স্প্যাভেন বলেন, লুটিয়াল ফেজে তিনি প্রচণ্ড ফোলাভাব অনুভব করেন। আমার ত্বক নিস্তেজ লাগে, মুখ ক্লান্ত দেখায়, আর বুক ভারী ও ব্যথাযুক্ত মনে হয়।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের প্রজনন ও মলিকুলার জেনেটিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলেন ও’নিল জানান, মাসিকের আগের দিনগুলোতে ইস্ট্রোজেন কমে এবং প্রোজেস্টেরন বেড়ে যাওয়ায় ত্বকে তেল উৎপাদন বাড়ে। একই সঙ্গে শরীরে পানি জমে মুখ ফুলে যেতে পারে, পেট ফেঁপে ওঠে এবং স্তন সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।
এলেনা আরও বলেন, ‘এই সময় আমি ভীষণ ক্লান্ত ও অনুপ্রেরণাহীন থাকি। মনে হয় আমার মস্তিষ্ক ধীরে কাজ করছে। আমি বেশি ভুলে যাই, অমনোযোগী হয়ে পড়ি এবং মানুষের সঙ্গে মিশতেও ইচ্ছা করে না।’
কর্মজীবন ও সামাজিক জীবনেও প্রভাব
ডা. নিউসনের মতে, নারীরা এখন আগের চেয়ে বেশি এ বিষয়ে কথা বললেও অনেকেই জানেন না কীভাবে এই সময়ের সমস্যাগুলো মোকাবিলা করবেন।
তিনি বলেন, ‘অনেক নারী সত্যিই কষ্ট পান। এটি তাদের কাজ, সামাজিক জীবন এবং দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে।’
তিনি আরও বলেন, পুরুষদের ক্ষেত্রে হরমোনজনিত সমস্যাকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, নারীদের ক্ষেত্রে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে
৩০ বছর বয়সী ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হেনরিয়েটা বলেন, লুটিয়াল ফেজে তিনি খুব সহজেই বিরক্ত হয়ে যান। আমি যদি হঠাৎ আমার শান্ত ও হাসিখুশি সঙ্গীর ওপর রেগে যাই, তাহলে বুঝি হয় আমি ঠিকমতো খাইনি, কফি খাইনি, নয়তো আমি লুটিয়াল ফেজে আছি।
বন্ধুদের সঙ্গেও এ সময় তার আচরণ বদলে যায়। কখনো অতিরিক্ত ব্যক্তিগত কথা বলে পরে অনুতপ্ত হন, আবার কখনো সবাইকে এড়িয়ে চলেন।
হতাশা, দুশ্চিন্তা ও আত্মবিশ্বাসের সংকট
হেনরিয়েটা জানান, এই সময়ে তিনি তীব্র হতাশা অনুভব করেন। অতীতের বিব্রতকর বা কষ্টের স্মৃতিগুলো বারবার মনে পড়ে। কখনো দৃষ্টিও ঝাপসা লাগে, সাধারণ শব্দ মনে করতে কষ্ট হয় এবং কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি মনে করেন, এ বিষয়ে সমাজে আরও সচেতনতা প্রয়োজন।
মাসিক শুরু হলে এসব উপসর্গ ধীরে ধীরে কমে যায় এবং তিনি স্বস্তি অনুভব করেন।
এটা শুধু পিএমএস নয়
৩৬ বছর বয়সী উদ্যোক্তা ও দুই সন্তানের মা শার্লট ডডস বলেন, অনেকেই এসব সমস্যাকে শুধু পিএমএস বলে উড়িয়ে দেন।
তারও মুখে ব্রণ, শরীর ফোলা এবং মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়, যা আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দেয়।
তিনি বলেন, আমি স্বনিযুক্ত। তাই হরমোনের কারণে আমার কাজ বন্ধ রাখার সুযোগ নেই।
কীভাবে উপসর্গ কমানো যায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, লুটিয়াল ফেজ সম্পর্কে সচেতন হওয়াই প্রথম ধাপ। এটি একটি স্বাভাবিক, সাময়িক এবং পূর্বানুমানযোগ্য পর্যায়—এ কথা মনে রাখা জরুরি।
ডা. হেলেন ও'নিল ও ডা. লুইস নিউসনের পরামর্শ—
• পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
• সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খান।
• অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার কম খান।
• অ্যালকোহল ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন।
• নিয়মিত হালকা শরীরচর্চা করুন।
• উপসর্গ তীব্র হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ডা. নিউসন বলেন, ‘নারীদের নিজেদের সমস্যাকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজন হলে একাধিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই এসব উপসর্গ নিজে থেকেই চলে যায় না।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, লুটিয়াল ফেজের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন বাস্তব। তবে সঠিক জীবনযাপন, পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসার মাধ্যমে এর প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
বিবিসি থেকে ভাষান্তর : মাকসুদা রিনা



