শনিবার   ১৬ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ১ ১৪২৬   ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

উত্তর দক্ষিণ

প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট ২০১৯  

পর্ব : ৬ 

গভীর রাত। হাসপাতালে প্রথম রাত্রি। কেবিন নম্বর ৮১১। এসি চলছে, দরজা জানালা বন্ধ। বাহিরের কোনো সারা শব্দ নেই। খুব শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। কিন্তু অশান্ত মন, অস্থির চিন্তা-ভাবনা। খুব ক্লান্ত শরীর তবুও আমার চোখে ঘুম নেই। বুঝতে পারি সীমার চোখেও ঘুম নেই। সীমার এখনকার ভাবনার কথা আমি জানি না। এটুকু বুঝতে পারি সে এখনও আশা করছে তার ক্যান্সার হয় নি। 


কিন্তু আমি নিদারুণ অসহায়ত্বের মাঝে কঠিন এক বহুমুখী দুর্ভাবনায় তলিয়ে যাই। যার কোনো পাদদেশ নাই। তার অতলে চলে আমার বিরামহীন নেমে যাওয়া। আমি কেবল নামছি আর নামছি। কোথায় যে এর শেষ কে জানে। আমার স্বল্প জ্ঞান তাতে যতটুকু বুঝি অনেক বড় সমস্যা আমাদের এই ছোট্ট পরিবারে নেমে এসেছে। এ সমস্যা যেমন-তেমন সমস্যা নয়। রাজ রোগ। সর্বনাশী চরিত্র। আতঙ্ক ফেলে দেয় মুহূর্তে। শরীর শীতল হয়ে আসে জীবদ্দশায়। আশ্চর্য, আমি প্রায় বলতাম- দেখো সীমা আমার ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা অনেক। আরও অনেক দুশ্চিন্তার সাথে এই ভয়টি আমাকে সারাটি জীবন আকড়ে থেকেছে। বহু বছর ধরে আমার শরীরে অনেক টিউমার। যে দেখে সে-ই চিন্তিত হয়ে যায়। নানা উপদেশে দেয়। আর আমি ভিতরে ভিতরে ভীত হতে থাকি।

 

একবার আমার দুই সাংবাদিক বন্ধু এহসানুল হক বাবু আর নাজমুল আশরাফ তারা ঢাকায় কোথায় যেনো ক্যান্সারের উপর এক কর্মশালা করে এসেছে। সেটা আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে। কি একটা কাজে তিনজনে আমি, বাবু, আশরাফ এক রিক্সায় যাচ্ছি নিউমেট্রো হল হয়ে কালীরবাজারের দিকে। যখন কুমুদিনীর বড় গেটটি পার হচ্ছি ঠিক তখন বাবুর চোখ পড়ে আমার হাতের উপর। সে খুব চিন্তিত হয়ে বলে- জামাল, তোর হাতে এগুলো কী ? আমি বলি জমাকৃত চর্বি।

 

বাবুু কৌতূহল বেড়ে যায়- বলে এতো কেনো। এ যে টিউমার। লক্ষণ ভালো নয়। সাথে নাজমুল আশরাফ এর উপর সদ্য জ্ঞান যতটুকু ছিলো তা ঢেলে দেয়। আমি ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড অসহায়বোধ করলেও বাহিরে তার এক ফোটাও প্রকাশ করি না। তবে মনে মনে আল্লাহকে ডাকি- যত তাড়াতাড়ি রিক্সা গন্তব্যে পৌঁছে যায় তত আগে তাদের থেকে রেহাই পাই।

 

আমার হাতের এই টিউমার নজরে প্রথম আসে দুবাই হাকিম ভাইয়ের কনসেপ্ট বিজ্ঞাপনী সংস্থার অফিসে, ১৯৮৯ সনে। তখন দু-একটা ছিলো। জামাল, তোমার হাতে এগুলো কী কখনও খেয়াল করেছো, হাকিম ভাই জানতে চান। আমি বললাম- না হাকিম ভাই, এইমাত্র আমিও দেখলাম। তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কোনো কথা বলছেন না। সেই যে ভয়ের কাল শুরু হলো তা প্রচুর কাজের মাঝে আমি ভুলে থাকতে চেয়েছি। সব দ্রুত শেষ করতে চেয়েছি। মানব জনম স্বার্থক করে তুলতে চেয়েছি। যে যত ভালো-মন্দ কথাই বলুক আমার ভয় সেটে আছে সর্বাঙ্গে। এ ভয় ভুলে থাকার লক্ষ্যে আমি আরও কাজের মধ্যে ডুবে থাকি। 

 

তখন থেকেই মনে হয়েছিলো আমার প্রচুর টাকা কামিয়ে রাখতে হবে। সময় হলে আমার এগুলোর চিকিৎসা যেনো করাতে পারি। এভাবেই এক সময় আমার অভ্যাস হয়ে যায় শুধু কাজের মধ্যে ডুবে থাকা। আমি আনন্দও পাই সেখানে প্রচুর। তবে আশে পাশের এমনকি ঘরের মানুষও ভাবে আরেক বিষয়। তারা আমাকে সকলে মিলে পঙ্কিলতার সর্বনিম্নে পৌঁছে দেয়!  তার মধ্যে একজন অন্যতম। তিনি বেঢক আকারের বিগত যৌবনা সর্বোপরি একজন অসুখী মানুষ। তাতে আমি হতাশ হই না, নিজের মতই করেই চলতে থাকি। আর ভাবি যার যতটুকু জ্ঞান কিংবা খেয়াল সে তার বাহিরে যায় কি করে ?

 

বিগত জীবনে ভেবে আসলাম একদিন আমার ক্যান্সারের সংবাদ প্রকাশ পাবে। আমার বাবা প্রায় অনেকটা সময় আমাকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। আমার লিভার খারাপ হয়ে যেতে পারে যেকোনো সময়। এমন একটা সংবাদ যে কোনো সময় আসতে পারে এ নিয়ে তিনি খুব চিন্তিত ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর আমার বড় ফুপুর নিকট আব্বার এই আশাঙ্কার কথা আমি জানতে পারি। অনেকদিন ধরে এই দুশ্চিন্তা-ভাবনা গায়ে স্থায়ী ভাবে লেগে যায়। ভয় ঢরের মধ্যেই চলি। বেশির ভাগ সময় কাজের মধ্যে ডুবে থাকি। এ ভাবে খুব একটা মনে পড়ে না। 

 

কিন্তু হঠাৎ সীমার এই দুঃসংবাদ আমাকে বিহ্বল করে তোলে। বড্ড অসহায় করে ফেলে। বহু কারণে একটা অভিমান বাসা বেঁধে ছিলো আমার বুকে। তাই বেঁচে থাকার খুব একটা আগ্রহ আমার কাজ করতো না। তার মধ্যে আমাকে নিয়ে নানা পারি-পার্শ্বিকতা। এর মধ্যে হাফ ¯ি¬প সার্ট বা গেঞ্চি পড়লেই হলো। সবাই এ প্রসঙ্গে কথা ওঠাবে। অন্যদিকে ব্যবাসায়িক নানা টানা পোড়ন জটিলতা কিংবা সেখানে ধারাবাহিক ব্যর্থতা আমাকে জীবনের প্রতি অনীহা করে তোলে। আমি ভাবতাম, আমার কিছু হলে হোক। সীমা সব দেখবে। 


বিশেষ করে সামিরের মা প্রয়োজন। এমনিতে স্বল্প আয়ু আমার নানা মুখে সেতো বহু আগে থেকেই শোনে আসছি। বড় বড় রোগের ভয়। বড্ড ব্যয়বহুল চিকিৎসা। যে ভয় ধরতে গেলে সারাটি জীবন করে এসেছি শেষ পর্যন্ত সেই ভয়ানক রোগ বাসা বেঁধেই ছাড়লো আমার ঘরে ! একেবারে আমার শয্যায়। 
সামনের দিনগুলোর কথা মনে করে আমার সর্বাঙ্গ শীতল হয়, নিথর হয়। বুকের মাঝে কঠিন শূন্যতা নেমে আসে।

 

সারাটা জীবন আমি বহু কষ্ট করেছি। বহু যন্ত্রণা সহ্য করেছি। একটু ভালো থাকার আশায় কত জায়গায় ছুটে বেড়িয়েছি। এখান থেকে ওখানে। যে যা বলেছে তার বেশির ভাগ কাজ করে ফেলেছি। লাগাতার পরিশ্রম করেছি। বিশ্বাস হয় শুধুমাত্র কিছু টাকা জমিয়ে প্রথমে চিকিৎসার করার লক্ষ্যে। আর ছিলো ছেলেটিকে মানুষের মতো মানুষ করার চেষ্টা। পরিবার নিয়ে সমাজে সম্মানের সাথে নিজেদের মেরুদ- সোজা রাখা। 

 

শেষ পর্যন্ত আমি প্রতিটি স্থানে পরাজিত হই। আমার এই ব্যর্থতার পিছনে সর্বপ্রথম মাত্র দুজন মানুষ জড়িত। তাদের লোভে আমার সকল লাগাতার নিরবচ্ছিন্ন দানবিক পরিশ্রম জলে যায়। তাদের নীচ লোভ-লালসা আমাকে পর্যদস্তু করে। যাদের আমি কোনোদিন ক্ষমা করি নি এবং বাকি সময়ে ক্ষমা করবো না। যিনি এর মধ্যে নাটের গুরু সে সাক্ষাত একজন শয়তান। সে নিজে কখনও সরাসরি কিছু করে নি। 

 

কোথায় কোন অলক্ষ্যে কোন গভীর রাতে আমবস্যার কালো অন্ধকারে কাকে চাবি দিলে সব বানের পানির মতো চলে আসবে সে ভালো করে জানতো। তার অদৃশ্য ইশারায় যাদুর মতো সব সব একের এক ঘটে যায়! এ মন্ত্র যেনো সে নির্ভুল কামরূপকামাক্ষ্যা থেকে শিখে এসেছে। অনেকেই ভাবতে পারে, একজন মানুষের পক্ষে এও কি সম্ভব? আমি সরাসরি ভুক্তভোগী, আমি জানি কেমন করে তার তা সম্ভব।

 

এ জীবনে যা দেখলাম তার বাস্তবতা হলো কোনো কোনো সংসারে অপছায়াগুলো একেবারে গা ঘেঁষে ঘেঁষে থাকে। তার প্রভাবে নিজের ছায়াটুকুও বার বার বিশ্বাসঘাতক হতে চায়। নিজের ছায়াতো মায়া কিছুটা থাকে বৈকি তাই অন্য সবের তুলনায় কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে বলে সে তেমন বেঁকে বসতে পারে না। তবে যখন তখন তীব্র আক্রোশ দেখিয়ে বেড়ায়!

 

এই রকম কঠিন নানা প্রতিবন্ধকতার মাঝে আর্থিক সচ্ছলতা আমার সংসারে আমি কোনোদিন আনতে পারি নি। এটা সর্বতো সত্য। যা আবার অনেকে বিশ্বাস করে না। বলি, যার উপর-নীচসহ চারিদিক যদি থাকে শক্ত উচ্চ প্রাচীরের ন্যায় ভয়ার্ত বুকে কাঁপন ধরে এমন মেঘাচ্ছন্ন গভীর অন্ধকার কার সাধ্যি তা অতিক্রম করে আলোর মুখ দেখে। শত চেষ্টা করেও আমি পারি নি কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে। একটু ভালো থাকতে। কী করে পারবো? যার নিজের ছায়াই যখন মুখ ঘুরিয়ে নেয়। অবাধ্য হয়। অপছায়াগুলোর সাথে নিমিষে মিশে যায় তখন জীবন যে কতটা অমোহনীয় ফ্যাকাসে হয়ে ওঠে তা কাউকে সহজে বোঝানো মুশ্কিল। 

 

তারপর আরও রূঢ় বাস্তবতা হলো যাদের হাত ধরে উপরে আলোর দিকে এগিয়ে যাবার কথা। যারা যে কোনো অশুভ ঝড়-ঝঞ্জায় সামনে এসে মোকাবেলা করার কথা। তারাই যদি প্রতিবন্ধক হয়ে নয় শুধু নিজের স্বার্থে অন্ধকারে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় তখন নতুন পথে নামা মানুষের আর কি করার থাকে! বিশ্বাস পরে আর কাকে করা যায়?

 

এ ধাক্কা আবার যেমন তেমন ধাক্কা নয়। স্নেহ-ভালোবাসার আবরণে, সময় উপয়যোগী নয় তাদের এমন অসহায়ত্বের চরম বর্হিপ্রকাশের অভিনয়ের মারপ্যাঁচে। যাকে বলে ইমোশনাল ব্ল্যাক মেইলিং, তা যদি হয় নিখুঁত। তখন? তখনতো সখেদে অনেকেই খাদে পড়ে যাবে। মনে থাকে না যে, বলছি নতুন পথে নামা মানুষগুলোর জীবন ওখানেই শেষ নয়। তারওতো পাখপাখালী ইতিমধ্যে গজিয়েছে। তাদের কী হবে? সেই পাখ-পাখালীর কী হবে? যাদের ন্যায্য পাওনা তাদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য কী রেখে যাওয়া হলো?

 

নানা চিন্তায় তন্দ্রা চলে আসে। তবে কোনো ভাবেই ঘুমালে চলবে না। সীমার একটি ঔষধ রাত দেড়টায়। সারাদিনের মানসিক ও শারীরিক ধকলে ঘুম মাঝে মধ্যে চলে আসছে বৈকি। ঘুমেরতো কোনো দোষ নেই। সে-তো আসতেই চাইবে। এই নিয়মের মাঝেইতো শারীরিক মঙ্গল। অবশ্য আমি আমার দুটি মোবাইলে এলার্ম সেট করে রেখেছি। এখন ঘুমালেও পারি। 


কিন্তু যদি মিস হয়ে যায়। তাই সীমার একেবারে সামনে শুয়ে আছি। বিপরীতমুখী আরামদায়ক হাসপাতালের স্প্রিংযুক্ত পালঙ্ক থাকার পরও সীমার বেডের সামনে নীচে চাদর বিছিয়ে শুয়ে আছি যেনো সীমা যে কোনো প্রয়োজনে আমাকে সহজে দেখতে পায়। খুব বেদনাদায়ক, দেড়টা বাজার কয়েক মিনিট আগেই সীমা আমাকে ডেকে বলে, জামাল- আমার ঔষধ খাওয়ার সময় হয়েছে। আমাকে ঔষধ দাও।


তার মানে সীমা ঘুমাই নি। তার ঔষধ যেনো মিস না হয়ে যায় তার জন্য সে ঘুমাই নি। কেবিনের ভিতর হালকা অন্ধকারে আমার দুচোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। ওকে বুঝতে দেই না। সীমাকে বলি- দিচ্ছি সীমা। তোমার ঔষধ আমার হাতেই আছে। (চলবে...)

 

এটিএম জামাল
সোনারগাঁ ভবন, মিশনপাড়া, নারাযণগঞ্জ
৩১ জুলাই, ২০১৯