Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

ব্রাজিলে প্রথম দফার ভোটে লুলাকে পেছনে ফেললেন বলসোনারো, লড়াই গড়াল ‘রানঅফে’

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৭ পিএম

ব্রাজিলে প্রথম দফার ভোটে লুলাকে পেছনে ফেললেন বলসোনারো, লড়াই গড়াল ‘রানঅফে’

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লিবারেল পার্টির (পিএল) প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো। রোববার প্রথম দফার ভোটের পর প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার সঙ্গে রানঅফে মুখোমুখি হচ্ছেন তিনি। ছবি: রয়টার্স

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও বামপন্থি নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে পেছনে ফেলেছেন ডানপন্থি সেনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো।

তবে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পাওয়ায় সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেননি ফ্লাভিও। ফলে আগামী ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার (রান অফ) ভোটে লুলার সঙ্গে তার লড়াই হবে।

বিবিসি লিখেছে, ৯৯ শতাংশ ভোট গণনার পর ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৭ দশমিক ০৩ শতাংশ ভোট, আর লুলা পেয়েছেন ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ।

নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে লুলা প্রায় তিন শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে থাকবেন বলে ধারণা করা হয়েছিল। ফলে প্রথম দফায় ফ্লাভিওর এই ফলাফলকে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ফ্লাভিও সাবেক বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে হেরে যাওয়ার পর ‘অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগে জাইর বলসোনারো ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

প্রথম দফার ভোটের ফল প্রকাশের পর ব্রাসিলিয়ায় সাংবাদিকদের ফ্লাভিও বলেন, “ব্রাজিল পরিবর্তন চায় এবং আমি ফলাফলে খুবই আনন্দিত।”

তিনি লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির শাসনের ‘সমাপ্তির’ কথাও বলেন।

অন্যদিকে সাও পাওলোতে সমর্থকদের উদ্দেশে লুলা বলেন, প্রথম দফাতেই তিনি জিতবেন বলে নিশ্চিত ছিলেন। তবে এখন নতুন করে প্রচার শুরু করে ভোটারদের সামনে তার সরকারের অর্জন তিনি তুলে ধরবেন।

“খেলা এখন শুরু হতে যাচ্ছে। আমরা অতিরিক্ত সময়ে আছি। অতিরিক্ত সময়েই আমরা ব্রাজিলের জনগণের সমর্থন জয় করব,” বলেন লুলা।

প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল

রয়টার্স বলছে, নির্বাচনের আগে জনমত জরিপগুলো ফ্লাভিওর তুলনায় লুলাকে এগিয়ে রেখেছিল। কিন্তু ভোটের ফলে সেই হিসাব বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।

ইগারাপে ইনস্টিটিউটের সহপ্রতিষ্ঠাতা রবার্ট মুগা বলেন, জনমত জরিপকারীরা বড় ধরনের ভুল করেছেন। দ্বিতীয় দফার ভোটের জরিপেও ফ্লাভিওর অবস্থানকে কম করে দেখানো হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম দফার নির্বাচনে বাদ পড়া প্রার্থীদের মধ্যে ডানপন্থি ভোটের একটি বড় অংশ রয়েছে। ফলে দ্বিতীয় দফায় ফ্লাভিও সুবিধা পেতে পারেন।

প্রথম দফার ফলাফলে গভর্নর, সেনেটর ও ফেডারেল ডেপুটি পদে ফ্লাভিওর লিবারেল পার্টি সবচেয়ে ভালো ফল দেখিয়েছে। ফলে কংগ্রেসেও দলটি সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারে।

লাতিন আমেরিকার বেশিরভাগ দেশেই সাম্প্রতিক সময়ে ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, যাদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। ব্রাজিলও সেই পথে যাবে কি না, তা নির্ধারিত হবে দ্বিতীয় দফার ভোটের ফলের মধ্য দিয়ে।

জীবনযাত্রার ব্যয়, অপরাধ ও অর্থনীতি

নির্বাচনি প্রচারে ব্রাজিলের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্নীতি ও নিরাপত্তা ছিল আলোচার প্রধান বিষয়।

দেশে বৈষম্য ও বেকারত্ব কমলেও জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, পরিবারের ঋণের চাপ এবং অপরাধ ও গ্যাং তৎপরতার কারণে অনেক ভোটারের সমর্থন ধরে রাখতে হিমশিম খেয়েছেন লুলা।

জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন ফ্লাভিও। অন্যদিকে লুলা অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ করার উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সহায়তা বাড়ানো এবং পরিবারগুলোর ঋণের বোঝা কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।

ব্রাজিলের সরকারি ব্যয় ও ঋণও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক বিষয় ছিল। দেশটির সরকারি ঋণ জিডিপির ৮২ শতাংশের বেশি হওয়ায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। চলতি ও আগামী বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়ে যথাক্রমে ২ শতাংশ ও ২ দশমিক ৩ শতাংশ করেছে সরকার।

ফ্লাভিওকে ভোট দেওয়া ব্রাসিলিয়ার সরকারি কর্মচারী মার্সিয়ানো দে সুজা এ সিলভা বলেন, “আমি ভোট দিয়েছি যাতে ব্রাজিল আবার প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারে।”

দুর্নীতি

নির্বাচনি প্রচারের সময় নীতিগত বিতর্ককে অনেকটা ছাপিয়ে যায় বিভিন্ন কেলেঙ্কারি এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ।

ব্যাঙ্কো মাস্টারকে ঘিরে একটি বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি ব্রাজিলের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ব্যাংকটির সাবেক প্রধান দানিয়েল ভোরকারোকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে কয়েক বিলিয়ন ডলারের জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তদন্তে ব্রাজিলের রাজনৈতিক অভিজাতদের সঙ্গে ভোরকারোর যোগাযোগ খতিয়ে দেখা হয়েছে। ফ্লাভিওর বিরুদ্ধেও অর্থপাচারের অভিযোগের তদন্ত চলছে; তিনি কোনো ধরনের অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোরকারোকে নিয়ে কেলেঙ্কারিতে রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন পক্ষের নাম এসেছে। ফ্লাভিও স্বীকার করেছেন, তার বাবাকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণে অর্থ দেওয়ার জন্য তিনি ভোরকারোর কাছে অনুরোধ করেছিলেন।

অপরাধ ও নিরাপত্তাও ভোটারদের বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল। ব্রাজিলে হত্যার হার কমলেও রাস্তায় মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের মত অপরাধ বেড়েছে। সহিংসতা ও মাদক পাচার এখনো বড় সমস্যা।

ফ্লাভিও ব্রাজিলের গ্যাংগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা এবং এল সালভাদরের আদলে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগার নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার বাবা জাইর বলসোনারো প্রেসিডেন্ট থাকার সময় নাগরিকদের অস্ত্র রাখার বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছিল।

লুলা অবশ্য ব্রাজিলের গ্যাংগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন। সেই সঙ্গে সংগঠিত অপরাধের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক মোকাবিলা, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত উন্নত করা এবং কারাগারে বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক

নির্বাচনি প্রচারে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। লুলা বিভিন্ন সময়ে ব্রাজিলের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে।

তবে ব্রাজিলের সুপ্রিম ইলেক্টোরাল কোর্টের প্রধান বলেছেন, নির্বাচনে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ডনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন জানাননি। তবে তিনি ফ্লাভিও বলসোনারোকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানিয়েছেন এবং প্রকাশ্যে তার প্রশংসা করেছেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্লাভিও নির্বাচিত হলে ব্রাজিল মাদক পাচারবিরোধী যুক্তরাষ্ট্রের ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ জোটে যোগ দিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে পারে।

তবে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে বাস্তববাদী সম্পর্ক বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন ফ্লাভিও। যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে চীন এখন ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশটির সয়াবিন ও গরুর মাংস রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ বাজার।

দুই প্রার্থীর অবস্থান

লুলা ব্রাজিলের দরিদ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নিম্ন আয়ের মানুষ, ক্যাথলিক ও নারীদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি জনপ্রিয়। তিনি চতুর্থবারের মত প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করছেন।

২০০২ ও ২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ২০২২ সালের নির্বাচনে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরেন লুলা। ওই নির্বাচনে তিনি জাইর বলসোনারোকে দুই শতাংশেরও কম ভোটের ব্যবধানে হারান, যা ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে হাড্ডাহাড্ডি ফলগুলোর একটি।

২০২২ সালের নির্বাচনের পর জাইর বলসোনারোর সমর্থকরা ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি সরকারি বিভিন্ন ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালায়।

জাইর নির্বাচনে নিষিদ্ধ হওয়ার পর তার বড় ছেলে ফ্লাভিওকে প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দেন। রোববারের নির্বাচনে জাইরের স্ত্রী মিশেল বলসোনারোও সেনেটর নির্বাচিত হয়েছেন।

ফ্লাভিও নির্বাচিত হলে তার বাবাসহ ৮ জানুয়ারির দাঙ্গায় জড়িত সমর্থকদের সাধারণ ক্ষমা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চল, তুলনামূলক সচ্ছল ভোটার ও ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের মধ্যে ফ্লাভিওর সমর্থন বেশি।

দ্বিতীয় দফার ভোটে কে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হবেন, তা নির্ধারিত হবে আগামী ২৫ অক্টোবর।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন