চীনের তৈরি যে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে ইরান
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১০:২২ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ক্ষতিগ্রস্ত আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে চীনের তৈরি কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা (ম্যানপ্যাডস) কিনতে যাচ্ছে ইরান। এ বিষয়ে অবগত তিনটি সূত্রের বরাতে বুধবার (২৯ জুলাই) এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।
সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রথম চালানে চীনের তৈরি সর্বোচ্চ ৪০০টি কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ইরানের কাছে পৌঁছাতে পারে।
প্রায় ৬ থেকে ৭ কোটি ডলারের এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ইরানের নেওয়া সবচেয়ে বড় উদ্যোগগুলোর একটি। যুদ্ধের সময় সামরিক স্থাপনা ও কৌশলগত অবকাঠামো রক্ষায় ইরানের সক্ষমতার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চুক্তির আওতায় চীনের তৈরি কিউডব্লিউ-১২ ও এফএন-১৬ মডেলের ৩০০ থেকে ৪০০টি ম্যানপ্যাডস কেনা হবে বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।
তাদের মতে, হংকংভিত্তিক ঝংছিং বাওশাং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে ইরান ও চীনা সরবরাহকারীর মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
কয়েক মাসের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়। জবাবে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
এই সংঘাতে উন্নত যুদ্ধবিমান ও নির্ভুল নির্দেশিত অস্ত্রের বিরুদ্ধে স্থায়ী সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা রক্ষা কতটা কঠিন, তা স্পষ্ট হয়েছে।
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করেই টানা দুই সপ্তাহের বোমা হামলা স্থগিত করে। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনায় সমাধান না এলে আবারও হামলা শুরু হবে। যদিও এপ্রিল থেকে তাত্ত্বিকভাবে সংঘাতটি যুদ্ধবিরতির অবস্থায় রয়েছে।
শত শত ম্যানপ্যাডস সরবরাহ ইরানের স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে। একই সঙ্গে এটি চীনের সঙ্গে তেহরানের সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে সূত্রগুলো সতর্ক করে বলেছে, চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সরবরাহের সময়সূচি, পরিমাণ ও বাস্তবায়নের অন্যান্য বিষয় এখনও পরিবর্তিত হতে পারে।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম দফার চালান পশ্চিম চীনের উরুমকি থেকে আকাশপথে পাঠানো হবে। এরপর পাকিস্তান হয়ে ইরানে পৌঁছাবে। তবে পাকিস্তান অংশে পরিবহন আকাশপথে হবে নাকি স্থলপথে, তা স্পষ্ট করেনি সূত্রগুলো।
পশ্চিমা দুই গোয়েন্দা সূত্র ও এক ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চীনা সামরিক সরঞ্জাম ও দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য উপকরণ আরও গোপনে পরিবহনের জন্য স্থলপথ ব্যবহারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে তেহরান।
গত দুই দশকে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও রাডার প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ করলেও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো দ্রুত বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা যায়, ছোট দল পরিচালনা করতে পারে এবং সহজে স্থান পরিবর্তন করা সম্ভব। ফলে স্থায়ী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাটারির তুলনায় এগুলো কম ঝুঁকিপূর্ণ।
এক ইউরোপীয় নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছেন, তার দেশের কর্তৃপক্ষ কিউডব্লিউ সিরিজের বিভিন্ন ম্যানপ্যাডস; বিশেষ করে কিউডব্লিউ-১২, কিউডব্লিউ-১৮ ও কিউডব্লিউ-১৯ ইরানের কাছে বিক্রির সম্ভাব্য কয়েকটি চুক্তির বিষয়ে অবগত।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আরেক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছেন, ইরান কিউডব্লিউ-১২ ও কিউডব্লিউ-১৮ ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে আগ্রহী ছিল। তবে চুক্তি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
কিউডব্লিউ-১২ ও এফএন-১৬ হলো কাঁধে বহনযোগ্য ইনফ্রারেড-নির্দেশিত ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলো নিম্ন উচ্চতায় উড্ডয়নকারী বিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম। বহনযোগ্য হওয়ায় সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো ও সংবেদনশীল এলাকায় দ্রুত মোতায়েন করা যায়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, কিউডব্লিউ-১২ নতুন কিউডব্লিউ-১৮ বা কিউডব্লিউ-১৯-এর তুলনায় কম সক্ষম হলেও ড্রোন ও নিম্ন উচ্চতার লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করতে এটি কার্যকর প্রতিরক্ষার একটি স্তর তৈরি করতে পারে।
নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানিতে দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদনের পাশাপাশি বিদেশি সরবরাহকারীর ওপরও ইরানের নির্ভরতা অব্যাহত রয়েছে নতুন এই ক্রয়চুক্তি তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, চীনের কাছ থেকে জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার আরেকটি পৃথক চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছিল ইরান। তবে সেই চুক্তি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সূত্র : রয়টার্স



