যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশ থেকে ভারতের তেল কেনা নতুন কিছু নয়: রাশিয়া
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৩১ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে চলতি সপ্তাহে সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে রাজি হয়েছে। তবে এই দাবির পরপরই রাশিয়া স্পষ্ট করেছে, ভারত যেকোনো দেশ থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে স্বাধীন এবং রুশ তেল তাদের একমাত্র উৎস নয়।
ক্রেমলিনের বক্তব্য, ভারতের তেল আমদানিতে উৎস বৈচিত্র্য নতুন কোনো বিষয় নয়। রাশিয়ার দাবি, নয়াদিল্লি বরাবরই একাধিক দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল কিনে আসছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী ভারতের নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন তারা দেখছে না।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরও ভারত প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করছে। রুশ তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারত বর্তমানে দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা। ভারতের মোট তেল আমদানির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসে রাশিয়া থেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবির জবাবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সবাই জানেন—রাশিয়া ভারতের তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের একমাত্র সরবরাহকারী নয়। ভারত সব সময়ই বিভিন্ন দেশ থেকে তেল কিনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়ার বদলে যুক্তরাষ্ট্র বা ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন—এমন কোনো নতুন তথ্য তাদের কাছে নেই বলেও জানান তিনি।
এর আগের দিন পেসকভ বলেন, ভারত রুশ তেল কেনা বন্ধ করবে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা রাশিয়া পায়নি। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, হাইড্রোকার্বন বাণিজ্য মস্কো ও নয়াদিল্লি—উভয়ের জন্যই লাভজনক।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ভারতের রুশ হাইড্রোকার্বন কেনা দুই দেশের জন্যই উপকারী এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। এ খাতে ভারতের অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।
এদিকে রাশিয়ার বেসরকারি রেডিও স্টেশন কোমেরসান্ত এফএম জানিয়েছে, ট্রাম্পের দাবির মতো করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রুশ তেল আমদানি বন্ধের কোনো চুক্তির কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করেননি।
তথ্য বলছে, ২০২১ সাল পর্যন্ত ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক দুই শতাংশ। কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোকে এড়িয়ে চললে, ছাড়মূল্যের রুশ তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতায় পরিণত হয় ভারত।
ভারত যে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তার প্রায় ৮৮ শতাংশই আসে বিদেশ থেকে। একসময় দেশটি প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি রুশ তেল আমদানি করত। পরে তা কমে ডিসেম্বর মাসে প্রায় ১৩ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে এবং চলতি মাসেও এই হার মোটামুটি স্থিতিশীল থাকার কথা।
তবে গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, যার মধ্যে রুশ জ্বালানি কেনার কারণে বাড়তি ২৫ শতাংশ শুল্কও ছিল। এর ফলে জানুয়ারির প্রথম তিন সপ্তাহে ভারতের রুশ তেল আমদানি কমে দাঁড়ায় প্রতিদিন প্রায় ১১ লাখ ব্যারেলে।
ন্যাশনাল এনার্জি সিকিউরিটি ফান্ডের শীর্ষ বিশেষজ্ঞ ইগর ইউশকভের মতে, ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলোর পক্ষে পুরোপুরি রুশ তেল আমদানি বন্ধ করা সহজ নয়। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের শেল তেল হালকা মানের, আর রাশিয়ার উরালস তেল তুলনামূলক ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ। ফলে একটির জায়গায় আরেকটি বসালে অতিরিক্ত খরচ হবে।
ইউশকভ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ লাখ ব্যারেল তেল ভারতে সরবরাহ করা বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর ধারণা, ট্রাম্প মূলত এই বাণিজ্য আলোচনায় নিজের জয় তুলে ধরতেই এমন দাবি করছেন।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২২ সালে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ছেড়ে রাশিয়া যখন ভারতের দিকে মনোযোগ দেয়, তখন দৈনিক উৎপাদন কমে যাওয়ায় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে উঠে গিয়েছিল। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিন ও ডিজেলের দামও ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।



