ট্রাম্পের শান্তি পরিষদের অর্ধেক সদস্যই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার তালিকায়
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৫১ এএম
জাতিসংঘকে কার্যত চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত বিকল্প বৈশ্বিক সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’ যাত্রা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা, উপহাস এবং কূটনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়েছে। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মঞ্চে গত বৃহস্পতিবার জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মাধ্যমে সংস্থাটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও, এর কাঠামো ও সদস্য তালিকাই প্রশ্নের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
উদ্বোধনী ভাষণে ট্রাম্প যে ১৮টি দেশের প্রতিনিধিকে স্বাগত জানান এবং যাদের ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ হিসেবে অভিহিত করেন, তাদের প্রায় অর্ধেক দেশই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ‘ট্রাভেল ব্যান’ বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।
ট্রাভেল ব্যানে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে—আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, জর্ডান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান ও উজবেকিস্তান। এসব দেশের নাগরিকদের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রেখেছে।
এতে কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—যে দেশগুলোর নাগরিকদের আমেরিকায় প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ, সেই দেশগুলো কীভাবে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন একটি বৈশ্বিক শান্তি সংস্থার মূল অংশীদার হতে পারে? ট্রাম্প যদিও একে ‘ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা’ বলে অভিহিত করেছেন, বাস্তবে সংস্থাটি জন্মলগ্নেই বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পড়েছে।
‘বোর্ড অব পিস’-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন ট্রাম্প নিজেই। উদ্বোধনী মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান, প্যারাগুয়ে, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও উজবেকিস্তানের প্রতিনিধিরা।
তবে এই তালিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো প্রভাবশালী রাষ্ট্রের প্রতিনিধিকে দেখা যায়নি। কূটনৈতিক সূত্রে এমনও গুঞ্জন রয়েছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকেও এই বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এই উচ্চাভিলাষী সংস্থার সদস্য হতে প্রতিটি দেশকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে, যা নিয়েও সমালোচনা জোরালো। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই ‘এন্ট্রি ফি’ বোর্ডটিকে কার্যত একটি ‘ধনকুবেরদের ক্লাব’-এ পরিণত করেছে।
ব্রিটিশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে বোর্ডের সদস্য হিসেবে ঘোষণা করায় আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্প এই প্রসঙ্গে বলেন, যখন আমেরিকা সমৃদ্ধ হয়, তখন পুরো বিশ্ব সমৃদ্ধ হয়।
এদিকে সম্মেলনের আরেকটি আলোচিত ঘটনা ছিল ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের উপস্থাপিত ‘নিউ গাজা’ প্রকল্প। সিজিআই প্রযুক্তিতে তৈরি এই নকশায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজাকে একটি আধুনিক ‘রিভিয়েরা’ বা পর্যটন স্বর্গে রূপান্তরের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
এই প্রকল্পে দেখানো হয়েছে অত্যাধুনিক ডেটা সেন্টার, বিলাসবহুল হাইরাইজ অ্যাপার্টমেন্ট, উপকূলীয় পর্যটন কেন্দ্র, এক লাখের বেশি আবাসন ইউনিট এবং ৭৫টি আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতি।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘বোর্ড অব পিস’ গাজার সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একে একটি ‘বোর্ড অব অ্যাকশন’ বা কার্যকর উদ্যোগের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, কুশনারের উপস্থাপিত এই নকশা গত বছর প্রকাশিত একটি এআই-জেনারেটেড ভিডিওর সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিল রয়েছে, যেখানে ট্রাম্প ও ইলন মাস্ককে গাজা উপকূলে ঘুরে বেড়াতে দেখা গিয়েছিল।
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির পরপরই ‘বোর্ড অব পিস’-এর ধারণা সামনে আসে। ট্রাম্প দাবি করেন, তার এই ভিশন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে—যদিও এ দাবির পক্ষে আনুষ্ঠানিক কোনো নথি প্রকাশ করা হয়নি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বোর্ড অব পিস’ মূলত জাতিসংঘের প্রভাব খর্ব করে বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি কৌশল। তবে নিজস্ব নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত এই সংস্থার কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে শুরু থেকেই গভীর সন্দেহ রয়ে গেছে।



