ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ২০০ কোটি ডলারের তেল চুক্তির ঘোষণা ট্রাম্পের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০৯ পিএম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় ২০০ কোটি ডলার মূল্যের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির বিষয়ে একটি চুক্তি হয়েছে। এই চুক্তি কার্যকর হলে ভেনেজুয়েলা চীনের কাছে তেল বিক্রি কমাবে এবং দেশটির তেল উৎপাদন আরও হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি থেকেও রক্ষা পাবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এই চুক্তি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি শক্ত বার্তা—ভেনেজুয়েলা সরকার মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর জন্য নিজেদের উন্মুক্ত করছে। অন্যথায় দেশটিকে আরও কঠোর মার্কিন পদক্ষেপ, এমনকি সামরিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকির মুখে পড়তে হতো বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্প বলেছেন, তিনি চান ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্র ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে দেশটির তেলশিল্পে ‘পূর্ণ প্রবেশাধিকার’ দিন।
গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত রপ্তানি অবরোধের কারণে ভেনেজুয়েলা তাদের ট্যাংকার ও স্টোরেজ ট্যাংকে থাকা লাখ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করতে পারেনি। এই অবরোধ ছিল প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর সরকারের ওপর ক্রমবর্ধমান মার্কিন চাপের অংশ।
এরই ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহে মার্কিন বাহিনী নিকোলা মাদুরোকে আটক করে। ভেনেজুয়েলার শীর্ষ কর্মকর্তারা এই ঘটনাকে ‘অপহরণ’ বলে অভিহিত করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দেশের বিপুল তেলসম্পদ দখলের চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন।
এর আগে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনেজুয়েলা ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন তেল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘হস্তান্তর’ করবে। তিনি লেখেন, এই তেল বাজারদরে বিক্রি করা হবে এবং সেই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকবে, যাতে তা উভয় দেশের জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়।
ট্রাম্প আরও জানান, এই চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। তেল সরাসরি জাহাজ থেকে মার্কিন বন্দরে পাঠানো হবে।
রয়টার্সকে দেওয়া তথ্যে দুটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই আটকে পড়া তেল সরবরাহ করতে হলে প্রাথমিকভাবে চীনের উদ্দেশে যাত্রা করা কার্গোগুলোকে নতুন করে বরাদ্দ দিতে হতে পারে। গত এক দশক ধরে, বিশেষ করে ২০২০ সালের পর থেকে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনই ছিল ভেনেজুয়েলার প্রধান তেল ক্রেতা।
তেলশিল্পের একটি সূত্রের ভাষায়, ‘ট্রাম্প চান এটি দ্রুত বাস্তবায়িত হোক, যাতে তিনি এটিকে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জয় হিসেবে তুলে ধরতে পারেন।’
ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম দেড় শতাংশের বেশি কমে যায়। বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ভেনেজুয়েলার তেলের সরবরাহ বাড়বে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনে ভেনেজুয়েলার তেল প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে শেভরন, যারা দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি পিডিভিএসএর প্রধান যৌথ উদ্যোগ অংশীদার। শেভরন প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল ভেনেজুয়েলান তেল যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে আসছে এবং সাম্প্রতিক অবরোধের মধ্যেও তারাই একমাত্র কোম্পানি, যারা নির্বিঘ্নে তেল লোড ও পরিবহন করছে।
এই তেল বিক্রির অর্থ থেকে ভেনেজুয়েলা সরাসরি কোনো অংশ পাবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে পিডিভিএসএ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে, তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ এবং ডলারে লেনদেন নিষিদ্ধ।
দুটি সূত্র জানিয়েছে, এই সপ্তাহে ভেনেজুয়েলা ও মার্কিন কর্মকর্তারা বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে আগ্রহী মার্কিন ক্রেতাদের জন্য নিলাম আয়োজন এবং পিডিভিএসএর অংশীদারদের বিশেষ মার্কিন লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়।
অতীতে এই ধরনের লাইসেন্স শেভরন, ভারতের রিলায়েন্স, চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, ইউরোপের এনি ও রেপসলের মতো কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার তেল পরিশোধন বা পুনরায় বিক্রির সুযোগ দিয়েছিল।
রয়টার্সের আরও দুটি সূত্র জানিয়েছে, এই সপ্তাহের মধ্যেই কয়েকটি কোম্পানি ভেনেজুয়েলান তেলবাহী কার্গো গ্রহণের প্রস্তুতি শুরু করেছে। এমনকি ভবিষ্যতে মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভে ভেনেজুয়েলার তেল যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে, যদিও ট্রাম্প এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি।
মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডগ বারগাম বলেন, উপসাগরীয় উপকূলে ভেনেজুয়েলার ভারী তেলের সরবরাহ বাড়লে এটি যুক্তরাষ্ট্রের চাকরি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে।
ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার সামনে এখন পুঁজি প্রবাহ ও অর্থনীতি পুনর্গঠনের একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমেরিকান প্রযুক্তি ও অংশীদারত্ব দেশটিকে বদলে দিতে পারে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে উপসাগরীয় অঞ্চলের শোধনাগারগুলো প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ ব্যারেল ভেনেজুয়েলান তেল আমদানি করত। অবরোধের কারণে মজুতের জায়গা ফুরিয়ে যাওয়ায় পিডিভিএসএ ইতিমধ্যে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। দ্রুত রপ্তানির পথ না পেলে উৎপাদন আরও কমতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।



