স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার হারের পর আবেগাপ্লুত হয়ে বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। সেই অবস্থানে কিছুটা পরিবর্তন আনলেও, কবে নাগাদ তিনি আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সঙ্গে নতুন চুক্তি সারবেন সেটি নিশ্চিত নয়। এরই মাঝে এক সাক্ষাৎকারে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেন স্কালোনি।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবর উইন্ডোতে তিনটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে ২০২২ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। যার জন্য ইতোমধ্যে স্কোয়াডও ঘোষণা করেছেন স্কালোনি। বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটির দলে রাখা হয়েছে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেওয়া লিওনেল মেসি। ওই ম্যাচ দিয়ে তিনি ঘরের মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় দল থেকে বিদায় নেবেন।
এশিয়ান চ্যানেল ‘মিগু’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্কালোনি বলেছেন, ‘সামনের ম্যাচগুলোয় তরুণ খেলোয়াড়দের আমাদের খেলার কৌশলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য। এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর সময় শুরু হচ্ছে, সময় এসেছে তরুণদের ওপর আস্থা রাখার। আমি সবসময় বলি বয়স কোনো বাধা নয়। পুরোনোরা দলে টিকে থাকবে কিংবা নতুনরা আসবে, যতদিন তারা ক্লাবের হয়ে ভালো পারফর্ম করবে এবং আমাদের মনে হবে যে তাদের এখানে থাকা উচিত। তবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো, যারা আমাদের হয়ে খেলা চালিয়ে যেতে পারবে তাদের সবাইকে একটি সুযোগ দেওয়া।’
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সঙ্গে কবে নাগাদ নতুন চুক্তি হবে সেটি স্পষ্ট না করলেও, সুসময় ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন স্কালোনি, ‘আমরা চেষ্টা করব। এখানে থাকি কিংবা না থাকি।’ বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষ হওয়ার পরের অনুভূতি নিয়ে তার ভাষ্য, ‘এখন থেকে একটি বিরতি (পজ) শুরু হচ্ছে। আমরা এটাকে সুযোগ হিসেবে নিচ্ছি।’ ২০২৬ বিশ্বকাপ আসর যে কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসবে আগেই বুঝতে পেরেছিলেন আগের আসরের বিশ্বসেরার পুরস্কার জেতা এই কোচ।
স্কালোনি বলছেন, ‘২০২৪ কোপা আমেরিকার পরও আমার মনে হয়েছিল যে সামনের পথটা কঠিন হতে যাচ্ছে। কারণ সবকিছু জেতার পর এবং বিশ্বকাপের আর মাত্র দুই বছর বাকি থাকায়, সামনে কী আসতে চলেছে তা নিয়ে কিছুটা সংশয় ছিল। তবে সেই পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া এবং এটি অনুভব করা যে আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালিয়ে যেতে পারি এবং সত্যি বলতে, আমরা পেরেছিলাম।
বিশ্বকাপ-পরবর্তী সময়ের ওপর আলোকপাত করে তিনি যোগ করেন, ‘ফাইনাল যখন শেষ হলো, তখন জয় কিংবা হার মূল বিষয় ছিল না। এখন থেকে একটি বিরতি শুরু হচ্ছে এবং আমরা এটিকে একটি সুযোগ দিতে যাচ্ছি। আমি বলছি না যে আমাদের শিরোপার পুনরাবৃত্তি করতেই হবে, বরং আমাদের দলের মধ্যে একটি ইতিবাচক সংযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে মানুষ এই দলের সঙ্গে নিজেদের মেলাতে পারে। তবে এটি অর্জন করা কঠিন। এমন কিছুর পুনরাবৃত্তি করা সহজ হবে না।’
সমর্থকদের আস্থার জায়গা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় এই মাস্টারমাইন্ডের কণ্ঠে, ‘মানুষ এই দলটির সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করে নিয়েছিল, যা একদিক থেকে বেশ ভীতিজাগানিয়া, তবে অবশ্যই ইতিবাচক অর্থে। আমার মনে হয় চেষ্টা করাটা কঠিন, আমি বলছি না এটা সহজ হবে। একজন কোচ হিসেবে, দলের নেতা হিসেবে আপনাকে জানতে হবে যে এটি কঠিন হতে যাচ্ছে। যৌক্তিকভাবেই আমরা চেষ্টা করব, আমরা সেখানে থাকি বা না থাকি। সেটি বড় বিষয় নয়।’
২০২২ ও ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইন স্কোয়াডের তুলনামূলক পার্থক্য বলতে গিয়ে স্কালোনি জানান, ‘আগের বিশ্বকাপে আমরা অনেক ভালো অবস্থায় ছিলাম, যেখানে ৯৫ শতাংশ খেলোয়াড় তাদের সেরা ফর্মে ছিল। কিন্তু এবার আমরা গিয়েছিলাম কোণঠাসা অবস্থায়। আমি ভিন্ন এক পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা পেয়েছি। কারণ আমাদের শতভাগ ফিট খেলোয়াড় ছিল না, কিন্তু আমরা তাদের ওপর আস্থা রেখেছি। সেক্ষেত্রে আগের টুর্নামেন্টের চেয়ে এবার আমাদের অনেক বেশি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।’
বিশ্বকাপে খেলা প্রত্যেকেই নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে সুযোগ করে নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে তরুণরা সেই জায়গা নেবে বলে ধারণা আর্জেন্টাইন কোচের, ‘ছেলেদের বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। গত আট বছর ধরে যারা আমাদের সবকিছু দিয়েছে, সেই মানুষদের ওপর আস্থা রাখতে হয়েছিল। ফুটবলারের চেয়ে মানুষ হিসেবে তারা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যারা খেলেছে, তারা প্রত্যেকেই দলের জায়গাটা অর্জন করে নিয়েছে। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আমরা তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে আসার চেষ্টা করব, কারণ তারা সত্যিই এটার যোগ্য।’
স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচ শেষে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায় দু’দলের খেলোয়াড়রা। তবে এই বৈরিতা দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করেন স্কালোনি, ‘আমরা ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ। মাত্র তিন-চারজন লোক কিছু বলেছে বলেই এই সম্পর্ক কালিমালিপ্ত হতে পারে না। আমি সেখানে (স্পেনে) থাকি এবং তাদের মধ্যে এমন মানুষও ছিল যারা আমাদেরই জয় চেয়েছে। মানুষ রানার্সআপ বা দ্বিতীয় স্থান উদযাপন করতেও রাস্তায় নেমে এসেছিল। এটিও একটি জয়, এর মাধ্যমে আমরা সবাই জিতেছি। আমি আশা করি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এভাবেই এগিয়ে যাবে।’



