৮ লাখের ম্যাচ ফি থেকে ঘাসের উইকেট, অস্ট্রেলিয়া বধের নেপথ্যের সেই পরিকল্পনা
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। ছবি: বিসিবি
ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয় শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, বরং গত এক দশকে দেশের ক্রিকেটে নেয়া একাধিক পরিকল্পিত উদ্যোগের ফল। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স নিজেই সিরিজ শুরুর আগে বিশ্ব ক্রিকেটের বদলে যাওয়া বাস্তবতার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সেই পরিবর্তনের স্রোতে না ভেসে বাংলাদেশ বেছে নিয়েছিল টেস্ট ক্রিকেটকে গুরুত্ব দেয়ার পথ। যার ফল মিলেছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই।
বাংলাদেশের বিপক্ষে ডারউইন টেস্টের কয়েক দিন আগে এক পডকাস্টে কামিন্স বলেছিলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার কয়েকজন ক্রিকেটার বাংলাদেশ সিরিজের দুই টেস্ট খেলতে ২০ দিনের টুর্নামেন্টের জন্য পাওয়া প্রায় পাঁচ লাখ পাউন্ডের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কারণ তারা অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলতেই বেশি আগ্রহী। তবে কামিন্স মনে করেন, ভবিষ্যতেও সবসময় এমনটা থাকবে এমন নিশ্চয়তা নেই।’
কামিন্সের কথায় ফুটে উঠেছিল গত এক দশকে বিশ্ব ক্রিকেটের পাল্টে যাওয়া চিত্র। টি-টোয়েন্টি লিগের বিপুল অর্থের কারণে অনেক ক্রিকেটারই দীর্ঘ সংস্করণের ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ অবশ্য বেছে নিয়েছিল উল্টো পথ। আর সেই সিদ্ধান্তেরই চূড়ান্ত ফল যেন দেখা গেল ডারউইনে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কামিন্সের শক্তিশালী টেস্ট দলকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ২০১৯ সালে শুরু হওয়া বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান চক্রকেও আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছে। যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান এখন চার নম্বরে। জোর সম্ভাবনা আছে ফাইনাল খেলারও।
টেস্টে বাংলাদেশ ক্রিকেটের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ পেস বিপ্লব। বাংলাদেশের পেস আক্রমণ এখন ক্রিকেট বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। গত দুই বছরে ঘরের মাঠ ও দেশের বাইরে পাকিস্তানকে হারিয়েও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছিল বাংলাদেশের পেসাররা। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট জয় সেই প্রতিভা ও দীর্ঘদিনের পরিকল্পনারই বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার জানান, পাঁচ-ছয় বছর আগেও দেশের পেসারদের মধ্যে টেস্ট ক্রিকেট খেলার আগ্রহ কম ছিল। তারা সাদা বলের ক্রিকেটেই বেশি মনোযোগী ছিলেন।
তাই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) টেস্ট ক্রিকেটকে আকর্ষণীয় করতে আর্থিক কাঠামোতেই পরিবর্তন আনে। ২০১৯ সালে ম্যাচ ফি ও কেন্দ্রীয় চুক্তির কাঠামো পুনর্গঠন করা হয়। আগে ওয়ানডে ক্রিকেটাররা সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পেতেন। ফলে অনেক পেসার টেস্ট ক্রিকেট থেকে সরে থাকতেন।
পরবর্তীতে এমনভাবে চুক্তি সাজানো হয়, যাতে টেস্ট ক্রিকেটাররাই দেশের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া ক্রিকেটার হন। একটি টেস্টের ম্যাচ ফি ৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৮ লাখ টাকা।
বাশারের ভাষায়, এর ফলে এখন বাংলাদেশের পেসাররা টেস্ট ক্রিকেটের জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখেন। শুধু টি-টোয়েন্টি লিগের চুক্তির পেছনে ছোটেন না তারা। কোনো টি-টোয়েন্টি লিগের প্রস্তাব এলে খেলোয়াড়কে ছাড়ার আগে বিসিবিও বিষয়টি বিবেচনা করে।
বাংলাদেশের বর্তমান পেস বোলিং আক্রমণের আরেকটি বিশেষ দিক হলো, বেশিরভাগ পেসারই উঠে এসেছেন সাধারণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে।
দ্রুতগতির পেসার নাহিদ রানা রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে। হাসান মাহমুদের বাড়ি চট্টগ্রামের লক্ষ্মীপুরে। আর ইবাদত হোসেন ও তানজিম হাসান সাকিবের শিকড় সিলেটে।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে এখন একটি ধারণা বেশ জোরালো, পেসারদের যেন মোস্তাফিজুর রহমানের পথ অনুসরণ করতে না হয়। অর্থাৎ শুধু টি-টোয়েন্টি লিগে খেলার জন্য টেস্ট ক্রিকেটকে অগ্রাধিকারহীন করে না ফেলেন তারা।
বাংলাদেশের পেস বিপ্লবের বড় পরিবর্তন শুরু হয়েছিল ২০১৪-১৫ মৌসুমে। গত এক দশকে সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান, হাবিবুল বাশার ও মিনহাজুল আবেদীন ঘরোয়া ক্রিকেটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে এই পরিবর্তনে কাজ করেন।
আগে বাংলাদেশের ঘরোয়া উইকেটগুলো ছিল অনেকটাই অনুর্বর ও স্পিন সহায়ক। ফলে দলগুলো একাদশে তিন স্পিনার ও মাত্র একজন পেসার খেলাত। সেই চিত্র বদলাতে উইকেটে ঘাস রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অন্তত ৬ মিলিমিটার ঘাস রাখার নিয়ম করা হয়। পাশাপাশি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে প্রতিটি দলকে অন্তত তিনজন পেসার খেলানো বাধ্যতামূলক করা হয়।
এর ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা তরুণ পেসাররা গতি নিয়ে বোলিং করার সুযোগ পান। উইকেট পেস সহায়ক হওয়ায় দলগুলোও স্বাভাবিকভাবেই বেশি পেসার খেলাতে শুরু করে।
বাংলাদেশের পেস বিপ্লবে আরেকটি বড় ভূমিকা রেখেছে আন্তর্জাতিক মানের ফাস্ট বোলিং কোচ নিয়োগ। কোর্টনি ওয়ালশ, ওটিশ গিবসন ও অ্যালান ডোনাল্ডর মতো কিংবদন্তি পেসারদের জাতীয় দলের ফাস্ট বোলিং কোচ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তাদের উপস্থিতি জাতীয় দলের পেসারদের ওপর যেমন প্রভাব ফেলেছে, তেমনি ঘরোয়া কোচদেরও তাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের ক্রিকেটের বিভিন্ন স্তরে। অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটকে বাংলাদেশের পেসার তৈরির অন্যতম প্রধান পাইপলাইন হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিভাবান কোনো পেসারকে সেই পর্যায়ে শনাক্ত করার পর তার উন্নয়নের দায়িত্ব নেয় বোর্ড।
আর এভাবেই আর্থিক প্রণোদনা, ঘরোয়া ক্রিকেটের উইকেট পরিবর্তন, বাধ্যতামূলক পেসার খেলানো এবং আন্তর্জাতিক মানের কোচ নিয়োগ; সব মিলিয়ে গত এক দশকে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের পেস বিপ্লব।
ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো তাই হঠাৎ পাওয়া কোনো সাফল্য নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল, যার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে।



