কানসাস সিটিতে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ঢল। লিওনেল মেসিদের ওপর তাদের এতটাই বিশ্বাস ছিল যে, সুইজারল্যান্ড সমতা ফেরালেও তাদের হতাশ হতে দেখা যায়নি। তাদের আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন মেসি-আলভারেজরা। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে দুটি গোল করে স্বস্তির জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। সুইসদের ৩-১ গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে হারিয়ে সেমিফাইনালে তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।
আর্জেন্টিনা প্রথমার্ধে ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার গোলটি করেন। তারপর বিরতি থেকে ফিরে একাধারে আক্রমণ শাণিয়ে সমতা ফেরায় সুইজারল্যান্ড। এনদোয়ে স্কোর ১-১ করেন। শেষ দিকে আর্জেন্টিনা কয়েকটি সুযোগ নষ্ট করলে আর গোল হয়নি নির্ধারিত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচের প্রথমার্ধেও স্কোর পাল্টায়নি। ১১২ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজ স্কোর ২-১ করেন। তারপর ইনজুরি টাইমের প্রথম মিনিটে লাউতারো মার্টিনেজের গোল জয় সুনিশ্চিত করে। আগামী ১৬ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় আটলান্টা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল খেলবে আর্জেন্টিনা।
আর্জেন্টিনা দশম মিনিটে এগিয়ে যায়। নবম মিনিটে কর্নার পায় তারা। একেবারে মাপা শট নেন মেসি। বেশ লম্বা সুইস ডিফেন্ডারকে এড়িয়ে গোল পেতে হলে অনেকদূর লাফিয়ে উঠতে হতো অ্যালিস্টারকে। তবে তার সামনে থাকা ম্যানুয়েল আকানজির লাফিয়ে বল না পাওয়ার সুযোগটা কাজে আসে আর্জেন্টিনার। দ্বিতীয় বার ঘেষে প্রবেশ করা বলে গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলের তাকিয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। ওই এক গোলে এগিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করেছে আর্জেন্টিনা।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে সুযোগ তৈরি করেছিল সুইজারল্যান্ড। এম্বোলো ডান দিক থেকে একটি থ্রু বল পেয়ে গোলের দিকে ছুটে যান। তিনি বাঁ দিকে থাকা এনদোয়ের উদ্দেশ্যে বলটি বাড়িয়ে দেন। এনদোয়ে দ্রুত গোলে শট নেওয়ার চেষ্টা করলেও লিসান্দ্রো মার্তিনেস দুর্দান্ত এক ব্লক করে তাকে আটকে দেন। তবে গোল হলেও সেটি হতো না। কারণ এর আগেই লাইন্সম্যান এম্বোলোর অফসাইডের কারণে পতাকা তুলেছ

সুইজারল্যান্ড আবার আক্রমণে ওঠে। বাঁ দিক থেকে বল ভেসে আসে বক্সের ভেতরে। এনদোয়ে দূরের পোস্ট লক্ষ্য করে হেড করেন। কিন্তু মার্টিনেজ ডান দিকে দারুণভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলটি আটকে দেন।
সুইস মিডফিল্ডার বক্সের বাইরে প্রায় ৩০ মিটার দূর থেকে এক জোরালো শট নেন। বলটি মার্টিনেজের সামনে এসে অদ্ভুতভাবে ড্রপ খেলেও তিনি বেশ দক্ষতার সঙ্গে সেই গতিময় শটটি রুখে দেন।
লাল কার্ড পাওয়ার ঠিক আগে এনদোয়ে বাঁ দিকে রদ্রিগেজের সঙ্গে চমৎকার এক ওয়ান-টু পাস খেলেন। ফিরতি পাসটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এনদোয়ে কাছের পোস্ট দিয়ে মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন। কোণাকুনি শটে বলটি দূরের পোস্টে গিয়ে জড়ায়। সুইজারল্যান্ড দারুণভাবে ম্যাচে ফিরে আসে।

৬৭ মিনিটে গোল করে সুইজারল্যান্ড আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সমতা ফেরায়। ৫ মিনিট পর তারা ১০ জনের দলে পরিণত হলো। ৭২ মিনিটে তাদের ফরোয়ার্ড এম্বোলো দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেছেন। ৬৯ মিনিটে রেফারি প্রাথমিকভাবে এম্বোলোকে ফাউল করার কারণে পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখান। তবে ভিএআরে দেখা যায় দুজনের মধ্যে কোনো সংস্পর্শ হয়নি। ফাউলের অভিনয় করার কারণে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন সুইস ফরোয়ার্ড। লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় এম্বোলোকে।
জয়সূচক গোলের খোঁজে মরিয়া হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। ৯০ মিনিটে নিকো গঞ্জালেজ একটি ক্রস রুখে দিয়ে বাঁ প্রান্ত থেকে স্লাইড করেন। গোলমুখের সামনে বল উড়ে যায়। ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড গোলবারের ওপর দিয়ে যায়।
যোগ করা সময়ে বক্সের বাইরে বল পান মেসি। ডানদিকে কাট করে তিনি দূরের পোস্ট দিয়ে শট নেন। কিন্তু বিপজ্জনকভাবে বল বাঁক খেয়ে পোস্টের পাশ দিয়ে মাঠের বাইরে যায়। শেষ মুহূর্তে মেসির কর্নার থেকে জটলার ভেতরে বল পায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু লিসান্দ্রো মার্টিনেজের অ্যাক্রোবেটিক কিক কোবেল সহজেই আটকে দেন।
বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালের শেষ ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে গড়ায় ম্যাচ। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা লিড নিলেও শেষ অর্ধে সমতা ফেরায় সুইজারল্যান্ড। তারা শেষ ১৮ মিনিট ১০ জন নিয়ে খেললেও আর্জেন্টিনাকে আর এগিয়ে যেতে দেয়নি। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষে স্কোর ১-১। তাতে অতিরিক্ত আরও ৩০ মিনিট খেলা হবে।
৯৩ মিনিটে আলভারেজের সঙ্গে ওয়ান টু পাসে বক্সের মধ্যে বল পান আলমাদা। বাঁ দিক থেকে নেওয়া তার শট কোবেল রুখে দেন। দুই মিনিট পর আবারও আলমাদার দুর্দান্ত একটি শট। বক্সের বাইরে থেকে তার শক্তিশালী শট কোবেলকে পরাস্ত করলেও সাইডনেটে লাগে।
দুই মিনিটের মধ্যে আর্জেন্টিনার দুই খেলোয়াড় হলুদ কার্ড দেখেন। ফ্রুলারকে টেনে ধরে বুকড হন আলমাদা। পরের মিনিটে আকাঞ্জিকে ফাউল করে শাস্তি পান লাউতারো। সব শঙ্কা উড়িয়ে শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায়।

১১০ মিনিটে লিয়ান্দ্রো পারেদেসের বদলি হয়ে নামেন হোসে মানুয়েল লোপেস। দুই মিনিট পরই তিনি গোল বানিয়ে দেন। বলটি পেছনে থাকা আলভারেসের দিকে বাড়িয়ে দেন। আলভারেস পেনাল্টি বক্সের বাঁ দিক থেকে ভেতরে কেটে ঢুকে ২৭ মিটার দূর থেকে এক অবিশ্বাস্য বাঁকানো শট নেন। বলটি জালের ভেতরের এক পাশে আঘাত করে গোলপোস্টের কোণায় গিয়ে জড়ায়।
ইনজুরি টাইমের শেষ মুহূর্তে আবারও ব্যবধান বাড়ায় আর্জেন্টিনা। নিজেদের অর্ধে আলভারেজ চমৎকারভাবে জাকার কাছ থেকে বল কেড়ে নেন। আলমাদা বল নিয়ে কাউন্টার-অ্যাটাকে যায়। তিনি বক্সের ভেতরে ঢুকে দারুণ চতুরতার সঙ্গে জাশারিকে কাটিয়ে গোলের উদ্দেশ্যে শট নেন। কিন্তু সামনে এগিয়ে আসা কোবেল তার শটটি আটকে দেন। তবে দুর্ভাগ্যবশত বলটি ফিরে এসে লাউতারো মার্টিনেজের পায়ে পড়ে এবং তিনি ফাঁকা পোস্টে বল জড়িয়ে গোলটি করেন!



