ফুটবল বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি ইতালি এখন এক অকল্পনীয় ও অন্ধকারতম তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাতে ইউরোপীয় অঞ্চলের প্লে-অফ ম্যাচে ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ৬৬ নম্বর দল বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চ থেকে বিদায় নিয়েছে।
এর ফলে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে পরিচিত আজ্জুরিরা টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে ব্যর্থ হলো। বসনিয়ার বিপক্ষে এই ম্যাচটি ইতালির জন্য হতে পারত গত এক দশকের ব্যর্থতার পাপমোচনের সুযোগ, কিন্তু আক্ষেপ যে তাদের আবারও ঘরে বসে অন্যের খেলা দেখতে হবে এবং আরেকটি সুযোগের জন্য চার বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা সইতে হবে।
কাগজ-কলমে ১২ নম্বর র্যাঙ্কিংয়ে থাকা ইতালি এবং তাদের চেয়ে ৫৪ ধাপ নিচে থাকা বসনিয়ার লড়াইটি ছিল সব দিক থেকেই অসম। ইতালির জনসংখ্যা যেখানে প্রায় ৬ কোটি, সেখানে বসনিয়ার মাত্র ৩৫ লাখ। এমনকি ইতালি দলের খেলোয়াড়দের সম্মিলিত বার্ষিক বেতন প্রায় ১০০ কোটি ইউরো, যার বিপরীতে বসনিয়ার খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক ইতালির সাত ভাগের এক ভাগ মাত্র।
অথচ মাঠের লড়াইয়ে সেই অর্থ বা পরিসংখ্যান কোনো কাজে আসেনি। জেনিৎসার বিলিনো পোলজে স্টেডিয়ামে টাইব্রেকারে বসনিয়ার চতুর্থ শটটি যখন জালের ঠিকানা খুঁজে নিল, তখন স্টেডিয়াম জুড়ে নেমে আসে এক স্তব্ধতা। ইতালিয়ান খেলোয়াড়রা তখন সবুজ ঘাসে মাথা নিচু করে অবিশ্বাসের নোনা জলে ভাসছিলেন, আর অন্যদিকে তখন চলছিল বসনিয়ার রূপকথার জয়োল্লাস।
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য ইতালির জন্য বেশ আশাজাগানিয়া ছিল। জেনিৎসার মাঠে শুরু থেকেই দাপট দেখিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ভুলের সুযোগে মইসে কিন গোল করে দলকে এগিয়ে নিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তে ইতালীয় সমর্থকদের উল্লাস দেখে মনে হচ্ছিল, দীর্ঘ ১২ বছরের আক্ষেপের অবসান বুঝি আজই হতে চলেছে।
কিন্তু ফুটবল বিধাতা যেন অন্য চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন। প্রথমার্ধের শেষ দিকে আজ্জুরি সেন্টার ব্যাক আলেসান্দ্রো বাস্তোনি সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ম্যাচের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যায়। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া ইতালি মুহূর্তেই রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে এবং সেই সুযোগে দ্বিতীয়ার্ধে ইতালির ওপর স্টিম রোলার চালায় বসনিয়া।
গোলরক্ষক জানলুইজি দোনারুম্মা প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে কয়েকবার নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দিলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে ডেডিচের রক্ষণচেরা আক্রমণ থেকে বল পেয়ে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে গোল করে সমতা ফেরান বদলি খেলোয়াড় হারিস তাবাকোভিচ।
নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত সময়েও ১-১ সমতা বিরাজ করায় ম্যাচ গড়ায় স্নায়ুক্ষয়ী টাইব্রেকারে। সেখানে ইতালির পিও এসপোসিটো এবং ব্রায়ান ক্রিস্টান্তে গোল করতে ব্যর্থ হলে ৪-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট পায় বসনিয়া।
বসনিয়ার হয়ে জয়সূচক পেনাল্টিটি জালে জড়ান যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী এসমির বাজরাকতারেভিচ, যিনি মাত্র কয়েক মাস আগেই যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে বসনিয়ার হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
২০১৮ এবং ২০২২ সালের বাছাইপর্বে যথাক্রমে সুইডেন ও উত্তর মেসিডোনিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেওয়া ইতালির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে এই হার আরও একটি কলঙ্ক তিলক যুক্ত করল। কোচ জেনারো গাত্তুসো পরাজয় শেষে বিষণ্ণ মনে স্বীকার করেন, জাতীয় দল এবং ক্লাব পর্যায়—উভয় ক্ষেত্রেই ইতালি এখন কঠিন সময় পার করছে। ডিফেন্ডার লিওনার্দো স্পিনাজ্জোলাও সেই একই হাহাকার প্রকাশ করে জানান যে, এই বাদ পড়াটা বিশেষ করে সেই শিশুদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের যারা কখনও ইতালিকে বিশ্বকাপে খেলতে দেখেনি।
১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২ এবং ২০০৬ সালের চ্যাম্পিয়নদের এই বিদায়ের অর্থ হলো, ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে কোনো ম্যাচ না খেলে তাদের অন্তত ১৬ বছর পার করতে হবে। ২০০৬ সালের ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে শিরোপা জেতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আর কোনো ম্যাচ খেলা হলো না নীল জার্সিধারীদের।



