খানাখন্দে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক যেন মরণফাঁদ
আরাফাত হোসেন, নারায়নগঞ্জ থেকে
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১১:১০ পিএম
যাত্রাবাড়ী কাজলা এলাকায় সড়কের খনাখন্দ সৃষ্টি, ছবি: আরাফাত হোসেন
দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী থেকে মেঘনা সেতু পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় অসংখ্য খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশের কার্পেটিং উঠে গিয়ে কোথাও ছোট, কোথাও বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে মেঘনা টোল প্লাজা পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। সড়কের এমন বেহাল অবস্থায় প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। দুর্ভোগে পড়ছেন দূরপাল্লার যাত্রী, পরিবহনশ্রমিক, ব্যক্তিগত গাড়িচালক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত ও খানাখন্দ। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক যান চলাচল। একই সাথে দিন দিন তীব্র হচ্ছে জানমালের ক্ষতি ও ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক চালক গর্ত এড়াতে হঠাৎ লেন পরিবর্তন করছেন। এতে পেছনে থাকা যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ভারী যানবাহন গর্তে পড়লে বিকট শব্দের সঙ্গে গাড়ি দুলে ওঠে। মোটরসাইকেল আরোহীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। কোথাও কোথাও বাস ও ট্রাককে ধীরগতিতে চলতে হওয়ায় দীর্ঘ যানজটও সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীরা জানান, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির পর সড়কের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। আগে যেসব স্থানে ছোট গর্ত ছিল, সেগুলো এখন বড় আকার ধারণ করেছে।
প্রতিদিন যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকায় গর্তগুলো আরও বিস্তৃত হচ্ছে। মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে পিচ ও খোয়া উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি ও ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে এই খানাখন্দগুলো ক্রমান্বয়ে আরও বড় ও বিপজ্জনক আকার ধারণ করছে। দূর থেকে হঠাৎ এই গর্তগুলো চালকদের নজরে না আসায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। বিশেষ করে রাতের বেলা এবং বৃষ্টির সময়ে এই ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
পরিবহনচালক কবির মিয়া বলেন, মহাসড়কে এখন গাড়ি চালানো খুবই কষ্টকর। গর্ত এড়াতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিশেষ করে রাতে বৃষ্টির পানি জমে থাকলে গর্ত বোঝা যায় না। অনেক সময় হঠাৎ ব্রেক করতে হয়। তিনি আরও বলেন, এই সড়কে শুধু দুর্ঘটনার ভয় নয়, গভীর রাতে ছিনতাইয়ের আশঙ্কাও থাকে। মহাসড়কের কিছু অংশ দীর্ঘদিন ধরেই ছিনতাইপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। গর্তের কারণে গাড়ির গতি কমে গেলে অপরাধীদের তৎপরতার সুযোগ তৈরি হয়। কবির মিয়ার অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা এলেই একইভাবে জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করা হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই আবার সেই কার্পেটিং উঠে যায়।
স্থায়ীভাবে উন্নতমানের নির্মাণকাজ না করলে এই সমস্যার সমাধান হবে না বলে তিনি মনে করেন। দাউদকান্দি থেকে চিটাগাংরোডগামী তিশা পরিবহনের যাত্রী সাইদুল ইসলাম বলেন, দিনের বেলায় কিছুটা সতর্ক হয়ে চলা যায়। কিন্তু রাতে মহাসড়কে চলাচল সত্যিই ভয়ের। গাড়ি হঠাৎ গর্তে পড়লে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। দীর্ঘ যাত্রায় এটি বড় ভোগান্তি। প্রাইভেটকারচালক বেলায়েত হোসেন বলেন, বৃষ্টির কারণে এখন গর্তগুলো অনেক গভীর হয়েছে। গাড়ির চাকা গর্তে পড়লে নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে যায়। অনেক সময় গাড়ির সাসপেনশন ও চাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সড়কের এই অবস্থা দ্রুত ঠিক করা প্রয়োজন।
নিয়মিত যাতায়াতকারী বাস চালক ও সাধারণ যাত্রীরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মহাসড়কের এই গর্তগুলোর কারণে গাড়ি চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। খানাখন্দে পড়ে গাড়ির যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হচ্ছে এবং প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি উল্টে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। দ্রুত এই রাস্তা মেরামত না করা হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন তারা।
নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম বলেন, বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি হলে মহাসড়কের ওপর দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। পানি কার্পেটিংয়ের ফাঁক দিয়ে নিচের স্তরে প্রবেশ করলে রাস্তার ভিত্তি (বেজ ও সাব-বেজ) দুর্বল হয়ে যায়। এরপর ভারী ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনের চাপের কারণে কার্পেটিং উঠে গিয়ে দ্রুত খানাখন্দ তৈরি হয়।যেসব স্থানে পানি নিষ্কাশনের সমস্যা রয়েছে, সেখানে এ ধরনের ক্ষতি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
তিনি আরও বলেন, বৃষ্টির সময় স্থায়ীভাবে কার্পেটিংয়ের কাজ করা কঠিন। তবে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে প্যাচিং করা হচ্ছে, যাতে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা যায়। আবহাওয়া অনুকূলে এলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো টেকসইভাবে সংস্কার করা হবে বলে।



