পাচার করা অর্থ ফেরালে আরও সম্মান পাবে পাচারকারীরা : জামায়াত আমির
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:১৮ পিএম
বিদেশে পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনলে রাষ্ট্র সেই পাচারকারীদের আরও সম্মান দেবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘দ্য প্রসপারিটি ডায়ালগ’-এ অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সরকার গঠন করলে অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত দিতে আহ্বান জানানো হবে সম্মানের সঙ্গে। কেউ যদি সেই অর্থ ফিরিয়ে আনে, রাষ্ট্র তাকে আরও সম্মান দেবে। এর উদ্দেশ্য কাউকে অপমান করা নয়, বরং জাতির কল্যাণ নিশ্চিত করা।
শিল্পমালিকদের প্রধান সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের বড় তিনটি সমস্যা হলো তহবিলের নিরাপত্তাহীনতা, সম্পদের সুরক্ষার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লালফিতার জটিলতা। তাঁর ভাষায়, নির্ধারিত সময়ে কারখানা চালু করা না গেলেও ব্যাংকঋণের সুদ চলতেই থাকে। এতে উদ্যোক্তারা শুরুতেই ক্ষতিগ্রস্ত হন। ঘুষকে ‘স্পিড মানি’ নামে বৈধ করার প্রবণতাকে শিল্প খাতের জন্য বড় আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, দেশীয় বিনিয়োগকারীরাই যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে বিদেশিরা কেন আসবে?
ক্ষমতায় গেলে শিল্পমালিকদের এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানের অঙ্গীকার করে জামায়াত আমির বলেন, লালফিতা সংস্কৃতি চিরতরে ভেঙে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, জনগণের আমানতের বোঝা বহন করা কোনো দয়া নয়, এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ক্ষমতায় গিয়ে যেন সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে না বাড়ে, আত্মীয়স্বজন যেন রাতারাতি ধনী না হয়—এই সংস্কৃতিও ভাঙা হবে।
চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। এই যন্ত্রণা আমরা বুঝি, উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষকে হালাল রুজির ধারায় ফিরিয়ে আনাই তাঁদের লক্ষ্য। তাঁর ভাষায়, ১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি হাত একত্র করে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গড়ে তুলতে চাই।
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আপনারা লাখো মানুষের জীবিকার দায়িত্ব বহন করেন। তাই আপনাদের সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ব্যবসা ও শিল্পকে শিশুর মতো আগলে রাখা হবে। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দিয়ে পাশে বসে সেই যাত্রা উপভোগ করাই তাঁদের প্রত্যাশা।
ব্যাংকিং খাত ও শেয়ারবাজারের পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরে জামায়াত আমির জানান, এই দুই খাত তিনি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন। তিনি বলেন, ব্যাংকিং, পুঁজিবাজার ও নন-ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলোর কার্যক্রম বিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন, একসময় দেশের অর্থনীতি তুলনামূলক সুস্থ থাকলেও পরে শেয়ারবাজার ও ব্যাংকিং খাতে একের পর এক সংকট তৈরি হয়েছে।
দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য তিনটি খাতকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ উন্নয়ন। তাঁর মতে, মানুষের মেধা, যোগ্যতা, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ও পরিশ্রমের সমন্বয় ঘটলে কোনো শিল্প বা ব্যবসাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
ব্যবসায়িক সফলতার জন্য চারটি বিষয়কে অপরিহার্য উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সৎ নিয়ত, সংশ্লিষ্ট খাতে জ্ঞান ও দক্ষতা, সংকটে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং সরাসরি কাজে সম্পৃক্ত থাকা—এই চারটি বিষয় ছাড়া টেকসই সাফল্য সম্ভব নয়। তিনি বলেন, শুধু মালিক হয়ে অফিসে বসে থাকলে চলবে না, নিজেকে কাজে যুক্ত করতে হবে।
শীর্ষ ব্যবসায়ীদের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ২৭ জন বড় ব্যবসায়ীর মধ্যে ২১ জনই শূন্য থেকে শুরু করেছেন। সৎ নিয়ত, সাহস ও কর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করাই তাঁদের সফলতার চাবিকাঠি।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, নিজের প্রতিষ্ঠানে তিনি কখনো কর্মীদের অপমান করেননি। ভুল হলে আলাদাভাবে সংশোধনের সুযোগ দিয়েছেন এবং নারীদের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। তাঁর মতে, আন্তরিক আচরণই কর্মীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ফল আদায় করতে পারে।
নারীদের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সমাজে মায়েদের সম্মান নিশ্চিত করা জরুরি। মায়ের বুককে বিছানা বানিয়েই আমরা সবাই বড় হয়েছি, উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারীদের বিশেষ গুণাবলি রয়েছে, যা রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে অপরিসীম অবদান রাখে।



