ইসলামপন্থী জোটে আসন সমঝোতার জট, নির্বাচনের আগে অনিশ্চয়তায় ঐক্য
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:২৭ পিএম
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামপন্থী দলগুলোর ভোট এক ছাতার নিচে আনতে প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে একসঙ্গে কাজ করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (আইএবি)। তবে ভোটের মাঠে নামার ঠিক আগে এসে আসন ভাগাভাগি নিয়ে দুই দলের মধ্যে তৈরি হয়েছে টানাপোড়েন। শেষ পর্যন্ত এই সমঝোতা টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
জোটসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিক আলোচনায় জামায়াত নিজের জন্য ১৮০ থেকে ১৮৫টি আসন রাখতে চায়। বাকি আসনগুলো জোটের শরিকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই হিসাবে ইসলামী আন্দোলনের পর সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার কথা ছিল সদ্য গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)। কিন্তু এখানেই আপত্তি তোলে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন।
ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের দাবি, তাদের সংগঠনের মাঠপর্যায়ের শক্তি ও ভোটব্যাংকের তুলনায় প্রস্তাবিত আসনসংখ্যা কম। বিশেষ করে এনসিপিকে ৩০টি আসন দেওয়ার সিদ্ধান্তে তারা ক্ষুব্ধ। তাদের মতে, নবীন একটি দলকে অযথা অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই অবস্থান নিয়েছে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও।
শুরুতে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ আটটি দল নিয়ে আসন ভাগাভাগির আলোচনা চলছিল। তবে মনোনয়নপত্র জমার শেষ তারিখের একদিন আগে, ২৮ ডিসেম্বর, এনসিপি ও অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) জোটে যোগ দেয়। একই রাতে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) যুক্ত হওয়ার ঘোষণাও আসে। এতে শরিক দলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১টিতে।
ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ, নতুন দলগুলোকে জোটে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের মতামত যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি। তাদের মতে, জামায়াতের একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণই বর্তমান অসন্তোষের মূল কারণ।
তবে জামায়াত এই সংকটকে বড় করে দেখতে নারাজ। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, এখানে প্রকৃত কোনো সংকট নেই। বিভিন্ন দল ভিন্ন সময়ে জোটে যোগ দেওয়ায় প্রক্রিয়াটি কিছুটা সময় নিচ্ছে মাত্র।
অন্যদিকে উত্তেজনার মধ্যেও সমাধানের সম্ভাবনা দেখছেন ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম। তিনি বলেন, পারস্পরিক সম্মান ও সদিচ্ছা থাকলে এই সংকট কাটানো সম্ভব। কোনো দল যদি নিজেকে বড় আর অন্যকে ছোট ভাবতে শুরু করে, তাহলে ঐক্য টেকানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদও একই সুরে বলেন, প্রত্যেক দলকে তাদের অবস্থান অনুযায়ী ন্যায্য আসন দেওয়া হলে কোনো সংকট থাকবে না।
চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়ায় মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিনে উভয় পক্ষই ব্যাপকভাবে প্রার্থী দিয়েছে। জামায়াত ২৭৬টি আসনে এবং ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। এমনকি যেসব আসন একে অপরের জন্য ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল, সেখানেও উভয় দলের প্রার্থীরা মনোনয়ন দিয়েছেন।
জামায়াত যে ২৪টি আসনে প্রার্থী দেয়নি, সেগুলোর বেশির ভাগই এনসিপির জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানায়। কিছু আসনে অবশ্য ব্যতিক্রমীভাবে প্রার্থী প্রত্যাহারও করেছে জামায়াত।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, শুরুতে ইসলামী আন্দোলন ১৫০টি আসন দাবি করলেও পরে তা কমিয়ে ১২০ করা হয়। বর্তমানে তারা ৭০টির বেশি আসন চাইছে এবং ৪০ আসনের প্রস্তাবে রাজি নয়।
সমঝোতা কবে চূড়ান্ত হবে—এ প্রশ্নে জামায়াত ও শরিক দলগুলো আশাবাদী। মনোনয়ন যাচাই শেষ হওয়ার পর এই সপ্তাহের মধ্যেই সমঝোতা ঘোষণা হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
তবে ফয়জুল করিমের কথায়, এখনো জোট ভাঙেনি, কেউ বেরিয়েও যায়নি। সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সদিচ্ছা থাকলে সমঝোতা সম্ভব। কিন্তু যদি কেউ এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাহলে এই ঐক্য দীর্ঘস্থায়ী হবে না।



