নির্বাচনে দ্বিমুখী চাপে বিএনপি, বিদ্রোহী প্রার্থীতে ভোট ভাগের শঙ্কা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:১৬ পিএম
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ এখন আর শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং জোট রাজনীতির বাস্তবতায় দলটির জন্য বড় সংকট হয়ে উঠেছে নিজ দলের ভেতরের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। একদিকে সরকারবিরোধী জোটকে এক রাখার চাপ, অন্যদিকে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে মাঠে নামা নেতাদের সামলানো—এই দুইয়ের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে বিএনপি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির অন্তত ১৯০ জনের বেশি নেতা ১১৫টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এসব আসনের বড় অংশই জোটসঙ্গীদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আসন সমঝোতার বাস্তবতা
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি এককভাবে নয়, বরং একাধিক দল ও জোটসঙ্গী নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। জামিয়াত উলামায়ে ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন দলকে আসন ছেড়ে দিয়ে একটি বিস্তৃত সরকারবিরোধী ঐক্য গড়ে তোলাই বিএনপির কৌশল।
তবে এই কৌশল মাঠপর্যায়ে গিয়ে বাধার মুখে পড়ছে। যেসব আসনে বিএনপির শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে, সেখানে দলীয় কর্মী ও স্থানীয় নেতারা দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। হঠাৎ করে সেই আসন জোটসঙ্গীদের জন্য ছেড়ে দেওয়ায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সেই ক্ষোভ থেকেই অনেক নেতা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন।
বিদ্রোহ ও ভোট বিভাজনের শঙ্কা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিদ্রোহের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভোট বিভাজন। একই ভোটব্যাংকের ওপর নির্ভর করা একাধিক প্রার্থী থাকলে প্রতিদ্বন্দ্বী দল সুবিধা পেতে পারে। বিশেষ করে যেসব আসনে বিএনপির ঐতিহাসিকভাবে শক্ত অবস্থান রয়েছে, সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থীদের উপস্থিতি দলটির জন্য আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
এই ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে বিএনপি একদিকে বিকল্প প্রার্থী প্রস্তুত রেখেছে, অন্যদিকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিচ্ছে। দলটি জানিয়েছে, খেলাপি হওয়া, মামলা-মোকদ্দমা বা আইনি জটিলতায় মূল প্রার্থী বাদ পড়লে বিকল্প প্রার্থীকে চূড়ান্ত করা হবে।
কঠোর সাংগঠনিক বার্তা
বিএনপি ইতোমধ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ায় নয়জন নেতাকে বহিষ্কার করেছে। দলীয় সূত্র বলছে, ২০ জানুয়ারির মধ্যে যারা মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন না, তাদের ক্ষেত্রে বহিষ্কার ছাড়াও সদস্যপদ বাতিলের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, জোটসঙ্গীদের আশ্বস্ত করতে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে বিদ্রোহী নেতারা স্বেচ্ছায় মনোনয়ন প্রত্যাহার করলে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান তুলে ধরে যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেছেন, ২০ জানুয়ারির পর দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা নির্বাচনের মাঠে থাকবেন, তাদের জন্য কোনো ধরনের ছাড় থাকবে না। প্রয়োজনে আজীবন বহিষ্কারের সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে।
বিদ্রোহের উদাহরণ ও জোটের টানাপোড়েন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জামিয়াত উলামায়ে ইসলামের জন্য আসন ছেড়ে দিলেও ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জন্য আসন ছাড়লেও সেখানে মাঠে নেমেছেন বিএনপির সাইফুল আলম। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, ভোলা, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন আসনে।
এই পরিস্থিতি জোট রাজনীতির অন্তর্নিহিত দুর্বলতাকেই সামনে আনছে। একদিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজন, অন্যদিকে স্থানীয় রাজনীতির বাস্তবতা—এই দুইয়ের সংঘর্ষেই বিএনপির ভেতরে বিদ্রোহ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ সময় পর্যন্ত বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় কাজ হবে বিদ্রোহ কমিয়ে আনা এবং জোটের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। তা না হলে জোট রাজনীতির যে শক্তি দেখাতে চাচ্ছে বিএনপি, সেটিই উল্টো নির্বাচনে তাদের জন্য বড় দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।



