Logo
Logo
×

রাজনীতি

লাখো মানুষের দোয়ায় সমাহিত খালেদা জিয়া

শোক, শ্রদ্ধায় মহিমান্বিত বিদায়

জানাজার নগরীতে পরিণত ঢাকা, কয়েক কিলোমিটারজুড়ে শোকার্ত মানুষ

Icon

অনলাইন ডেস্ক :

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম

শোক, শ্রদ্ধায় মহিমান্বিত বিদায়

ছবি : সংগৃহীত

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জনসভায় দৃঢ়কণ্ঠের বক্তৃতায় আপসহীন নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন, সেখান থেকেই জনতার ভালোবাসায় শেষ বিদায় নিলেন খালেদা জিয়া। কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত তাঁর জানাজায় লাখ লাখ শোকার্ত মানুষ শরিক হয়ে শ্রদ্ধা জানান। গতকাল বুধবার সব দল-মতের মানুষের পথ মিলিত হয়েছিল খালেদা জিয়ার জানাজায়।

এ জানাজাকে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। রাজধানীর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ছাপিয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ হয়ে দক্ষিণে ধানমন্ডির সোবহানবাগ পর্যন্ত পৌঁছায় জানাজার কাতার। দক্ষিণ-পূর্বে ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার হয়ে বাংলামটর পর্যন্ত সড়কে ছিল মুসল্লিদের কাতার। উত্তরে মণিপুরিপাড়া হয়ে শেওড়াপাড়া এবং বিজয় সরণি হয়ে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত সড়কজুড়ে ছিল জানাজার কাতার। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ফার্মগেটমুখী নামার অংশেও জানাজায় দাঁড়ান মানুষ। অন্যদিকে শেরেবাংলা নগর, আগারগাঁও, শ্যামলী পর্যন্তও জানাজায় অংশ নেন হাজার হাজার মানুষ।

সড়কে জায়গা না পেয়ে হাজারো মানুষ আগারগাঁও, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনে জানাজার নামাজ আদায় করেন।  মূল সড়কের বাইরে আশপাশের সড়ক ও অলিগলিতে দাঁড়িয়েও শত শত মানুষ জানাজায় অংশ নেন। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন ভবনের ছাদ, ওভারব্রিজসহ যে যেখানে সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই দাঁড়িয়ে অংশ নেন খালেদা জিয়ার জানাজায়।

পাশাপাশি ফেনী, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, বরিশালসহ সারাদেশে অনেক স্থানে গায়েবানা জানাজা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশেও হয়েছে গায়েবানা জানাজা। এ ছাড়া কোটি মানুষ টেলিভিশন এবং সামাজিক মাধ্যমে সম্প্রচারিত জানাজা দেখেন। 

জানাজার জন্য গতকাল ছিল সরকারি ছুটি। 

জোহরের নামাজের পর দুপুর ২টায় জানাজা শুরুর কথা থাকলেও বেলা ১১টার আগেই পূর্ণ হয়ে যায় দক্ষিণ প্লাজার মাঠ এবং মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ। সারাদেশ থেকে আসা লাখ লাখ মানুষের জমায়েতে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল মালেকের ইমামতিতে জানাজা শুরু হয় বিকেল ৩টা ৭ মিনিটে। প্রথম সারিতে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর দুই পাশে ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান এবং প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। 

তাঁদের পাশে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। জানাজায় অংশ নেন উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জ্যেষ্ঠ নেতা, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরা। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণায় তারা কালোব্যাজ ধারণ করেন।  

জানাজার আগে সংসদ ভবনে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে পাকিস্তানের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা শোকবার্তা হস্তান্তর করেন।  উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। 

দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পার্থিব দেহ জাতীয় পতাকায় মুড়িয়ে শেষবারের মতো সংসদ ভবনে আনা হয়। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বিএনপির চেয়ারপারসনের জীবনী পাঠ করেন। 

তিনি বলেন, তাঁর মৃত্যুর দায় থেকে ফ্যাসিবাদী হাসিনা কখনও মুক্তি পাবে না। এই বক্তব্যে উপস্থিত লাখো জনতা সমস্বরে সমর্থন জানান। এরপর তারেক রহমান মুসল্লিদের উদ্দেশে ধর্মীয় রীতিতে  কথা বলেন। মরহুমা মায়ের ভুলত্রুটি থাকলে ক্ষমা করার অনুরোধ জানান। 

জানাজা শেষে সামরিক তত্ত্বাবধায়নে খালেদা জিয়াকে নেওয়া হয় জিয়া উদ্যানে তাঁর স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধি প্রাঙ্গণে। সেখানে তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় স্বামীর কবরের পাশে।

অগণিত মানুষের ঢল 

১০ বছর বাংলাদেশের দায়িত্ব পালন করা খালেদা জিয়া গত মঙ্গলবার ভোরে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর সারাদেশ শোক জানায়। স্বৈরাচার এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুরুদ্ধারের দীর্ঘ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি সমর্থকদের কাছে হয়ে ওঠেন আপসহীন দেশনেত্রী। বিএনপির নেতাকর্মীরা তাঁকে গণতন্ত্রের মা হিসেবে আখ্যা দেন। 

৪১ বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া বারবার নির্বাচনে জয়ী হয়ে নিজের জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিয়েছেন। সংসদ ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র। তাঁকে অন্তিম বিদায় জানাতে সেই সংসদ প্রাঙ্গণকেই বেছে নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। আগের দিনই জানানো হয়েছিল রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় নেবেন সাবেক ফার্স্ট লেডি এবং সাবেক সেনাপ্রধানের পত্নী খালেদা জিয়া। 

দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা জানাজায় অংশ নেওয়ায় সংসদ ভবন এবং মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ঘিরে ছিল কয়েক স্তরের নিরাপত্তা। কারামুক্ত খালেদা জিয়া জীবনের শেষ বছরগুলোর বেশির ভাগ সময় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিলেন। মৃত্যুর পর সেখানকার হিমঘরে রাখা হয়েছিল তাঁকে। গতকাল সেখান থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর কফিন নিয়ে শোক র‌্যালি হয়। সেনাসদস্যরা রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়ার কফিনবাহী গাড়িটিকে প্রথমে গুলশানে তারেক রহমানের বাসায় এবং পরে সেখান থেকে সংসদ ভবন এলাকায় নিয়ে আসেন। রাস্তায় দুই পাশে হাজারো মানুষ অশ্রুসিক্ত নয়নে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে শেষ বিদায় জানান।

খালেদা জিয়ার কফিন সংসদ ভবনে পৌঁছানোর আগেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে পা ফেলার জায়গা ছিল না। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর পশ্চিম প্রান্তে ভিড়ে অসুস্থ হয়ে নিরব হোসেন নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তাঁর বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায়।

বেলা ৩টার দিকে জানাজা রূপ নেয় জনসমুদ্রে। নামাজের পর লাখ লাখ মুসল্লি দোয়া করেন খালেদা জিয়ার জন্য। এ সময় তাদের আমিন আমিন ধ্বনিতে মুখরিত হয় আশপাশের এলাকা। 

সব মতের মানুষ এক কাতারে

খালেদা জিয়ার জানাজায় শুধু বিএনপির নেতাকর্মী নয়, ঢল ছিল সাধারণ মানুষের। আসেন জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মতো বিএনপির নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর নেতাকর্মীরাও। বিএনপির নির্বাচনী জোটের শরিক দলের নেতাকর্মীরাও ছিলেন। 

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ড. মঈন খান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, এজেডএম জাহিদ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, কেন্দ্রীয় নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর, অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, আব্দুস সালাম আজাদ, অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান, নজরুল ইসলাম আজাদসহ বিএনপির সর্বস্তরের নেতারকর্মীরা জানাজায় শরিক হন। 

নারীদের জন্য নির্ধারিত জায়গা ছিল জানাজায়। তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান, তাদের মেয়ে জাহিয়া রহমান, জাফিয়া রহমানসহ পরিবারের সদস্য এবং উপদেষ্টা সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান, নুরজাহান বেগম ও ফরিদা খাতুন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। 

জানাজায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুহাম্মদ সৈয়দ ফয়জুল করীম, বাংলাদেশ খেলাফতের আমির মামুনুল হক, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমসহ জ্যেষ্ঠ নেতারাও ছিলেন। জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীসহ দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা জানাজায় আসেন। তবে তারা দক্ষিণ প্লাজায় নয়, নামাজ আদায় করেন রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে।

খালেদা জিয়ার কফিন বহন করেন মিজানুর রহমান আজহারী, শায়খ আহমদুল্লাহসহ দেশের শীর্ষ আলেমরা। ছিলেন চিন্তক ফরহাদ মজহারসহ বিভিন্ন পেশার বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, শিল্পীরা। 

শোক অশ্রু শ্রদ্ধা

মিরপুর, গাবতলী, মোহাম্মদপুর, বছিলা, উত্তরাসহ ঢাকার নানা প্রান্ত থেকে হেঁটেই জানাজায় সাধারণ মানুষ যোগ দেন। দূরদূরান্তের অনেকে আগের রাতেই রওনা হন। ময়মনসিংহ থেকে আসা আবদুল কাউয়ুম রতন জানান, তিনি কোনো দল করেন না। বিএনপিকে ভোট দেবেন কিনা, তা নিশ্চিত নয়। কিন্তু খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা করেন। তাই জানাজায় অংশ নিতে এসেছেন। 

জানাজায় আসা এনসিপির নেতা আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন, রাজনৈতিক পথ ভিন্ন হলেও খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতীক মনে করে শ্রদ্ধা করে। তিনি নেতৃত্বে না থাকলে,  আধিপত্যবাদীরা বাংলাদেশকে গ্রাস করত। তাই খালেদা জিয়ার জানাজায় আসা।

জানাজার জন্য খালেদা জিয়ার মরদেহ দক্ষিণ প্লাজায় পৌঁছানোর ঘোষণা মাইকে এলে কান্নার রোল ওঠে মানিক মিয়ায়। নিজেকে বিএনপি কর্মী পরিচয় দিয়ে গাজীপুরের গাছা এলাকা থেকে আসা মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘পুলিশ আমাকে ২০১৩ সালে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। জামিন করানোর কেউ ছিল না। আমার স্ত্রী ম্যাডামকে জানানোর পর আমার জামিনের ব্যবস্থা হয়। ম্যাডাম নেই, এখন আমাদের কে দেখবে?’

পুরান ঢাকার ৮৩ বছর বয়সী আলী আব্বাস জানান, সেই ১৯৮৪ সাল থেকে খালেদা জিয়ার জনসভায় যেতেন। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়েও অনেক জনসভায় এসেছেন। বয়সের কারণে ২০০১ সালের পর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যান না। শুধু খালেদা জিয়ার কারণে দুর্বল শরীর নিয়ে এসেছেন। অনেক ঘুরে ইন্দিরা রোড পর্যন্ত রিকশায় এসেছেন। সেখান থেকে হেঁটে সেচ ভবন পর্যন্ত এসে এই কনকনে শীতে হাঁপিয়ে গেছেন তিনি। ভিড়ের কারণে আর সংসদ পর্যন্ত যেতে পারছেন না। 

খালেদা জিয়ার কফিন একনজর দেখতে আসা অগণিত মানুষ সংসদ ভবনের দক্ষিণ পাশের মাঠের গ্রিল দেওয়া দেয়াল টপকে প্রবেশ করে। সেনাবাহিনী প্রথমে বাধা দিলেও পরে সহায়তা করে। 

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন