আল–জাজিরার বিশ্লেষণ
খালেদা জিয়ার প্রয়াণে বিএনপি উত্তরাধিকার থেকে জনরায়ের সন্ধিক্ষণে
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:১২ পিএম
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতাল গত মঙ্গলবার পরিণত হয় এক গভীর জাতীয় শোকের কেন্দ্রে। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দীর্ঘদিনের নেত্রী খালেদা জিয়া আর নেই—এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে নেমে আসে নীরব স্তব্ধতা। গত ২৩ নভেম্বর থেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা এই নেত্রীর মৃত্যু কেবল একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়, বরং একটি যুগের অবসান।
হাসপাতালের ফটকের সামনে সমর্থক, দলীয় নেতা ও সাধারণ মানুষ নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কারও চোখে জল, কারও ঠোঁটে প্রার্থনা। বিএনপি কর্মী রিয়াদুল ইসলাম বলছিলেন, খবরটা শোনার পর ঘরে বসে থাকা সম্ভব হয়নি। তাঁকে দেখার সুযোগ নেই, তবু সবাই এখানে এসেছে।
পরদিন বুধবার ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকেই তুলে ধরে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিদেশি কূটনীতিকদের উপস্থিতি জানান দেয়—তাঁর প্রভাব কেবল দলীয় রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না।
কিন্তু এই শোকের আবহের মধ্যেই বিএনপির সামনে দাঁড়িয়ে গেছে এক কঠিন বাস্তবতা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। যিনি বছরের পর বছর অসুস্থতা ও রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার মধ্যেও দলের ঐক্যের প্রতীক ছিলেন, তাঁকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো নির্বাচনী লড়াইয়ে নামছে বিএনপি।
এই মৃত্যু দিয়ে দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করল ‘খালেদা–উত্তর’ যুগে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ার পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এখন সব দায়িত্ব ও নজরের কেন্দ্রবিন্দু তারেক রহমান। দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন এবং কার্যত দলের সর্বমুখী নেতৃত্বের ভার গ্রহণ করেন।
ধ্রুবতারা হারানোর পর নেতৃত্বের পরীক্ষা
কয়েক দশক ধরে খালেদা জিয়া ছিলেন বিএনপির নৈতিক ভারকেন্দ্র। দৃশ্যমান রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও দলীয় সিদ্ধান্তে তিনিই ছিলেন শেষ কথা। তাঁর উপস্থিতিই অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ঠেকিয়ে রেখেছিল।
তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন আল–জাজিরাকে বলেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশ একজন ‘প্রকৃত অভিভাবক’ হারিয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘আইনের শাসন, মানবাধিকার ও শক্তিশালী সংসদীয় গণতন্ত্রই ছিল তাঁর রাজনীতির মূল ভিত্তি।’ তিনি জানান, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এই নীতিগুলোকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
মাহদী আমিনের দাবি, শেখ হাসিনার ২০০৯–২০২৪ শাসনামলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান ও অধিকার পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেই তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৩১ দফার সংস্কার কর্মসূচি প্রণীত হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কারিশমা যে স্থিতিশীলতা তৈরি করেছিল, তা আর নেই। লেখক ও বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, তারেক রহমানকে এখন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজের নেতৃত্ব প্রমাণ করতে হবে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তাঁর জন্য ভাগ্যনির্ধারক।
বদলে যাওয়া রাজনৈতিক মাঠ
তিন দশকের দ্বিদলীয় রাজনীতির পর বাংলাদেশ এখন এক নতুন মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ায় বিএনপির সামনে তৈরি হয়েছে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠ। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন থেকে উঠে আসা তরুণদের দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করেছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী মনে করেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক জ্যেষ্ঠ স্থিতিশীল ব্যক্তিত্বের শূন্যতা তৈরি করেছে। তাঁর মতে, ‘বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—উভয়ই ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল ছিল। এখন বিএনপিতে সেই জায়গাটি স্বাভাবিকভাবেই তারেক রহমানের।’
উত্তরাধিকার নয়, জনরায়ই চূড়ান্ত
দলীয় নেতৃত্ব স্বীকার করছে, কেবল উত্তরাধিকার দিয়ে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে না। তৃণমূলে চাঁদাবাজির অভিযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভিজ্ঞ ও নবীনদের ভারসাম্য—সব মিলিয়ে তারেক রহমানের পথ সহজ নয়।
কক্সবাজার থেকে জানাজায় আসা যুবদল নেতা কামাল উদ্দিন বলেন, ‘চ্যালেঞ্জ থাকবে, তবে নেতৃত্ব প্রমাণের সুযোগও এটাই।’
অন্যদিকে, বিএনপির নীতিনির্ধারকরা তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাষায়, ‘তাঁর নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত।’
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি একটাই—খালেদা জিয়ার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার কি তারেক রহমান জনরায়ে রূপ দিতে পারবেন? ফেব্রুয়ারির নির্বাচনই দেবে সেই উত্তর। রাজনীতির এই সন্ধিক্ষণে বিএনপির সামনে পরীক্ষা শুধু ক্ষমতার নয়, বিশ্বাসেরও।



