মারণাস্ত্র ছাড়া দায়িত্ব পালনের নির্দেশনায় পুলিশের ভেতরে তীব্র অসন্তোষ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৫, ১২:৪৪ এএম
ছবি : সংগৃহীত
সম্প্রতি মাঠ পর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের ডিউটিকালীন সময় মারণাস্ত্র বাদ দিয়ে লাঠি বা শটগান নিয়ে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনায় পুলিশের ভেতরে তীব্র ক্ষোভ, অসন্তোষ এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, এই নির্দেশনা পুলিশের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
গত বুধবার স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন-২ (এসএসএফ) একটি আদেশে জানায়, এএসআই ও কনস্টেবল পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের এখন থেকে মারণাস্ত্র ছাড়াই শুধু লাঠি নিয়ে সতর্ক অবস্থানে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আদেশটি প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। অনেকেই প্রকাশ্যে না বললেও নিজেদের মধ্যে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
পুলিশের অনেক সদস্য মনে করছেন, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই ধরনের সিদ্ধান্ত তাদের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। একদিকে বিভিন্ন ধরণের ভারী অস্ত্রধারী অপরাধী দলের তৎপরতা, অন্যদিকে নিজের আত্মরক্ষার উপায় সংকুচিত হয়ে যাওয়া – এই দুইয়ের মাঝে পড়ে অনেক পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালনে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ বলছেন, তারা এখন কেবল চাকরি বাঁচাতে গা বাঁচিয়ে চলার নীতিতে যাচ্ছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর থেকে ৫ হাজার ৭৫০টির বেশি অস্ত্র ও ৬.৫ লাখ রাউন্ড গোলাবারুদ লুট হয়। এর মধ্যে এখনও ১ হাজার ৩৭৭টি অস্ত্র এবং ২.৫ লাখের বেশি গোলাবারুদ উদ্ধার হয়নি। লুণ্ঠিত অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে অত্যাধুনিক রাইফেল, এসএমজি, স্নাইপার, গ্রেনেড লঞ্চার, এমনকি শেখ হাসিনার পলায়নের সময় গণভবন থেকে খোয়া যাওয়া এসএসএফের অস্ত্র ও অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তিও।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক উপ-পরিদর্শক বলেন, “আমাদের হাতে অস্ত্র না থাকলে আমরা অস্ত্রধারী আসামিদের কীভাবে আটক করব? এমনিতেই মানুষ পুলিশের কথা শুনছে না, এখন অস্ত্র তুলে নিলে তো পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।” আরেক এএসআই বলেন, “বিশেষ অভিযানে গেলে আমরা নিজেরাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি। এই নির্দেশনার ফলে দায়িত্ব পালনের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।”
সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেন, “পুলিশ বহু বছর ধরে ভারী অস্ত্র ব্যবহারে অভ্যস্ত। চরমপন্থী বা জঙ্গিদের সঙ্গে সংঘর্ষে পুলিশের অস্ত্র অপরিহার্য ছিল এবং এখনও অপরাধীদের হাতে ভারী অস্ত্র রয়েছে। শর্টগান দিয়ে তাদের মোকাবেলা কঠিন।” তবে তিনি মনে করেন, সরকারের সিদ্ধান্তটি নিশ্চয় কিছু ভাবনার ফসল এবং এর বিকল্প পরিকল্পনাও রয়েছে।
মানবাধিকার কর্মী এ এস এম নাসির উদ্দিনের মতে, “পুলিশ জনগণের বন্ধু। তাদের হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত অস্ত্র থাকা মানেই মানবাধিকার লঙ্ঘন। রাজনৈতিক সরকারগুলো অতীতে পুলিশকে ব্যবহার করেছে নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে। এ ধরনের অনৈতিক কাজ যাতে আর না হয়, সে জন্যই এই সিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয়।”
পুলিশ সদস্যরা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এখনকার পরিস্থিতিতে তারা নিজেরাই লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছেন। এমন সিদ্ধান্ত তাদের ঝুঁকিতে ফেলছে এবং কাজের প্রতি আত্মবিশ্বাস নষ্ট করছে। ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার বদলে অনেকেই কেবল গা বাঁচিয়ে ডিউটি করার প্রবণতা নিচ্ছেন, যা সামগ্রিকভাবে সমাজে অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
পুলিশের মারণাস্ত্র ছাড়ার নির্দেশনা নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে যেমন দুঃচিন্তা ও হতাশা ছড়িয়ে পড়ছে, তেমনি সমাজের বিভিন্ন স্তরেও প্রশ্ন উঠছে: বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর এবং নিরাপদ? যতক্ষণ না বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থা বা উপযুক্ত প্রতিরোধ কৌশল কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকছে।



