২৭ বিদেশি এয়ারলাইন্সের কাছে বেবিচকের পাওনা ১১৪ কোটি টাকা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম
বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার ও উড়োজাহাজ অবতরণের ফি বাবদ ২৭টি বিদেশি এয়ারলাইন্সের কাছে প্রায় ১১৪ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক)। এসব এয়ারলাইন্সের বেশিরভাগই বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বকেয়া টাকা আদায় নিয়ে বিপাকে পড়েছে সংস্থাটি।
বেবিচকের নথি অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এসব পাওনা জমেছে। এর মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া ১৮টি এয়ারলাইন্সের কাছে বকেয়া রয়েছে ৬৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
এছাড়া, নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে, এমন তিনটি এয়ারলাইন্সের কাছে বেবিচকের পাওনা ৪২ কোটি টাকা। এগুলো হলো ভারতের স্পাইসজেট ও অ্যালায়েন্স এয়ার এবং তুর্কমেনিস্তান এয়ারলাইন্স।
অন্যদিকে, কার্যক্রম স্থগিত করেছে বা অন্য এয়ারলাইন্সের সঙ্গে একীভূত হয়েছে, এমন ছয়টি এয়ারলাইন্সের কাছে পাওনা রয়েছে আরও ৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
চালু এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে স্পাইসজেটের কাছে পাওনা সবচেয়ে বেশি। ২০২১ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার ও উড়োজাহাজ অবতরণের ফি বাবদ প্রতিষ্ঠানটির কাছে বেবিচকের পাওনা ৩৪ কোটি টাকা।
বন্ধ হয়ে যাওয়া এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে এয়ার ডেকানের কাছে ২০০৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আকাশসীমা ব্যবহারের ফি বাবদ পাওনা ১৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। আর আলিতালিয়া এয়ারলাইন্সের কাছে ১৯৮৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাওনা ১২ কোটি টাকা।
বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগ) এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলম জানান, উড়োজাহাজের আকার ও ওজন অনুযায়ী বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করে উড়ে যাওয়ার জন্য প্রতিটি এয়ারলাইন্সকে ৩০০ থেকে ৪৫০ ডলার পর্যন্ত ফি দিতে হয়।
তিনি বলেন, ‘একটি উড়োজাহাজ বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত একবারই এই ফি দিতে হয়। কত মিনিট আকাশসীমায় থাকল, তার ভিত্তিতে ফি নির্ধারণ করা হয় না।’
কোনো দেশের আকাশসীমায় অবতরণ না করে শুধু সেই আকাশসীমা ব্যবহার করে অন্য গন্তব্যে যাওয়ার জন্য এয়ারলাইন্সকে যে ফি দিতে হয়, তা ওভারফ্লাইট ফি বা আকাশপথ ব্যবহারের চার্জ হিসেবে পরিচিত।
বেবিচক বিলের হিসাব দেওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে এয়ারলাইন্সগুলোকে এই ফি পরিশোধ করতে হয়।
বেবিচকের সদস্য (অর্থ) মোহাম্মদ নাজমুল হক জানান, বকেয়া আদায়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেছে কর্তৃপক্ষ। যেসব দেশের এয়ারলাইন্সের কাছে টাকা পাওনা রয়েছে, সেসব দেশের দূতাবাসকে বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসে বকেয়ার বিষয়ে চিঠি দিয়েছি। সর্বশেষ গত জুনেও এ ধরনের চিঠি পাঠানো হয়েছে।’
নাজমুল হক বলেন, ‘কোনো এয়ারলাইন্স দেউলিয়া হয়ে গেলে তার কাছ থেকে পাওনা আদায় করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। আবার কিছু ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ নিতে যে খরচ হয়, তা পাওনা টাকার চেয়েও বেশি হতে পারে।’
বকেয়া পরিশোধ না করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের অর্থ বিদেশে পাঠানোর অনুমোদন আটকে দেওয়ার উদ্যোগও নেয় বেবিচক।
উদাহরণ হিসেবে জেট এয়ারওয়েজের কথা উল্লেখ করেন নাজমুল হক। তিনি বলেন, ‘এয়ারলাইন্সটির কিছু অর্থ বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলার খবর পেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিষয়টি জানায় বেবিচক। পরে অর্থ স্থানান্তর বন্ধ করা হয়।’
নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে এবং বকেয়া আছে, এমন তিন এয়ারলাইন্স—স্পাইসজেট, তুর্কমেনিস্তান এয়ারলাইন্স ও অ্যালায়েন্স এয়ারের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ করেন এই প্রতিবেদক। এর মধ্যে শুধু স্পাইসজেট জবাব দিয়েছে। তবে বেবিচকের পাওনার পরিমাণ তারা নিশ্চিতও করেনি, আবার অস্বীকারও করেনি।
এয়ারলাইন্সটির এক মুখপাত্র বলেন, ‘পাওনার হিসাব মেলানো ও এ নিয়ে আলোচনা চলছে। অতীতেও বেবিচকের সঙ্গে এ ধরনের বিষয় সমাধান করা হয়েছে।’
বকেয়া আদায়ে জটিলতা থাকলেও বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী উড়োজাহাজ থেকে বেবিচকের আয় বাড়ছে।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আকাশসীমা ব্যবহারের ফি বাবদ আয় হয়েছে ৫৫৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৫০২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ২০২৪ সালের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৪৪৩ কোটি ১২ লাখ টাকা।
এ সময়ে বাংলাদেশের আকাশসীমা দিয়ে উড়োজাহাজ চলাচলও বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে অন্তত ১ লাখ ২১ হাজার ৫১৬টি ফ্লাইট বাংলাদেশের আকাশসীমা অতিক্রম করেছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৪টি।
বেবিচকের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, গত জানুয়ারিতে নতুন রাডার চালু হওয়ায় আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ এবং এ খাত থেকে আয় বাড়ানোর সক্ষমতা বেড়েছে। তবে আয়ের এই বৃদ্ধি শুধু রাডার চালুর কারণে হয়েছে, এমনটা বলা যাবে না বলেও উল্লেখ করেন তারা।
অন্য দেশ যেভাবে পাওনা আদায় করে
ভারতে আকাশসীমা ব্যবহারের ফি আদায়ের দায়িত্ব সরাসরি দেশটির বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এয়ারপোর্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়ার (এএআই) হাতে রয়েছে। আগে এ ফি আদায়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (আইএটিএ) মাধ্যমে ব্যবস্থা চালু ছিল।
ভারতের অ্যারোনটিক্যাল ইনফরমেশন পাবলিকেশন অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১ এপ্রিল থেকে দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা ও চেন্নাইয়ের ফ্লাইট ইনফরমেশন অঞ্চলের আকাশসীমা অতিক্রমকারী উড়োজাহাজের পথনির্দেশনা-সংক্রান্ত ফি সরাসরি আদায় করছে এএআই।
ফ্লাইট ইনফরমেশন অঞ্চল বা এফআইআর হলো কোনো দেশের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত আকাশসীমার একটি এলাকা। সেখানে উড়োজাহাজকে উড্ডয়ন-সংক্রান্ত তথ্য দেওয়া এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সতর্ক করার মতো সেবা দেওয়া হয়।
এএআইয়ের ঋণনীতি অনুযায়ী, কোনো বিদেশি এয়ারলাইন্স বা আকাশসীমা ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের বকেয়া তার ব্যাংক গ্যারান্টির ৭৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ সেই গ্যারান্টি ভাঙিয়ে টাকা আদায় করতে পারে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে আগাম অর্থের বিনিময়ে সেবা নেওয়ার ব্যবস্থায় আনা যায়। প্রয়োজনে ওই এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট পরিচালনাও বন্ধ করা যেতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ শ্রীলঙ্কাও এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে। দেশটির ২০২৩ সালের আকাশপথ ব্যবহারের ফি-সংক্রান্ত বিধিমালা অনুযায়ী, কলম্বোর ফ্লাইট ইনফরমেশন অঞ্চলের আকাশসীমা অতিক্রমকারী উড়োজাহাজকে বিল পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে ফি পরিশোধ করতে হয়।
নির্ধারিত সময়ে টাকা না দিলে বকেয়া অর্থের ওপর মাসে ২ শতাংশ হারে সুদ আরোপ করা যেতে পারে। আগের বছরগুলোর বকেয়াও পরিশোধ করতে হবে রাষ্ট্রকে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক উইং কমান্ডার এ টি এম নজরুল ইসলাম মনে করেন, বকেয়া আদায়ে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের দেশে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে বেবিচক।
তিনি বলেন, ‘ওই দেশের আদালতে মামলা করা যেতে পারে। এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আলাদা কোনো আন্তর্জাতিক আর্থিক আদালত নেই।’
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমানের মতে, স্বয়ংক্রিয় বিল তৈরি ও অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া জমেছে।
তিনি বলেন, ‘অনেক দেশে পুরো প্রক্রিয়াটাই স্বয়ংক্রিয়। সেখানে একটা পেমেন্ট গেটওয়ে থাকে, আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা চলে আসে। কিন্তু এখানে এখনো হাতে বিল তৈরি করা হয়।’
মফিদুর রহমান বলেন, ‘নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করা এয়ারলাইন্সগুলোর কার্যক্রমে বিধিনিষেধ আরোপ করে বকেয়া পরিশোধে বাধ্য করা যেতে পারে। অতীতে এ ধরনের কিছু এয়ারলাইন্সের কাছ থেকে বকেয়া আদায় করেছে বেবিচক। তবে অনিয়মিতভাবে বা নির্ধারিত সময়সূচির বাইরে ফ্লাইট পরিচালনা করা এয়ারলাইন্সের ক্ষেত্রে পাওনা আদায় কঠিন।’
পাওনা আদায়ে বেবিচকের তৎপরতার ঘাটতি ছিল বলেও স্বীকার করেন সাবেক এই চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে তাগাদা দেওয়ার ঘাটতি ছিল। আমাদের কর্মকর্তারা প্রায়ই বিষয়গুলো অনুসরণ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট কঠোর ছিলেন না। বকেয়া থেকে যাওয়ার এটাও একটা কারণ।’
মফিদুর রহমান আরও বলেন, ‘আগে বিল তৈরি ও অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হওয়ায় তা বাস্তবায়িত হয়নি।’
বকেয়া আদায় বাড়াতে দ্রুত স্বয়ংক্রিয় বিল তৈরি ও অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করেও পাওনা আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
নতুন রাডারে বাড়ছে নজরদারি
এয়ার কমোডর নূর-ই-আলম জানান, জানুয়ারিতে চালু হওয়া নতুন রাডার ব্যবস্থা আকাশসীমা পর্যবেক্ষণে বড় পরিবর্তন এনেছে।
এখন আগের চেয়ে বিস্তৃত এলাকায় উড়োজাহাজের চলাচল পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে। এতে কোনো উড়োজাহাজের চলাচলের তথ্য নথিভুক্ত না হওয়ার আশঙ্কা কমেছে। ফলে ফি আদায় থেকে আয় বাদ পড়ার ঝুঁকিও কমেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘সমন্বিত রাডার ব্যবস্থার মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের যোগাযোগ সক্ষমতা বেড়েছে। চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ দিকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় উড়োজাহাজের চলাচল পর্যবেক্ষণ ও যোগাযোগের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।’



