Logo
Logo
×

জাতীয়

ডেঙ্গুতে আক্রান্তের বড় অংশ পুরুষ হলেও নারীর মৃত্যু কেন বেশি

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৩ এএম

ডেঙ্গুতে আক্রান্তের বড় অংশ পুরুষ হলেও নারীর মৃত্যু কেন বেশি

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি। তবে নারীদের মধ্যে মৃত্যুর হার বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রায় ৬২ দশমিক ১ শতাংশ পুরুষ, ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ নারী। অন্যদিকে, লিঙ্গভিত্তিক হিসাবে ডেঙ্গুতে মৃতদের মধ্যে নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের অসুস্থতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়া, চিকিৎসা নিতে দেরি করা এবং আর্থিক ও সামাজিক বাধা তাদের মৃত্যু ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক লাখ ১৮ হাজার ৫০২ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ৩৬৮ জন। বুধবার এক দিনেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার মারা গেছে চারজন।

চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৭৩ হাজার ৩৮২ জন পুরুষ এবং ৪৪ হাজার ৮৭৫ জন নারী। অর্থাৎ, পুরুষের সংখ্যা নারীর তুলনায় অনেক বেশি।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লিঙ্গভিত্তিক হিসাবে, এ বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৩৬৮ জনের মধ্যে ১৯২ জন নারী এবং ১৭১ জন পুরুষ। এ হিসাবে মৃতদের ৫২ দশমিক ১৭ শতাংশ নারী এবং ৪৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ পুরুষ।

২৬ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত বেশি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিনের বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৬ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এ বয়সসীমার পাঁচটি শ্রেণিতে পুরুষ ও নারীর পৃথক সংখ্যা যোগ করলে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২ হাজার ৫৩১, যা মোট আক্রান্তের ৪৪ দশমিক ৩২ শতাংশ।

এ বয়সী আক্রান্তদের মধ্যে ৩১ হাজার ৮২৭ জন পুরুষ এবং ২০ হাজার ৭০৪ জন নারী।

মৃত্যুর ক্ষেত্রেও এ বয়সসীমায় নারীর সংখ্যা বেশি। ২৬ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে পুরুষ ও নারীর পৃথক সংখ্যা যোগ করলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৭৩। তাদের মধ্যে ৭৫ জন পুরুষ এবং ৯৮ জন নারী।

এ বয়সীদের মৃত্যু মোট ৩৬৮ মৃত্যুর ৪৭ শতাংশ। ২৬ থেকে ৫০ বছর বয়সী মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে নারী ৫৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ, পুরুষ ৪৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

নারীদের মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার কারণ কী?

বিশিষ্ট রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, ডেঙ্গুতে নারীদের মৃত্যুর পেছনে সামাজিক বৈষম্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তার মতে, পরিবারের পুরুষ সদস্যদের তুলনায় নারীরা অনেক সময় নিজেদের অসুস্থতাকে কম গুরুত্ব দেন। আবার পরিবারের অন্য সদস্যরাও নারীদের চিকিৎসার প্রয়োজনকে যথেষ্ট গুরুত্ব না-ও দিতে পারেন।

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের নারীরা চিকিৎসা নিতে দেরি করতে পারেন। চিকিৎসার খরচ, সংসারের দায়িত্ব এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রয়োজন মেটানোর বিষয়টি তাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে অসুস্থ হলেও অনেক নারী দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান না।

তিনি বলেন, গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরে বিভিন্ন পরিবর্তন আসে। এ সময় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। আবার মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ থাকলে সেটিও শারীরিক অবস্থাকে জটিল করতে পারে।

রাজধানীর মাতুয়াইলের মা ও শিশু ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাহমিনা ডেইজি বলেন, গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু হলে মা ও শিশু, দুজনেরই গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি থাকে। গর্ভাবস্থায় শরীরে বিভিন্ন শারীরিক পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গুর জটিলতা শনাক্ত করতে দেরি হতে পারে। সতর্কতার লক্ষণগুলো ঠিকমতো পর্যবেক্ষণ করা না হলে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া না গেলে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে।

তিনি বলেন, গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু হলে রক্তের অণুচক্রিকা কমে যাওয়া, রক্তক্ষরণ ও যকৃতের জটিলতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি গর্ভপাত, সময়ের আগে সন্তান জন্ম নেওয়া, শিশুর ওজন কম হওয়া এবং গর্ভের শিশুর শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতার ঝুঁকিও থাকে। প্রসবের কাছাকাছি সময়ে মায়ের ডেঙ্গু হলে বিরল ক্ষেত্রে সংক্রমণ শিশুর মধ্যেও ছড়াতে পারে।

ডা. তাহমিনা ডেইজির মতে, গর্ভাবস্থার বাইরেও নারীদের অসুস্থতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অনেক নারী নিজের অসুস্থতাকে অবহেলা করেন। পরিবার ও সমাজ থেকেও তারা প্রয়োজনীয় যত্ন পান না। জ্বর দেখা দেওয়ার পরপরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি হলেও অনেকে শারীরিক অবস্থা বেশি খারাপ হওয়ার পর চিকিৎসা নিতে আসেন। এতে সময়মতো ডেঙ্গু শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ে।

নারীদের পুষ্টির ঘাটতি ও রক্তস্বল্পতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

সময়মতো চিকিৎসা ও সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমাতে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা, রোগী শনাক্তের পর যথাযথ যত্ন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।

তার মতে, চিকিৎসার খরচের পাশাপাশি পরিবারের শিশুদের খাবার ও দেখাশোনার চিন্তাও অনেককে হাসপাতালে যেতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। তাই চিকিৎসার ব্যয় কমানোর পাশাপাশি রোগীর পরিবারের জন্য সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এতে নারী, পুরুষ, শিশু ও বয়স্ক, সব বয়সী মানুষের সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ বাড়বে।

ডা. তাহমিনা ডেইজি বলেন, নারীদের ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতন করতে পরিবার থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে নারীদের পাশাপাশি পরিবারের পুরুষ সদস্যদেরও যুক্ত করা জরুরি। জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং ডেঙ্গুর সতর্কসংকেত সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, পাড়া-মহল্লায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো যেতে পারে। হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের বহির্বিভাগে নারীদের পুষ্টি, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি পোস্টার, ব্যানার ও অন্যান্য প্রচারের মাধ্যমে ডেঙ্গু সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো দরকার।

অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা নারীদের জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, স্বাস্থ্যসেবা নিতে আর্থিক বাধা কমাতে বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে।

পরিবার ও সমাজ নারীদের অসুস্থতাকে গুরুত্ব দিয়ে সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করলে ডেঙ্গুজনিত জটিলতা ও মৃত্যু কমাতে সহায়ক হবে বলে মনে করেন এই চিকিৎসক।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন