Logo
Logo
×

জাতীয়

সৌরশক্তিকে বিদ্যুতের প্রধান উৎস করতে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম

সৌরশক্তিকে বিদ্যুতের প্রধান উৎস করতে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

ময়মনসিংহে ৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রে সূর্যের দিকে মুখ করে থাকা সৌর প্যানেল। ফাইল ছবি: রয়টার্স

বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ এখনও গ্যাস, কয়লা, জ্বালানি তেল, জলবিদ্যুৎ ও আমদানিনির্ভর বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ। কিন্তু সূর্যের আলোকে এসব উৎসের পাশাপাশি বিদ্যুতের বড় একটি উৎস হিসেবে গড়ে তোলা কতটা সম্ভব? প্রশ্নটি এখন শুধু পরিবেশের সুরক্ষার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জ্বালানি নিরাপত্তা, আমদানি ব্যয় ও বিদ্যুতের ভবিষ্যৎ চাহিদা।

বাংলাদেশ অবশ্যই সৌরশক্তিকে গুরুত্ব দেয়ার নীতি নিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। তবে এই লক্ষ্যের পুরোটা সৌরশক্তির জন্য নয়; এতে সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন উৎস রয়েছে। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ স্রেডা-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২০৪১ সময়ের জন্য জাতীয় সৌরশক্তি রোডম্যাপও তৈরি হয়েছে। তবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশ্বের কয়েকটি দেশের সাফল্য বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে। ২০২৪ সালে চিলির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ২২ শতাংশ এসেছিল সৌরশক্তি থেকে। হাঙ্গেরিতে জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সৌরবিদ্যুতের অবদান ছিল প্রায় এক-চতুর্থাংশ। অর্থাৎ দেশগুলো সৌরশক্তিকে শুধু সহায়ক উৎস হিসেবে রাখেনি, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য অংশে পরিণত করেছে।

চীনের সাফল্য আবার অন্য জায়গায়। দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎ বাজার। ২০২৪ সালেই চীন ২৭৭ গিগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করেছে। একই বছর দেশটিতে বড় আকারের সৌরবিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় নেমে আসে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় ৩ দশমিক ৩ সেন্টে, যেখানে বৈশ্বিক গড় ছিল ৪ দশমিক ৩ সেন্ট। ব্যাপক উৎপাদন, নিজস্ব সরবরাহব্যবস্থা ও বড় বাজার চীনকে এই সুবিধা দিয়েছে।

পরিবেশ সুরক্ষার দিক থেকেও সৌরশক্তির গুরুত্ব বাড়ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে, ২০২৫ সালে শুধু সৌরবিদ্যুতের বিস্তার বিশ্বে বছরে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ এড়াতে সহায়তা করেছে। এর প্রায় অর্ধেক অবদান ছিল চীনের।

খরচের হিসাবও সৌরশক্তির পক্ষে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বৈশ্বিক গড় উৎপাদন ব্যয় ছিল প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টায় ৪৪ ডলার। ২০২৬ সালের ল্যাজার্ড বিশ্লেষণেও নতুন বড় সৌরবিদ্যুতের গড় ব্যয় পারমাণবিক বিদ্যুতের তুলনায় অনেক কম দেখানো হয়েছে। তাদের হিসাবে সৌরবিদ্যুতের ব্যয় প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় ৩৮-৭৮ ডলার, বিপরীতে নতুন পারমাণবিক বিদ্যুতের প্রায় ১৪১-২২০ ডলার। অর্থাৎ পরিসরের গড় ধরে সৌরবিদ্যুৎ নতুন পারমাণবিক বিদ্যুতের তুলনায় প্রায় তিন গুণ সস্তা হতে পারে। তবে সৌরবিদ্যুতের অনিয়মিত উৎপাদন সামাল দিতে ব্যাটারি ও গ্রিডে অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন। সেই খরচ আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য সৌরশক্তির বড় সম্ভাবনার স্থান হচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনার ছাদ। স্রেডা বলছে, বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে প্রতি মেগাওয়াটের জন্য তিন একরের বেশি অকৃষি জমি প্রয়োজন হওয়ায় ভূমিসংকট একটি বড় বাধা। তাই বাড়ি, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য স্থাপনার ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

এই সম্ভাবনার অর্থনৈতিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি অর্থনীতি ও আর্থিক বিশ্লেষণ ইনস্টিটিউট আইইইএফএ-র বিশ্লেষক শফিকুল আলমের নেতৃত্বে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, নতুন করে ২ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা গেলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বছরে ৫২ দশমিক ৩ থেকে ১১০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। তার মতে, শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বাড়াতে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানোর মতো বাজারব্যবস্থা তৈরি করা দরকার।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও আগ্রহের কথা এসেছে। ২০২৪ সালের মার্চে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, সরকার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে অনুমোদিত লোডের ৭০ শতাংশ সীমা তুলে দেয়ার কথা ভাবছে। একই সঙ্গে করপোরেট পর্যায়ে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি নিয়েও কাজ করার কথা জানান তিনি। পরে তিনি বলেন, কৃষিজমিতে চাপ না বাড়িয়ে নবায়নযোগ্য শক্তি সম্প্রসারণে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ পথ।

সৌরশক্তি দিয়ে কোনো দেশের অর্ধেক বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো কি সম্ভব: প্রযুক্তিগতভাবে সৌরনির্ভরতার মাত্রা অনেক বাড়ানো সম্ভব হলেও বর্তমানে কোনো দেশের বার্ষিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অর্ধেক সৌরশক্তি থেকে এসেছে, এমন উদাহরণ নেই। কারণ সূর্য সব সময় আলো দেয় না। তাই বড় পরিসরে সৌরশক্তি নিতে হলে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ, শক্তিশালী গ্রিড এবং অন্যান্য উৎসের সমন্বয় প্রয়োজন।

বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা অবশ্য দেখাচ্ছে, সৌরশক্তি আর প্রান্তিক কোনো উৎস নয়। ২০২৪ সালে সৌরবিদ্যুৎ বিশ্বে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৬ দশমিক ৯ শতাংশ জুগিয়েছে।

বাংলাদেশের সামনে তাই প্রশ্ন শুধু কত মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানো যাবে, তা নয়। গ্যাস, কয়লা, তেল ও পারমাণবিক বিদ্যুতের পাশাপাশি সৌরশক্তিকে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি করার মতো জমি, গ্রিড, বিনিয়োগ ও সংরক্ষণব্যবস্থা কি বাংলাদেশ তৈরি করতে পারবে?

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন