ওয়াকআউট থেকে ফিরে আবারও বিরোধীদলের ওয়াকআউট
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১০ পিএম
জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক ও নীতিগত বিরোধিতার ঘটনা ঘটেছে। বিরোধী শিবিরের তীব্র বিরোধীতার পর বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয় সংসদে।
প্রস্তাবিত বিলটিতে সন্তানের নামে জমি বা সম্পত্তি নিবন্ধনের পর বাবা-মায়ের আজীবন ভোগদখল ও নিরাপত্তার বিধান রাখার কথা বলা হলেও বিরোধী ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা দাবি করেছেন, এটি বিদ্যমান মুসলিম পারিবারিক আইন, শরীয়তের ফারায়েজ, হেবা ও উত্তরাধিকার বিধির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে, আইনমন্ত্রী ও বিলের সমর্থক সদস্যরা বলছেন, এটি কেবল সাধারণ হস্তান্তরের একটি নতুন পদ্ধতি এবং এতে হেবা বা শরীয়া আইনের কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন হবে না।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য দাবি জানালেও সংসদে বিলটি পাস হয়। এর আগে বিরোধীদের জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে গেলে কয়েক মিনিটের জন্য ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
বিলটি নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনার সূচনা করে পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নজিবুর রহমান মোমেন বলেন, এই আইনটি কোরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট বিরোধী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পূর্ববর্তী অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ইসলামিক বিশেষজ্ঞদের মতে আজীবন ভোগদখলের বিধান রেখে দানের ব্যবস্থা শরীয়তের পরিপন্থি। এতে করে আল্লাহর নির্ধারিত মিরাসি বিধানকে বাইপাস করার সুযোগ তৈরি হবে, যা ১৯৩৭ সালের মুসলিম পার্সোনাল ল (শরীয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্টের মূলনীতির সঙ্গে মেলে না। সামাজিক সমস্যার সমাধানে বাবা-মায়ের নিরাপত্তা জরুরি হলেও ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনের মাধ্যমেই তার সুরাহা সম্ভব, ইসলামী পারিবারিক আইন পাশ কাটিয়ে নয়।
তবে বিলের প্রশংসা ও সমর্থন জানিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, সন্তানের হাতে বাবা-মায়ের নিগৃহীত হওয়া এবং বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। তবে বিলে কিছু সংশোধনী আনার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, সন্তানরা যাতে বাবা-মাকে অবহেলা করলে দাতা এককভাবে দলিল বাতিলের আবেদন করতে পারেন সেই সুযোগ রাখা দরকার। পাশাপাশি লিখিত সম্পত্তি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া বা তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তরের সুযোগ বন্ধ করা এবং পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে দ্রুত সামারি ট্রায়ালের বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করেন তিনি।
অনুরূপভাবে বিলটির মানবিক দিক সমর্থন করে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল বলেন, অনেক কুলাঙ্গার সন্তান বাবা-মায়ের সমস্ত সম্পদ লিখে নিয়ে শেষ বয়সে তাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়। বাবা-মায়ের শেষ জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনটিকে আরও শক্ত ও যুগোপযোগী করার পাশাপাশি অতি দ্রুত যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে, বিলটিকে শরীয়তের ওপর কৌশলী আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করেন ময়মনসিংহ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুল হাসান। তিনি বলেন, ১৮৮২ সালের পুরানো আইন সংশোধনের নামে মানবাধিকার ও সমতার কথা বলে মুসলিম পারিবারিক আইনে হাত দেওয়া হচ্ছে। গুটি কয়েক সন্তানের অপকর্মের জন্য মূল ইসলামী চেতনা সংক্রান্ত আইনি কাঠামোতে হাত দেওয়া অনুচিত। এটি নিয়ে দেশের ইসলামিক স্কলারদের ঘোর আপত্তি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বিলটি বিস্তারিত পর্যালোচনা ও জনমত যাচাইয়ের দাবি জানান।
একই সুর মিলিয়ে বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল আলিম বলেন, আবেগের বশে বা ইমোশনাল ব্ল্যাকমেলের শিকার হয়ে বাবা-মা যেভাবে সর্বস্ব দান করে নিঃস্ব হন, তার সমাধানের জন্য ইসলামী নীতির এক-তৃতীয়াংশের বেশি দান না করার বাধ্যবাধকতার রাষ্ট্রীয় প্রয়োগ প্রয়োজন ছিল। এই বিলটি ইসলামী বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় তিনি ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবরের মধ্যে বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তাব করেন।
শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও অনেক সংসদ সদস্য ভেতরে ভেতরে এই বিলের বিষয়ে চিন্তিত। ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী হেবা সম্পূর্ণ হতে সম্পত্তির বাস্তব দখল বা 'কব্জা' হস্তান্তর জরুরি। কিন্তু কাগজে মালিকানা দিয়ে বাস্তবে দখল নিজের কাছে রেখে মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার বিধান মূলত হেবার সংজ্ঞা বদলে দেয় এবং উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করার পথ খুলে দেয়। এ কারণে এই কাঠামোগত পরিবর্তন জনমতের জন্য উন্মুক্ত করা আবশ্যক।
একইভাবে পাবনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী আজগার বলেন, প্রস্তাবিত এই সংশোধনটি শরীয়তের মিরাজ, ফারায়েজ ও ওসিয়ত সংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। তাই ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও আলেম-ওলামাদের সমন্বয়ে মতামত গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তিনিও আগামী ২০ অক্টোবরের মধ্যে বিলটির ওপর জনমত যাচাইয়ের তাগিদ দেন।
চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামও আইনটির মানবিক দিক ও ধর্মীয় মূলনীতির ভারসাম্যের ওপর জোর দিয়ে বলেন, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের এই সময়ে তড়িঘড়ি না করে ফিকহ শাস্ত্রবিদদের মতামত নেওয়া উচিত, যাতে ইসলামী নীতি ক্ষুণ্ন না হয়। তিনিও ২০ অক্টোবরের মধ্যে সময় বেঁধে দিয়ে জনমত যাচাইয়ের পক্ষে মত প্রকাশ করেন।
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাসুদ পারভেজ আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, কতিপয় বিপথগামী সন্তানের অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করা এবং বিদ্যমান ভরণপোষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ করাই যথেষ্ট ছিল। মূল পারিবারিক ও ধর্মীয় আইনি ভিত্তি পরিবর্তন করলে সাধারণ মানুষ আইনি জটিলতা ও নিগ্রহের শিকার হবে। সর্বসাধারণকে সচেতন করতেই আইনটি পাসের আগে জনমত যাচাই করা জরুরি।
পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, কোরআন-সুন্নাহর বিধানকে পাশ কাটিয়ে কোনো আইন করলে তা জনমনে বিভ্রান্তি ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করবে। এটিকে রাজনৈতিকভাবে না দেখে ফতোয়া বোর্ড ও ওলামায়ে কেরামের পরামর্শের জন্য পাঠানো উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিতর্কের পর সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ও ঢাকা-১৫ আসনের সংসদ সদস্য ড. মো. শফিকুর রহমান বলেন, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আইনটি আনার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও এর প্রয়োগ ধর্মীয় বিশ্বাস ও সুরা নিসার মিরাস সংক্রান্ত নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ইসলামে হেবা বা উইলের শর্ত হলো গ্রহীতা সঙ্গে সঙ্গেই তার মালিকানা ও ভোগদখল লাভ করবেন। আবার ওসিয়তের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি এবং রক্তসম্পর্কীয় ওয়ারিশদের বাইরে দেওয়ায় বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বর্তমান বিলে এসব নীতি না থাকায় এটি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে ও প্রকৃত হকদারের হক বিনষ্ট করবে। তাই তিনি বিলটি এই অধিবেশনে পাস না করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও শরীয়া বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্থায়ী কমিটিতে পুনঃপরীক্ষার জন্য পাঠানোর তাগিদ দেন।
সকল বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। প্রস্তাবিত বিলের ১২২অ ধারার সাব-সেকশন ৪ উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট করেন, এই ট্রান্সফারটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বা স্বতন্ত্র মোড হিসেবে গণ্য হবে। এটি বিদ্যমান হেবা, সাধারণ দান বা শরীয়াহ ল’ এর মাধ্যমে অন্য যেকোনো উপায়ে হস্তান্তরিত দলিলের কার্যকারিতাকে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন, সীমিত বা প্রভাবিত করবে না।
আইনমন্ত্রী আরও জানান, সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে সেল, মর্গেজ, লিজ, এক্সচেঞ্জ ও গিফট এই পাঁচ ধরনের হস্তান্তরের সুযোগ রয়েছে। বর্তমান বিলে সাধারণ গিফটের কথা বলা হয়েছে, যা হেবা থেকে আলাদা; ফলে হেবা বা উত্তরাধিকার আইন সর্বদা ইসলামী শরীয়াহ অনুসারেই পরিচালিত হবে।



