মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর: ৩৬ প্রাণের স্মৃতিতে আজও শোকের ছায়া
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ১০:২৭ এএম
আজ ২১ জুলাই, উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রথম বর্ষপূর্তি। গত বছরের এই দিনে দুপুরে মুহূর্তেই হাসিমুখর ক্যাম্পাস পরিণত হয়েছিল মৃত্যু, আগুন আর আর্তনাদের জনপদে। বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানটি ভেঙে পড়লে পাইলট, একজন শিক্ষিকা ও ২৮ কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৬ জন প্রাণ হারান। ঘটনার পর পুরো দেশে নেমে আসে শোকের ছায়া।
দগ্ধ ও আহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের দ্রুত রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়; গুরুতর আহতদের চিকিৎসা চলে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। দীর্ঘ জটিল চিকিৎসা শেষে অনেকে বাড়ি ফিরলেও তাদের শরীরে পোড়া ক্ষতের স্থায়ী দাগ এবং মনে সেই ত্রাসের স্মৃতি আজও অম্লান।
দুর্ঘটনার পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার নয় সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করে, যাকে দুর্ঘটনার কারণ, দায়দায়িত্ব ও প্রতিরোধে করণীয় নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রায় তিন মাস পর ১৫০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও ১৬৮টি তথ্য উদঘাটনের ভিত্তিতে ৩৩টি সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, উড্ডয়নজনিত ত্রুটির কারণে পরিস্থিতি পাইলটের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। জননিরাপত্তায় বিমানবাহিনীর সব প্রাথমিক উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়, পাশাপাশি বরিশাল ও বগুড়ার বিমানঘাঁটির রানওয়ে সম্প্রসারণের তাগিদ দেওয়া হয়।
তদন্তে আরও উঠে আসে, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি রাজউকের বিল্ডিং কোড মানা হয়নি—নিয়ম অনুযায়ী অন্তত তিনটি সিঁড়ি থাকার কথা থাকলেও ছিল মাত্র একটি। পর্যাপ্ত সিঁড়ি থাকলে হতাহতের সংখ্যা অনেক কম হতে পারত বলে পর্যবেক্ষণ দেয় কমিটি।
এই ট্র্যাজেডিতে আলোচনায় আসেন সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাভিদ নাওয়াজ দীপ্ত, যার শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। ৯৭ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় তার ৩৬টি অস্ত্রোপচার এবং আটবার স্কিন গ্রাফটিং করতে হয়। চিকিৎসকেরা জানান, কয়েক দফায় তার জীবন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা—এ যেন এই বিভীষিকার মধ্যেও আশার প্রদীপ। অন্যদিকে, আগুনে কিছু মরদেহ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে প্রথমে পরিচয় শনাক্ত সম্ভব হয়নি; পরে সিআইডি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পাঁচজনের পরিচয় নিশ্চিত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এক বছর পেরিয়েও নিহতদের পরিবার ও আহত শিক্ষার্থীদের কাছে ২১ জুলাই এখনো বিভীষিকার দিন। অনেকে শারীরিকভাবে সুস্থ হলেও মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেননি; অনেক পরিবার আজও হারানো সন্তান বা স্বজনের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে।
দুর্ঘটনার প্রথম বর্ষপূর্তিতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ দুই দিনের কর্মসূচি নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলম জানান, গতকাল সোমবার (২০ জুলাই) দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসসহ সব শাখায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সমাহিত নিহতদের কবর জিয়ারত করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। আজ মঙ্গলবার ট্র্যাজেডির দিনটিতে সব শাখায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। উত্তরার দিয়াবাড়ি দুর্ঘটনাস্থল ক্যাম্পাসে সকাল ১০টা ও বিকেল ৩টায়—দুই পর্বে—আয়োজিত হবে সশ্রদ্ধ সালাম, এক মিনিট নীরবতা ও দোয়া মাহফিল, যেখানে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অংশ নেবেন।



