ছবি: (বাম থেকে) জুবায়ের বিন হায়দার, মাহাবুবুল হক চৌধুরী, আশ্রাফুল হক
দেশের জেলা হাসপাতালগুলোকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও সংস্কার প্রকল্পে গণপূর্ত কাঠের কারখানা বিভাগ যেসব কাজ বাস্তবায়ন করছে তার টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। পিপিআরের নির্ধারিত শর্তগুলো উপেক্ষা করে নামকাওয়াস্তে প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়েছে। আর সেই কাজ না করেই বিল প্রদানের পায়তারা চলছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ কাজের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই পাওয়া অর্থ ভাগ-বাটোয়ারায় নেমেছে এর দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী জুবায়ের বিন হায়দার, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহাবুবুল হক চৌধুরী এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ইএম-জোন) আশ্রাফুল হক আশরাফ। এই টেন্ডার পাস করায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নামেও রাখা হচ্ছে বাটোয়ারার অংশ।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে ইতিমধ্যেই অবহিত হয়েছেন এর দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। প্রথমে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ও ইএম-এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে মন্ত্রণালয়ে তলব করে এর ব্যাখ্যা চেয়েছেন। পরে জাতীয় সংসদ ভবনে তাঁর কার্যালয়ে এ নিয়ে আবার ব্যাখ্যার জন্য ডেকেছিলেন মন্ত্রী। সেখানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহাবুবুল হক চৌধুরী মন্ত্রীকে জানিয়েছেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কোন অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়নি। টেকনিক্যাল জ্ঞান না থাকায় প্রকৌশলীদের এই ব্যাখ্যাই তিনি মেনে নিয়েছেন। অথচ টেন্ডার প্রক্রিয়ায় পরতে পরতে প্রকাশ্য দিবালোকের মতো দুর্নীতির ছাপ স্পষ্ট।
সম্প্রতি দেশের জেলা হাসপাতালগুলোকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও সংস্কার প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করে গণপূর্তের ই/এম কাঠের কারখানা বিভাগ। গত ৮ জুন পর্যন্ত আহ্বান করা মোট ১২টি দরপত্রের ৮টিতেই সর্বনিম্ন দরদাতা হয় দেশের সবচেয়ে নামকরা ফার্নিচার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘হাতিল ফার্নিচার’। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি এর মধ্য থেকে মাত্র ১টি কাজের কার্যাদেশ দিলেও বাকি ৭টি কাজের আদেশ ঝুলিয়ে রাখে মুলত গণপূর্তের প্রকৌশলী ত্রয়ের অতিরিক্ত অর্থ দাবির আবদার মেটাতে না পারায়।
এই বিষয়ে ন্যায়সঙ্গত: আচরণ পেতে হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. রেজাউল করিম গত ৮ জুন গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রকৌশলী (ই/এম) জোন আশ্রাফুল হকের কাছে আবেদন করেন। সেখানে তিনি জেলা হাসপাতালগুলোকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও সংস্কার প্রকল্পের পরিচালক থেকে শুরু করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। অভিযোগ করেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের কাছেও। মন্ত্রী বিষয়টি আমলে নিয়ে গণপূর্তের প্রকৌশলীদের তলব করলেও প্রকৌশলীরা মন্ত্রীকে ‘ভুল’ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আর তাতেই সন্তষ্ট হয়েছেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের নিজ জেলা কুমিল্লার টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেন এই প্রকৌশলীরা। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মহিলা ছাত্রাবাস ভবন নির্মাণ (টেন্ডার আইডি- ১২৭৪৩৮২) কেন্দ্রে আসবাবপত্র সরবরাহ কাজের টেণ্ডারে কমপক্ষে ৯টি অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এই কাজের দরপত্র খোলার দশদিন পূর্বেই অর্থাৎ সরকারি ছুটির মধ্যেই ২৮ মে ২০২৬ সকাল ১০ টায় সিডিউল বিক্রয় বন্ধ করে দেয়া হয়। কার্যত: ২৮ মে ছিল ঈদ উল আযহা উপলক্ষ্যে সরকারি ছুটির দিন। টেন্ডার সিডিউল ক্রয় ও সিকিউরিটি জমাদানের শেষ সময় রাখা হয়েছে সরকারি ছুটির মধ্যে এবং ওপেনিং রাখা হয়েছে ৭ জুন ২০২৬। সিডিউল বিক্রয় নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে পিপিআর ২০২৫ এর ১১৪ (৯), ১১৫(৫) ধারা লংঘনের মাধ্যমে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, সমঅংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতার মৌলিক নীতি ক্ষুন্ন করা হয়েছে। এখানে মূলত দূর্নীতির উদ্দেশ্যে এবং বিশেষ কাউকে সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যেই এ কাজ করা হয়েছে।
এই দরপত্রে সংশোধনী আনা হলেও বিপিপিএ, গণপূর্ত কিংবা কোন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়নি যা পিপিআর ২০২৫ এর বিরোধী। সাধারণত ৩ থেকে ৫ বছর কাজের অভিজ্ঞতা রাখার প্রচলিত নিয়ম রয়েছে। এই দরপত্রে ৫ বছরের জন্য সাধারণ অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে। একক কাজের অভিজ্ঞতা সাধারণত সরকারি/বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানেই একই ধরনের এবং সমমানের অর্থাৎ ৩ বছরের মধ্যে হাসপাতালে সরবরাহকৃত আসবাবপত্রের সরবরাহের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়।
বর্ণিত দরপত্রের শর্তে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের ফ্যাক্টরি থাকা আবশ্যক। লীজ বা হায়ার করা কোন ফ্যাক্টরি গ্রহণযোগ্য নয় মর্মে শর্তারোপ করা হয়েছে। আবার বলা হয়েছে- নিজস্ব উৎপাদন কারখানা, হিট-ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, সিজনিং-ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং ল্যাকার প্ল্যান্ট রয়েছে-এ মর্মে অনুমোদিত কোনো তৃতীয় পক্ষের সনদ বা প্রত্যয়নপত্র থাকতে হবে। এই তৃতীয় পক্ষ কে বা কারা সেটা উল্লেখ নেই। এসব শর্ত দিয়ে দরপত্রে অংশগ্রহণ সীমিত করা হয়েছে। তৃতীয় পক্ষ বলতে কি বুঝানো হয়েছে তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
দরপত্র শর্তে উল্লেখ আছে- দরপত্রদাতার নিজস্ব কারখানায় একটি স্বয়ংক্রিয় সমন্বিত ইউভি ল্যাকার লাইন সিস্টেম থাকতে হবে। যার মাধ্যমে আসবাবপত্রের উপর টেকসই ও পানি-প্রতিরোধী ফিনিশিং সারফেস প্রদান করা যায়। উক্ত সিস্টেমটি বাংলাদেশের যে কোনো সরকারি সংস্থা কর্তৃক প্রত্যয়িত হতে হবে এবং এর সাথে যে কোনো অনুমোদিত সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত টোটাল ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড পরীক্ষার প্রতিবেদনও দাখিল করতে হবে। উক্ত শর্ত দিয়ে দরপত্র প্র্র্রক্রিয়া সংকুচিত করা হয়েছে। কারণ হাতে গোনা ২/১ টি কোম্পানি ছাড়া এই সিস্টেম বাংলাদেশের আর কোথাও নেই। ফলে নামী দামী ব্রান্ডের আসবাবপত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান উক্ত দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। অপরদিকে বিশেষ পছন্দের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহণের পর উক্ত শর্তকে শিথিল দেখিয়ে সেই প্রতিষ্ঠানের নামে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে যা পিপিআর ২০২৫-এর বিরোধী।
বিভিন্ন শর্ত প্রয়োগের মধ্যে একটি শর্ত হচ্ছে, নির্ধারিত ফরম্যাটে ম্যানুফ্যাকচারিং অথরাইজেশন থাকা লাগবে। এই শর্তের প্রয়োজন হয় যদি অন্য কারো থেকে মালামাল সংগ্রহের প্লান থাকে। যদি বিদেশ থেকে কোন মালামাল আনয়ন করা হয় সেক্ষেত্রে আইআরসি (ইম্পোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট) এর প্রয়োজন হয়। যদি নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে মালামাল প্রস্তুত করা হয় সেক্ষেত্রে এই শর্তের প্রয়োজন নেই। অন্য কোন পক্ষ যদি বাইরে থেকে মালামাল এনে দেয় তাহলে সেই পক্ষের অথরাইজেশন/ ডিলারশীপ/ আইআরসি (ইম্পোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট) এর প্রয়োজন হয়। এখানেও শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। আইআরসি (ইম্পোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট) সনদ ছাড়া কিভাবে একটি মালামাল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয় তা তদন্তযোগ্য বিষয়। যার নামে কার্যাদেশ ইস্যু হয়েছে সেই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আদৌ সরাসরি বিদেশ থেকে মালামাল আমদানী করেছে কিনা তা-ও যাচাই প্রয়োজন।
সাধারণভাবে ইজিপি দরপত্রে দরপত্র জমা দেওয়ার কাগজপত্র ম্যানুয়ালি নেওয়ার বিধান নেই। ইজিপি পদ্ধতিতে টেন্ডার ডকুমেন্ট, টেন্ডার সিকিউরিটি, টেন্ডার সাবমিশন, ওপেনিং ও মূল্যায়ন সবকিছুই সিস্টেমের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু উক্ত দরপত্রে ম্যানুয়ালিও দরপত্রে জমাকৃত তথ্যাদি সরবরাহের জন্য বলা আছে। যা পিপিআর অনুযায়ী অবৈধ। ইজিপিতে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট থাকলেও ম্যানুয়ালি অপছন্দের কোম্পানির কাগজপত্র সরিয়ে ফেলার সুযোগ রয়েছে। এমনই একটি ফাঁদে ফেলে হাতিল, আক্তারসহ বড় প্রতিষ্ঠানের দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়ার পরেও কাজ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
কাঠের কারখানা বিভাগ-১ ও কাঠের কারখানা বিভাগ-২ এর দরপত্রে অংশ নেয়ার শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠানগুলোর যান্ত্রিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্ট, সিজনিং প্ল্যান্ট এবং ল্যাকার প্ল্যান্টসহ কাঠ ও ইস্পাতের আসবাবপত্র উৎপাদন কারখানা থাকা বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে দরপত্রে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে হাতিল ফার্ণিচার লিমিটেড ও আক্তার ফার্ণিচার্স লিমিটেডের এই সুবিধা রয়েছে। তবে এমন প্ল্যান্ট নেই এ রকম ৭টি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল আর্থিক সুবিধা নিয়ে কাজ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-ফার্ণিচার কনসেপ্ট লিমিটেড, পশ ফার্ণিচার, ডট ফার্ণিচার, নাদিয়া ফার্ণিচার লিমিটেড, আরএফএল ফার্ণিচার, অথেনটিক ফার্ণিচার ও আকিদ এন্টারপ্রাইজ।
এছাড়া তিনটি দরপত্র (আইডি নং-১২৮১৯২১, ১২৮১৭৫০ ও ১২৮১৭৪৯) ২৪ মে ২০২৬ আহবান করে দরপত্র খোলা হয়েছে ৮ জুন ২০২৬। বাস্তবে ২৫ মে-৩১ মে সরকারি ঈদের ছুটি ছিল। সে হিসাবে দরপত্র লাইভে ১৪ দিন থাকলেও এর মধ্যে সরকারি ছুটি ছিল ৮ দিন। একই দিনে সিডিউল ক্রয়, একই দিনে নিরাপত্তা জামানাত জমা, একই দিনে দরপত্র খোলার মাধ্যমে পিপিআর-২০২৫, ১১৪ (৯), ১১৫(৫) ধারা লংঘনের মাধ্যমে সিডিউল ক্রয় করতে দেওয়া হয়নি।এছাড়া ১২৮২৪২৮, ১২৮২৪২৯, ১২৮২৪৩০ ও ১২৮৪৫১৫ নম্বর দরপত্র ২৪ মে ২০২৬ তারিখে দরপত্র আহবান করে দরপত্র খোলা হয়েছে হয়েছে ৪ জুন ২০২৬। বাস্তবে ২৫ মে-৩১ মে সরকারি ঈদের ছুটি ছিল। সে হিসাবে দরপত্র লাইভে ১০ দিন থাকলেও এর মধ্যে সরকারি ছুটি ছিল ৮দিন। একই দিনে সিডিউল ক্রয়, একই দিনে নিরাপত্তা জামানাত জমা, একই দিনে দরপত্র খোলা হয়েছে। পিপিআর-২০২৫, ১১৪ (৯), ১১৫(৫) ধারা লংঘনের মাধ্যমে সিডিউল ক্রয়ের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।
এছাড়া তিনটি দরপত্র (আইডি নং-১২৭২৮৫৫, ১২৭২৮৫৬, ১২৭২৮৫৮) ১০ মে ২০২৬ তারিখে আহবান করে খোলা হয়েছে ২ জুন ২০২৬। বাস্তবে ২৫ মে-৩১ মে সরকারি ঈদের ছুটি ছিল। সে হিসাবে দরপত্র লাইভে ২২ দিন থাকলেও এর মধ্যে সরকারি ছুটি ছিল ১১ দিন। একই দিনে সিডিউল ক্রয়, একই দিনে নিরাপত্তা জামানাত জমা, একই দিনে দরপত্র খোলা হয়েছে। পিপিআর-২০২৫, ১১৪ (৯), ১১৫(৫) ধারা লংঘনের মাধ্যমে সিডিউল ক্রয় সীমিত করা হয়েছে।
গত ২ জুন ২০২৬ আরো তিনটি (আইডি নং- ১২৮৪২৩৬, ১২৮৪২৩৫, ১২৮৪২৩২, ১২৮৪২৩৩) দরপত্র আহবান করে দরপত্র খোলা হয় ১৬ জুন। একই দিনে সিডিউল ক্রয়, একই দিনে নিরাপত্তা জামানাত জমা, একই দিনে দরপত্র খোলার মাধ্যমে মানা হয়নি পিপিআর-২০২৫, ১১৪ (৯), ১১৫(৫) ধারা। আরো তিনটি দরপত্রে (আইডি নং-১২৭২৮৫৯, ১২৭২৭৫২, ১২৭২৮৪৪) একই দিনে সিডিউল ক্রয়, একই দিনে নিরাপত্তা জামানাত জমা, একই দিনে দরপত্র খোলা হয়েছে।
এছাড়া ৭টি দরপত্রে (আইডি নং- ১২৫৬৯৪৭, ১২৫৬৯৪৮, ১২৫৬৯৪৯, ১২৫৬৯৪৬, ১২৫৬৯৪৪, ১২৫৬৯৪৩, ১২৫৬৯৪১) সংশোধনী আনা হয়েছে কিন্তু বিপিপিএ, গণপূর্ত কিংবা কোন জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি যা পিপিআর ২০২৫ এর বিরোধী।
জীবনের শেষ সুযোগ: আগামী আগস্ট মাসে অবসরে যাবেন গণপূর্ত ইএম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আশ্রাফুল হক আশ্রাফ। স্বাস্থ্যখাতের ৩০০ কোটি টাকার ফার্নিচার সরবরাহের এই টেন্ডার তাঁর অবসর জীবনের আগে একটি বড় আয়ের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। এ কারনেই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কমপক্ষে ৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তিনি। একইভাবে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহাবুবুল হক চৌধুরী আগামী ডিসেম্বরে অবসরে যাবেন। তিনিও একই প্রক্রিয়ায় সমান পরিমান অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।
পিজা শামীমের ছেলে নির্বাহী প্রকৌশলী: নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান আলী হায়দার শামীম ওরফে পিজা শামীমের ছেলে জুবায়ের বিন হায়দার বর্তমানে জাতীয় সংসদের অভ্যন্তরে কাঠের কারখানা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। যার দায়িত্ব হচ্ছে জাতীয় সংসদের প্লেনারি হলের ভেতরের আসবাবপত্রসহ সকল আসবাপত্র সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ। দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে যেখানে এসআইএস-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী জাহিদুর রহিম জোয়ার্দার দাবি করেছেন, টেবিল চাপড়ানোর ফলে কানেকশন লুজ হওয়ার কারনে সাউন্ড সিস্টেমে সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেই টেবিলের দায়িত্বটিও পিজা শামীমের ছেলের হাতে।
গণপূর্তের কাঠের কারখানার দায়িত্ব এতোটা স্পর্শকাতর যে, সংসদ ভবনের মূল অধিবেশন কক্ষ বা প্লেনারি হলের সবচে’ সেনসেটিভ স্থাপনাও তার নিয়ন্ত্রণাধীন। আওয়ামী লীগ আমলে ৩০তম বিসিএসএ চাকরি পাওয়া জুবায়ের বিন হায়দার আওয়ামী লীগ আমলে নারায়ণগঞ্জের গণপূর্তের ইএম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন। নিজেই সকল ঠিকাদারী কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন। যেখানে নিজেই ছিলেন প্রকৌশলী ও নিজেই ঠিকাদার। নারায়ণগঞ্জের নাসিম ওসমান, সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমানের মটর সাইকেল বাহিনীর প্রধান পিজা শামীমের ছেলে যেকোন মুহুর্তে জাতীয় সংসদের অভ্যন্তরে বড় ধরনের নাশকতা করতে সক্ষম।
এমন কট্টর আওয়ামী লীগ ব্যাকগ্রাউন্ড এবং চিহ্নিত পলাতক সন্ত্রাসীর ছেলেকে সংসদ ভবনে পোস্টিং দেওয়ার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেন গণপূর্তের চলতি দায়িত্বের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী। গত ২৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তর জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় উগ্রবাদীদের হামলার শঙ্কা নিয়ে সারাদেশে সতর্কতা জারি করেছে। সেখানে পলাতক সন্ত্রাসী পিজা শামীমের ছেলে জুবায়ের বিন হায়দারের পোস্টিং থাকা নিয়ে শঙ্কা আরো জোরদার হয়েছে।
অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে এক প্রভাবশালী জামায়াত নেতার জোর সুপারিশে এবং বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কুয়েটের ছাত্র হওয়ায় জুবায়েরের প্রতি দুর্বলতা ও ‘কুয়েট কোরামে’র কারনে জাতীয় সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সন্ত্রাসী পিজা শামীমের ছেলেকে পোস্টিং দেয়া হয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসার পর জামায়াতের পরিচিতি ছাড়িয়ে নানা কৌশলে সংসদ ভবনের পোস্টিং টিকিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা করছেন এই জুবায়ের বিন হায়দার। একই সঙ্গে সংসদের জামায়াতের অফিসারসহ কিছু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে চলার চেষ্টা করছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে নগদ অর্থের লেনদেনও করছেন সন্ত্রাসী আলী হায়দার শামীম ওরফে পিজা শামীমের ছেলে জুবায়ের বিন হায়দার।
কে এই পিজা শামীম
'পিজা শামীমে’র আসল নাম আলী হায়দার শামীম। নারায়ণগঞ্জের একজন বিতর্কিত ব্যক্তি, যাকে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং পুলিশ প্রায়ই 'সন্ত্রাসী' হিসেবে অভিহিত করেছে। তিনি মূলত নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, বিশেষ করে আজমেরী ওসমানের 'ক্যাডার' বা প্রধান সহযোগী হিসেবে পরিচিত। ২০২৩ সালের ১৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের বন্দরে জমি দখলের চেষ্টায় গুলিবর্ষণের একটি ঘটনা ঘটে, যেখানে একজন গুলিবিদ্ধসহ ১০ জন আহত হয়। এই ঘটনার পর পুলিশ শহরের মাসদাইর এলাকা থেকে পিজা শামীমকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে।
তাকে একটি সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান হিসেবে গণ্য করা হয়, যারা জমি দখল, চাঁদাবাজি এবং এলাকায় দাপট দেখানোর মতো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি জাতীয় পার্টির রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন এবং আজমেরী ওসমানের প্রয়াত নাসিম ওসমানের ছেলে ডান হাত হিসেবে কাজ করতেন। তার এই অদ্ভুত 'পিজা শামীম' নামটির পেছনে সম্ভবত পিজা ব্যবসার সাথে কোনো পুরনো সম্পৃক্ততা ছিল, তবে বর্তমানে তিনি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণেই বেশি পরিচিত যিনি জুয়ার আসরও চালাতো।
অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের স্ত্রীর নামে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান করে প্রায় শত কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয়ায় গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। তাকে লঘুদণ্ড দিয়েছে মন্ত্রণালয়। কিন্তু এই অনিয়মে সহযোগিতাকারী নির্বাহী প্রকৌশলী জুবায়ের বিন হায়দারকে প্রাইজ পোস্টিং দিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। বলা হচ্ছে, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে থাকা খালেকুজ্জামান কুয়েটের ছাত্র হিসেবে একটি ‘কুয়েট কোরাম’ চালু করেছেন। কুয়েটে পড়া সকলেই তার কাছে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন। জুবায়ের বিন হায়দার কুয়েটের ছাত্র হওয়ায় ‘ইউনিভার্সিটির ছোট ভাই’কে ঊর্ধ্বতন সকল কর্মকর্তার মতামত উপেক্ষা করে গণপূর্ত কাঠের কারখানা বিভাগে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ দিয়েছেন। অথচ তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ মন্ত্রণালয়ের তদন্তনাধীন রয়েছে।
`কুয়েট কোরাম’ না ‘নাশকতার’ প্রস্তুতি?
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম আতিকের বিরুদ্ধে নিজ স্ত্রী কানিজ মুস্তারিন ও বন্ধু জাহিদুর রহমানের যৌথনামে ‘এ্যাড্রয়েট কনসালটেন্টস এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স’ নামে ঠিকাদারী লাইসেন্স করে যে ১৬৭টি কাজ বাগিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে সেই কাজগুলোর মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ ২৩টি কাজ দিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী জুবায়ের বিন হায়দার। গণপূর্ত ইএম বিভাগের নারায়ণগঞ্জে দায়িত্বে থাকাকালে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারনে গণপূর্ত পিএন্ডডি জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর স্টাফ হিসেবে বদলি করা হয়েছিল।
হঠাৎ করেই গত ২৮ অক্টোবর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর পদ থেকে কথিত পীর শামীম আখতারকে সরিয়ে মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে প্রথমে রুটিন দায়িত্ব এবং পরে চলতি দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সে সময়ে গণপূর্ত ইএম বিভাগের অনেকগুলো পদ বদলিযোগ্য ছিল। চতুর জুবায়ের বিন হায়দার সেই সুযোগে ‘ইউনিভার্সিটির বড় ভাই’ খালেকুজ্জামানের ‘কুয়েট কোরাম’ কাজে লাগিয়ে গণপূর্তের সবচে’ লোভনীয় কাঠের কারখানা বিভাগে পোস্টিং বাগিয়ে নেন। এ সময়ে জামায়াতের এক প্রভাবশালী নেতা জুবায়েরের জন্য জোর সুপারিশ করেন। এই বিভাগে প্রতি অর্থবছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার কাজ হয়ে থাকে। যা থেকে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার কমিশন পাওয়া যায় বলে প্রচলিত রয়েছে।
এদিকে আতিকের দুর্নীতির সঙ্গে নিজের নাম না আসার জন্য অনেক চেষ্টা তদ্বির করে সফল হয়েছে জুবায়ের বিন হায়দার। মন্ত্রণালয় আতিককে লঘুদন্ড দিলেও জুবায়ের বিন হায়দারকে কোন দণ্ড দেননি। গত ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরুর দিনে সাউন্ড সিস্টেমের বিপর্যয় হলে তা নাশকতা কি-না তদন্তের জন্য গঠিত কমিটিতে জুবায়ের বিন হায়দারকে সদস্য রাখা হয়েছে। জাতীয় সংসদের সার্জেন্ট এ্যাট আর্মস কমোডর আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিটিতে জুবায়ের বিন হায়দারের অন্তর্ভুক্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যিনি নিজেই সংসদ ভবনে নাশকতার সঙ্গে জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে তাকেই রাখা হয়েছে তদন্ত কমিটিতে। সার্জেন্ট এ্যাট আর্মস মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জুবায়ের বিন হায়দারের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক না করেই তাকে তদন্ত কমিটিতে সদস্য করেছেন না-কি তিনিও জুবায়ের বিন হায়দার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
এদিকে এনএসআই-এর পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভুইয়ার কাছে জুবায়ের বিন হায়দার সম্পর্কে রিপোর্ট করা হলেও তিনিও কোন ব্যবস্থা নেননি। এ অবস্থায় জাতীয় সংসদ ভবনে বড় ধরনের নাশকতার শঙ্কা যেখানে খোদ পুলিশ সদর দপ্তর করেছে সেখানে জুবায়েরের ভুমিকা কি হবে সে প্রশ্নই বার বার ঘুরে ফিরে আসছে।



