জ্যৈষ্ঠের প্রখর রোদ, ভ্যাপসা গরম আর কাদাপানিতে ঘেরা ফসলি জমির আইল—সেখানেই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন নারী-শিশুসহ ২১ জন। পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের ‘পুশ-ইন’ চেষ্টার পর টানা কয়েক দিন ধরে তারা অবস্থান করছেন দুই দেশের শূন্যরেখায়। এ নিয়ে সীমান্তজুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে। পতাকা বৈঠক হলেও এখনো কোনো সমাধান হয়নি।
পঞ্চগড় সীমান্তে তৃতীয় দিনের অচলাবস্থা
পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তে নারী ও শিশুসহ ১০ জন ভারতীয় নাগরিক রোববার তৃতীয় দিনের মতো খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। ধানের খেতের মাঝের সরু আইলে বসে কিংবা দাঁড়িয়ে তারা সময় পার করছেন। দুই পাশেই জমে আছে পানি।
ভারতের অভ্যন্তরে বিএসএফ সদস্যরা অস্ত্র তাক করে অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের ভেতরে বিজিবিও রয়েছে কঠোর সতর্কতায়। রোববার দুপুরে বিএসএফ আবারও ওই ১০ জনকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবি বাধা দেয়। এতে সীমান্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে স্থানীয়দের উপস্থিতিতে বিএসএফ পিছু হটে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, তিন শিশু ও দুই নারীসহ ১০ জন এখনও ভারতীয় শূন্যরেখার আবাদি জমির আইলে অবস্থান করছেন। প্রচণ্ড রোদে তারা মাথার ওপর পলিথিন ধরে কোনোভাবে আশ্রয়ের চেষ্টা করছেন। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট চরম আকার নিয়েছে। বিজিবি পানি পৌঁছে দিতে চাইলে বিএসএফ বাধা দেয় বলে জানা গেছে।
পুশ-ইনের শিকার আব্দুস সালাম বলেন, সঙ্গে থাকা সামান্য খাবার দিয়েই কোনোভাবে বেঁচে আছেন তারা। তিন দিন ধরে অনাহার-অর্ধাহারে মানবেতর জীবন কাটছে তাদের।
গত শুক্রবার ভোরে বড়বাড়ী সীমান্তের মেইন পিলার ৭৫৮-এর ৫ নম্বর সাব-পিলার এলাকা দিয়ে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি ও স্থানীয়দের বাধায় তারা শূন্যরেখাতেই আটকে পড়েন। এরপর কোম্পানি ও ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে একাধিক পতাকা বৈঠক হলেও কোনো সমাধান হয়নি।
নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল সিরাজুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে কোনো ধরনের পুশ-ইন গ্রহণ করা হবে না। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর করা হলে তবেই বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
ঠাকুরগাঁও সীমান্তেও অনিশ্চয়তায় ১১ জন
একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্তেও। সেখানে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১১ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি বাধা দিলে তারা দুই দেশের মধ্যবর্তী শূন্যরেখায় অবস্থান নিতে বাধ্য হন।
৪৪ ঘণ্টা পার হলেও তাদের ভাগ্য অনিশ্চিত রয়ে গেছে। আটকে পড়াদের মধ্যে রয়েছেন তিন পুরুষ, চার নারী ও চার শিশু। একজন নারী অন্তঃসত্ত্বা এবং একজন শিশু প্রতিবন্ধী বলে জানা গেছে।
প্রচণ্ড রোদ, বৃষ্টি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে তারা খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন। খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবার অভাবে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে।
শিশু রোজিনা আক্তার জানায়, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের আটক করে প্রায় ১২ দিন বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ঘুরিয়ে শেষ পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সীমান্তে এনে রেখে যায়। সে ভারতের একটি স্কুলের শিক্ষার্থী।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মানবিক কারণে আশপাশের গ্রামের মানুষ শুকনো খাবার ও পানি পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে থাকায় শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক ও অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিয়েছে।
দিনাজপুর ৪২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আবদুল্লাহ আল মঈন হাসান বলেন, অবৈধ পুশ-ইনের ঘটনায় বিজিবি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। যথাযথ প্রমাণসহ বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর করা হলে তা গ্রহণ করা হবে, তবে কোনো অবৈধ পুশ-ইন মেনে নেওয়া হবে না।



