১৪২ হাসপাতাল ঘিরে সক্রিয় চাঁদাবাজরা
নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে আপোষে চাঁদা দিচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৬ পিএম
রাজধানীর মোহাম্মদপুর কলেজ গেট থেকে কল্যাণপুর পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি ১৪২টি হাসপাতাল ঘিরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালি চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা এসব হাসপাতাল রথেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে থাকেন। আর এসবের নেপথ্যে রয়েছে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক ও বর্তমান দুই প্রভাবশালী নেতা। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বেপরোয়ার চাঁদাবাজরা। মোহাম্মদপুর ও শেরেবাংলা নগর কেন্দ্রিক সক্রিয় এমন ২৫ জনের তালিকা খোদ পুলিশ ও স্বাস্থ অধিদপ্তরের কাছে থাকলেও তারা নিরব ভূমিকা পালন করে আসছে। অভিযোগ রয়েছে কতিপয় অসাধূ কর্মকর্তারা এসব টাকার একটি অংশ পান। এ কারনে তাদের নিরবতার সুযোগে চাদাঁবাজরা টাকা চেয়ে বসেন সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হসপিটাল (সিকেডি) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে। অথচ এই হাসপাতালের মালিক ডা. কামরুল ইসলাম বিনা পয়সায় ২ হাজারের অধিক কিডনি প্রতিস্থাপন করে স্বা্ধীনতা পদক পেয়েছেন। শুক্রবার বিষয়টি জানাজানির পর নড়েচড়ে বসে সরকার। দেশজুড়ে শুরু হয় আলোচনা সমালোচনা। এরপর রাতেই ঘটনাস্থলে ছুটে যান্ যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনেম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন। তারা ওই যুবদল নেতাকে চেনেন না দাবী করলেও বিভিন্ন ছবিতে বিএনপির নেতাদের সঙ্গে মঈন উদ্দীনকে দেখা গেছে। এমনকি তিনি বিএনপির পক্ষ থেকে ওয়া্র্ড কাউন্সিলর হিসাবে নির্বাচন করবেন বলেও প্রচার প্রচারনা চালাচ্ছেন। ঘটনার পর অভিযুক্ত মঈন উদ্দীনকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আশ্বাস দেওয়া হলেও গতকাল রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তা হয়নি।
জানা গেছে, ৫ আগস্টের আগে এসব এলাকার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল থেকে চাদাবাজি করতো কাজল ও রাষ্ট্রন। কিন্তু পট পরিবর্তনের পর বিএনপি সাবেক ও বর্তমান দুই নেতার হয়ে চাঁদাবাজির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে নেতৃত্ব দিচ্ছে শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্ছি হেলাল, জাহিদ মোড়ল ও কেন্দ্রীয় যুবদলের এক নেতা। গত শুক্রবার বিনামুল্যে দুই হাজারেরও বেশি কিডনি প্রতিস্থাপন করা মানিবক চিকিৎসক কামরুল ইসলামের হাসপাতালে চাঁদা দাবির ঘটনার পরই প্রকাশ্যে আসে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে সিন্ডিকেটভিত্তিক চাঁদাবাজির এই তথ্য। ওই ঘটনার নেতৃত্বে দেন শেরেবাংলা নগর থানার কথিত যুবদল নেতা মঈন উদ্দিন।
সূত্র জানায়, সিন্ডিকেটের নেতৃত্বের পাশাপাশি শ্যামলী এলাকার নিয়ন্ত্রণ করছেন যুবদল নেতা কামরুজ্জামান জুয়েল। হাসপাতালের পাশাপাশি মোহাম্মদপুর এলাকার সকল খেলার মাঠসহ বিভিন্ন বাজার ও মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ করছে মোহাম্মদপুর কলোনির কিলার পাপ্পু। কিলার পাপ্পুর পাশাপাশি আদাবর এলাকায় নিয়ন্ত্রণ করছেন সজীব আহমেদ রানা ওরফে ডাকাত সজীব। জহুরী মহল্লা, বিজলি মহল্লা ও কৃষি মার্কেট এলাকা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে হাবিবুর রহমান ইমন মুন্সী ওরফে ময়লা ইমন ওরফে সিএনজি ইমন।
একইভাবে লালমাটিয়া এলাকার নিয়ন্ত্রণ করছেন জাহিদ হোসেন মোড়ল। টাউন হল ও আজম রোডের নিয়ন্ত্রণ করছে মিজানুর রহমান ইসহাক। মোহাম্মদপুর টাউন হল এলাকা সাজিদুল হক রনি। কৃষ মার্কেট ও রিং রোড এলাকার লিটন মাহমুদ বাবু ওরফে তেরে নাম বাবু। শিয়া মসজিদ মোড় থেকে পুরো রিং রোড এলাকায় সোহেল রানা ওরফে বিরানি সোহেল। হাউজিং হতে মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড এলাকায় বাদল ওরফে ছোট বাদল ওরফে কালা বাদল। মোহাম্মদপুর নামার বাজার এলাকায় শেখ জহিরুল ইসলাম অপু। মোহাম্মদপুর রায়বাজার এলাকায় রাজেশ খান। মোহাম্মদপুর রায়বাজার এলাকায় ওসমান রেজা। বাবর রোড এলাকায় সোহেল মোল্লা। কৃষি মার্কেটে আমির হোসেন। মোহাম্মদপুর পুরান থানা রোড আরঙ্গজেব রোড এলাকায় আইয়ুব আলী। শ্যামলী এলাকার রফিউদ্দিন ফয়সাল ওরফে রোহিঙ্গা ফয়সাল। এরা সবাই হাসপাতালের পাশাপাশি স্থানিয় পর্যায়েও চাদাবাজিতে জড়িত বলে অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে।
সূত্রমতে, হাসপাতালকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির এই সিন্ডিকেটে রয়েছে ৩২ নং ওয়ার্ড বিএনপির সোহেল মোল্লা ও মুরাদ কাদেরী এবং ২৯ নং ওয়ার্ড বিএনপির শানুও। হাসপাতালে চাঁদাবাজি ছাড়াও এলাকার নিয়ন্ত্রণও নিয়েছেন যুবদলের জাহিদ মোড়ল, আইয়ুব আলী ও কেন্দ্রীয় যুবদলের এক নেতা। তাদের হয়ে চাঁদাবাজি করছে শেরেবাংলা নগর থানা ছাত্রদলের রাকিব, মহসিন ও শেরে বাংলা নগর থানা মূল দলের সজীব। শিশু ও পঙ্গু হাসপাতালে যুব দলের সুমন, মুল দলের নাটা ফারুক, পিচ্চি জামাল, আগাগাঁও এলাকায় মুল দলের তাসলিমা রীতা ও নুরুল হক, হুদরোগ হাসপাতালে মুল দলের ওমর ফারুক রাশেদ, কিডনি হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবক দলের মেহেদী।
জানা গেছে, ওই এলাকায় বুশরা নামে হাসপাতালে যন্ত্রাংশ সরবরাহের একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকের নাম মমিন। তিনিও একটি চাদাবাজি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। সেখানকার সরকারি একটি হাসপাতালের পরিচালকও এই সিন্ডিকেটে ভিড়েন। ওই পরিচালকের বাড়ি রাজবাড়ী হওয়ার সুবাধে তারই এলাকার এক এমপির সঙ্গেও সখ্যতা গড়ে উঠে তার। সে সূত্রে ওই এমপিও সিন্ডিকেটে ঢুকে পড়েন। এখনো তিনি ওই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে ।
জানা গেছে, ওই এলাকাকে বলা হয় হাসপাতালপাড়া। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল), জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালসহ রাজধানীর শেরেবাংলা নগরেই রয়েছে ১০ থেকে ১৫টি সরকারি হাসপাতাল। এই হাসপাতালগুলোকে কেন্দ্র করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে থেকে শুরু করে শ্যামলী স্কয়ার পর্যন্ত আধা কিলোমিটার রাস্তায় গড়ে উঠেছে শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল। এসবের বেশির ভাগেরই নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন। সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে দালালের মাধ্যমে রোগী ভাগিয়ে এনে ফায়দা লাভই এসব হাসপাতালের মূল কাজ।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাবর রোড, খিলজি রোড, টিবি হাসপাতাল রোড ঘিরে এসব হাসপাতালের রমরমা ব্যবসা চলছে। আধা কিলোমিটার রাস্তায় বেবি কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক, ট্রমা সেন্টার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক, অ্যানালাইসিস ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল, আশিক মাল্টি স্পেশালাইজড, সিগমা মেডিকেল, মনমিতা মানসিক হাসপাতাল, শেফা হাসপাতাল, লাইফ কেয়ার নার্সিং হোম, এলিট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক, চেস্ট কেয়ার, শিশু নিরাময়, মক্কা মদিনা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক, প্লাজমা মেডিকেল সার্ভিস অ্যান্ড ক্লিনিক, আল মারকাজুল ইসলামী হাসপাতাল, নিউ ওয়েল কেয়ার হাসপাতাল, জয়ীতা মেডি ল্যাব, জনসেবা নার্সিং হোম, মুন ডায়াগনস্টিকসহ অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে শত শত রোগী আর দালালে গিজগিজ করে পুরো এলাকা। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং জাতীয় বাতজ্বর ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রসহ এই এলাকায় সরকারি হাসপাতালগুলো ঘিরে দালালদের দৌরাত্ম্যের কথা স্বীকার করেছে খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও। মোহাম্মদপুর, শ্যামলী এলাকায় এরকম বৈধ-অবৈধ শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল থাকার কথাটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নজরেও রয়েছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, যেকোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে। কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। রাজধানী থেকে শুরু হওয়া এই অভিযান ধাপে ধাপে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত করা হবে। একই সঙ্গে যারা অবৈধভাবে হাসপাতাল বা ক্লিনিক পরিচালনা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ পরিদর্শন টিমের পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গঠিত পরিদর্শন টিম গত ২৩, ২৪ ও ২৫ মার্চ রাজধানীর মোট ১৬টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিদর্শন করে। এ সময় অনিয়ম পাওয়ায় পাঁচটি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠান হচ্ছেÑ ডক্টরস কেয়ার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ২৩/৬, রূপায়ণ শেলফোর্ড টাওয়ার (৪র্থ তলা), মিরপুর রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭; আহমেদ স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ৬৩, মাজেদ সরদার রোড, নিমতলী, ঢাকা-১০০০; অ্যাক্টিভ ব্লাড ব্যাংক, ট্রান্সফিউশন অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ৮৫/এ-বি, হোসনী দালান রোড, চাঁনখাঁরপুল, চকবাজার, ঢাকা; প্রাইম টিজি ডায়াগনস্টিক ও কনসালটেশন সেন্টার, ৮৩/৮৪/১, হোসনী দালান রোড, চকবাজার, ঢাকা-১২১১ এবং টিজি মাল্টি স্পেশালাইজড হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ার, গাবতলী রোড, কলোনি গেট, মোহাম্মদপুর, ঢাকা। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, ওই এলাকায় ১৪২টি অনিবন্ধিত হাসপাতালে অভিযান পরিচালনায় নেই কোনো লক্ষণীয় উদ্যোগ। যে কারণে নিজেদের দূর্বলতা ঢাকতেই চাঁদা দিয়ে চলছে হাসপাতালগুলো।



