বিচারপতিদের সম্পদের হিসাব প্রকাশে নেই কোনো আইনি কাঠামো
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৩ পিএম
আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সম্পদের হিসাব প্রকাশের সুপারিশ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন। এরপর ২০ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো তা বাস্তবায়নে কোনো আইন বা বিধিমালা হয়নি।
এ কারণে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশের বাধ্যবাধকতাও তৈরি হয়নি।
সম্প্রতি হাইকোর্টের কয়েকজন বিচারপতির বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিচার বিভাগের জবাবদিহি নিয়ে আলোচনায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে।
সুপ্রিম কোর্ট সূত্র জানায়, গত বছর বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্টের তিন বিচারপতিকে অপসারণ করা হয়। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতাও পেয়েছিল। তারা হলেন বিচারপতি খিজির হায়াত, খোন্দকার দিলীরুজ্জামান ও মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার।
প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম দুই বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের সাংবিধানিক সংস্থা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অসদাচরণ ও অযোগ্যতার অভিযোগ তদন্ত করে এই কাউন্সিল। পরে এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করে কাউন্সিল।
গত দুই বছরে কাউন্সিলের তদন্তের মুখে আরও ৮ বিচারপতি পদত্যাগ করেছেন।
২০২১ সাল থেকে তদন্ত চলতে থাকা বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী, কাজী রেজা-উল হক ও একেএম জহিরুল হক ২০২৪ সালের নভেম্বরে পদত্যাগ করেন।
এছাড়া গত দুই বছরে তদন্ত চলাকালে পদত্যাগ করেছেন বিচারপতি মো. আখতারুজ্জামান, শাহেদ নূরউদ্দিন, মামনুন রহমান, নাইমা হায়দার ও মো. রেজাউল হাসান। সুপ্রিম কোর্টের সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।
তবে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তাদের কোনো তদন্ত প্রতিবেদনই প্রকাশ করেনি।
নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়মিত বিরতিতে তাদের সম্পদের বিবরণী জমা দিতে হয়। এজন্য তাদের সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের কাছে সম্পদের হিসাব দিতে হয়।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ বিষয়ে সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা দুজনই নিম্ন আদালতের বিচারক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই।
তাদের একজন বলেন, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী নিম্ন আদালতের বিচারকরা প্রতি পাঁচ বছর পর সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট কমিটির কাছে সম্পদের বিবরণী জমা দেন।
তিনি আরও বলেন, তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নির্দেশে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আমরা আইন মন্ত্রণালয়েও সম্পদের বিবরণী জমা দিয়েছিলাম।
'তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা সম্পদের বিবরণী জমা দেননি। কারণ এ বিষয়ে তাদের জন্য কোনো বাধ্যতামূলক আইনি বিধান নেই,' বলেন ওই কর্মকর্তা।
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ৩৫১ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশের সুপারিশ করা হয়।
কমিশনের মতে, বিচারপতিদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করা হলে স্বচ্ছতা বাড়বে, বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা জোরদার হবে এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে সহায়তা করবে।
বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীসহ পাঁচজন বিচারপতি রয়েছেন। অন্যদিকে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা ৯৯।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার চাইলে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের কিছু সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারত। বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও এর মধ্যে ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার এ উদ্যোগ নেয়নি।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন এর আগে বলেছিলেন, বিচারপতি ও আদালতের কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হলে দুর্নীতি কমতে পারে। সব পর্যায়ের বিচারপতিদের জন্য দুর্নীতিবিরোধী সুনির্দিষ্ট বিধান রেখে নিয়ম তৈরি করতে হবে।
আগে যা হয়েছিল
এর আগে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা স্বেচ্ছায় সম্পদের বিবরণী জমা দিয়েছেন, এমন নজিরও আছে।
২০১০ সালের ৩০ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক নিজের সম্পদের বিবরণী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের কাছে জমা দেন।
এর কয়েকদিন পর তিনি আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের সব বিচারপতিকে তার দপ্তরে সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার আহ্বান জানান।
তৎকালীন আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি এস কে সিনহাসহ হাইকোর্ট বিভাগের কয়েকজন বিচারপতি তার আহ্বানে সাড়া দেন। পরে বিচারপতি খায়রুল হক তাদের সম্পদের বিবরণী রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠান।
সেসময় যে বিচারপতিরা সম্পদের বিবরণী জমা দিয়েছিলেন, তাদের সবাই এরই মধ্যে অবসরে গেছেন।
২০১০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিমও বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করা উচিত। তিনি ২০১৫ সালে মারা যান।
সুপ্রিম কোর্ট সূত্র জানায়, কোনো আইনি কাঠামো বা প্রাতিষ্ঠানিক বিধিমালা না থাকায় গত ১৫ বছরে প্রধান বিচারপতির কাছে বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার এই চর্চা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাবেক প্রধান বিচারপতিদের ঘিরে বিভিন্ন ঘটনাতেও বিচার বিভাগের জবাবদিহির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছর সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে তার ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় করা ৯টি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
পরে গত বছরের আগস্টে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ৭ কর্মকর্তাসহ তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি মামলা করে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্লট নেওয়ার অভিযোগে এ মামলা করা হয়। চলতি বছরের ১৯ আগস্ট তিনি জামিনে মুক্তি পান।
অন্যদিকে, ২০১৭ সালের অক্টোবরে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ছুটিতে যান এবং দেশ ছাড়েন।
ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের তীব্র সমালোচনার মুখে তিনি দেশ ছাড়েন। পরে বিদেশে থাকা অবস্থায় পদত্যাগ করেন।
২০১৯ সালে তার ও অন্য কয়েকজনের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করে দুদক। পরে একটি দুর্নীতির মামলায় আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং অনুপস্থিতিতে ১১ বছরের কারাদণ্ড দেন।
সম্পদের হিসাব প্রকাশের দাবি
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সব পর্যায়ের বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করা হলে তা সবচেয়ে ভালো হতো।
তার মতে, বিচারপতিদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি চর্চা। এটা বিচার বিভাগের আচরণবিধি-সংক্রান্ত ব্যাঙ্গালোর নীতিমালার সততা, স্বচ্ছতা ও শালীনতার নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশেই এই চর্চা আছে। বাংলাদেশেও মানুষের আস্থা বাড়াতে আইন করে বিচারপতিদের প্রতিবছর হালনাগাদ সম্পদের বিবরণী সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত।
তার মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও সততা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের তদারকির ক্ষমতাও বাড়াবে।
প্রয়োজন হলে তদন্তের স্বার্থে দুদকসহ জবাবদিহি নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর সঙ্গে বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী বিনিময়ের ক্ষমতাও কাউন্সিলকে দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
তবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেনের মত ভিন্ন। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী আলাদাভাবে প্রকাশ করতে হয় না। কারণ তারা আয়কর বিবরণীতে প্রাসঙ্গিক তথ্য দেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় আদালত ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে আপাতত বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার পক্ষে আমি নই। কারণ সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরা তাদের আয়কর বিবরণীতে সম্পদের তথ্য দেন। এটি ঐচ্ছিক রাখা যেতে পারে। বিচারপতিরা বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির কাছে সম্পদের বিবরণী জমা দিতে পারেন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিক বলেন, সম্পদের বিবরণী প্রকাশের যেকোনো ব্যবস্থায় বিচারপতিদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল তথ্য কেবল প্রয়োজনীয় পরিমাণে প্রকাশ করা উচিত। এতে বিচারপতিরা অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিতে পড়বেন না। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থাও বজায় থাকবে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ১১, ১২ ও ১৩ ধারায় সরকারি কর্মচারীদের স্থাবর সম্পত্তি কেনাবেচা এবং সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে।
তিনি বলেন, আইনে যদি এ ধরনের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়, তাহলে বিচারপতিদের তা মানতে হবে। তবে সংসদ সদস্য, মন্ত্রীসহ সবার জন্যই একই নীতি থাকা উচিত। বেছে বেছে কারও ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ করা গ্রহণযোগ্য নয়।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার কাছে হোয়াটসঅ্যাপেও বার্তা পাঠানো হয়। তিনি বার্তাটি দেখলেও কোনো জবাব দেননি।



