বেইলি রোডে আগুন
একাধিক রেস্তোরাঁর মালিকসহ ১৩ আসামিকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১৬ পিএম
দুই বছর আগে বেইলি রোডের একটি ভবনে আগুন লেগে ৪৬ জনের নিহতের ঘটনার মামলায় ২২ জনকে অভিযুক্ত করে সিআইডি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছেন আদালত। এদের মধ্যে বিভিন্ন রেস্তোরাঁর মালিকসহ ১৩ জন পলাতক থাকায় তাদের গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
রোববার (১৯ এপ্রিল) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে এ পরোয়ানা জারি করেন।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিরা হলেন- আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের স্বত্ত্বাধিকারী মো. রমজানুল হক নিহাদ, মেজবানিখানা রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী লতিফুর নেহার, খালেদ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ও অঞ্জন কুমার সাহা, এ্যামব্রোশিয়া রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী মো. মুসফিকুর রহমান, পিৎজাইন রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী জগলুল হাসান, স্ট্রিট ওভেন রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী আশিকুর রহমান ও হোসাইন মোহাম্মদ তারেক, ফুকো রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী রাসেল আহম্মেদ, মো. সাদরিল আহম্মেদ শুভ, আদিব আলম, রাফি উজ-জাহেদ ও শাহ ফয়সাল নাবিদ। পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
আগামী ১৯ মে গ্রেপ্তার সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমার দিন রাখার কথা জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শাহ আলম।
এছাড়া জামিনে থাকা মামলার আসামিরা হলেন- কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার জেইন উদ্দিন জিসান, খানাজ এবং তাওয়াজ রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী মো. সোহেল সিরাজ, জেস্টি রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী মোহর আলী পলাশ ও মো. ফরহাদ নাসিম আলীম, চায়ের চুমুক কফিশপের স্পেস মালিক ইকবাল হোসেন কাউসার, ফুকো রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী আব্দুল্লাহ আল মতিন, ৬ষ্ঠ তলার ম্যানেজার মো. নজরুল ইসলাম খাঁন, আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের ম্যানেজার মুন্সি হামিমুল আলম বিপুল ও চায়ের চুমুক কফিশপের স্বত্ত্বাধিকারী আনোয়ারুল হক।
গত ২ এপ্রিল মামলার তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন সিআইডি পুলিশের ইন্সপেক্টর শাহজালাল মুন্সী।
তদন্তে উঠে এসেছে, ‘কাচ্চি ভাই’ রেস্টুরেন্টে আগুন লাগার পর প্রধান ফটক বন্ধ হয়ে যায়, যা বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে। তদন্তে উঠে এসেছে, বিল পরিশোধ ছাড়া কেউ যাতে বের হতে না পারে এমন অনিয়মিত প্রথার অংশ হিসেবে ফটক বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং আগুনের মুহূর্তেও তা খোলা হয়নি। ফলে ভেতরে থাকা মানুষজন বের হতে না পেরে ঘন ধোঁয়ার মধ্যে আটকা পড়েন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই শ্বাসরোধ হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন ও পরে আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান। এ রেস্টুরেন্টেই সর্বাধিক প্রাণহানি ঘটে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলেও মারা যাওয়ায় স্পেস মালিক এ. কে নাসিম হায়দার ও ক্যাপ্টেন সরদার মো. মিজানুর রহমানকে মামলা থেকে অব্যাহতি সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া গ্রেপ্তার হলেও মো. আনোয়ার হোসেন সুমন এবং শফিকুর রহমান রিমনের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনায় জড়িত থাকার সাক্ষ্য-প্রমান পাওয়া যায়নি। এজন্য তাদেরও অব্যাহতি সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের আজ অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ১০টার দিকে গ্রীন কোজি কটেজ সাততলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণ যায় ৪৬ জনের। এদের মধ্যে ২০ জন পুরুষ, ১৮ জন নারী ও ৮ জন শিশু। জীবিত উদ্ধার করা হয় ৭৫ জনকে। এ ঘটনায় রমনা মডেল থানার এসআই মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম মামলা দায়ের করেন। থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তভার পায় সিআইডি পুলিশ।
এদিকে মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ১০ টার দিকে ওই ভবনের নিচ তলার ‘চুম্বক’ নামীয় রেস্টুরেন্টে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের কারণে ভবনটিতে আগুন লাগে এবং প্রচন্ড ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ও ধোঁয়া পুরো ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে থাকা রেস্টুরেন্টে আগত নারী, পুরুষ, শিশু ও অন্যান্য দোকানে আগত ক্রেতা ও ভবনের কর্মরত লোকজনের শোর-চিৎকার, আগুনের লেলিহান শিখা থেকে বাঁচার জন্য আর্তনাদ এবং প্রাণ বাঁচানোর জন্য মানুষের দ্রুত ছোটাছুটি এবং উৎসুক জনতার কারণে ভবনের অশপাশের এলাকার প্রচুর লোকজনের সমাগম হয়। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ পুলিশের বিভিন্ন মোবাইল টিম ও পুলিশ লাইন্স হতে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অগ্নিকান্ড নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন এবং লিফট, ক্রেনসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি ব্যাবহার করে ভরনে আটকে পড়া মানুষ জনকে উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে যান।
প্রাথমিকভাবে জানা যায়, ভবনটির স্বত্ত্বধিকারী এবং ম্যানেজার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ অনুমোদন ছাড়া বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট এবং দোকান ভাড়া দেয়। রেস্টুরেন্টগুলো যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যতিরেকে রান্নার কাজে গ্যাসের সিলিন্ডার এবং চুলা ব্যবহার করে থাকে। রান্নার কাজে ব্যবহারের জন্য আসামিসহ ভবন স্বত্ত্বধিকারী এবং ম্যানেজারের যোগসাজসে ‘চুমুক’ ফাস্ট ফুড, কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্ট, মেজবানী রেস্টুরেন্ট, খানাস ফ্লাগশিপ, স্ট্রিট ওভেন, জেটি, হাক্কা ঢাকা, শেখহলি, ফয়সাল জুসবার (বার্গার), ওয়াফেলবে, তাওয়াজ, পিজ্জাইন, ফোকো, এড্রোশিয়া নামীয় রেস্টুরেন্ট মালিকরা ভবনটির নিচ তলায় বিপুল পরিমাণে গ্যাস সিলিন্ডার মজুদ করে এবং জন নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে অবহেলা, অসাবধানতা, বেপরোয়া ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ এবং বিপজ্জনক এই গ্যাস সিলিন্ডার এবং গ্যাসের চুলা ব্যবহার করে আসছিল।
ভবনটির নিচ তলায় থাকা রেস্টুরেন্টের রান্নার কাজে অবহেলা ও অসাবধানতা মূলকভাবে মজুদ করে রাখা এই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয় এবং এই আগুনের তাপ ও প্রচণ্ড ধোয়া পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলে বিভিন্ন ফ্লোরে অবস্থিত রেস্টুরেন্ট ও দোকানে অবস্থানকারী লোকজন আগুনে পুড়ে ও ধোয়া শ্বাসনালীতে ঢুকে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান এবং গুরুতর আহত হন।
অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে রয়েছেন- বুয়েট শিক্ষার্থী নাহিয়ান আমিন, সাংবাদিক অভিশ্রুতি শাস্ত্রী ওরফে বৃষ্টি খাতুন, ফৌজিয়া আফরিন রিয়া, পপি রায়, আশরাফুল ইসলাম আসিফ, নাজিয়া আক্তার, আরহাম মোস্তফা আহামেদ, নুরুল ইসলাম, শম্পা সাহা, শান্ত হোসেন, মায়শা কবির মাহি, মেহেরা কবির দোলা, ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতি তাজরিন নিকিতা, মা ভিকারুন্নিসার নুন স্কুল এন্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষিকা লুৎফুর নাহার করিম, মোহাম্মদ জিহাদ, কামরুল হাসান, দিদারুল হক, আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান শামীম, মেহেদী হাসান, নুসরাত জাহান শিমু , ইতালী প্রবাসী সৈয়দ মোবারক কাউসার, স্ত্রী সপ্না আক্তার, ছেলে সৈয়দ আব্দুল্লাহ, মেয়ে সৈয়দা ফাতেমা তুজ জোহরা ও সৈয়দা আমেনা আক্তার নুর, জারিন তাসনিম প্রিয়তি, জুয়েল গাজী, রুবি রায়, মেয়ে প্রিয়াংকা রায়, তুষার হাওলাদার, কে এম মিনহাজ উদ্দিন, সাগর, তানজিলা নওরিন, শিপন, আলিসা, সংকল্প সান, লামিশা ইসলাম, অ্যাডিশনাল ডিআইজি নাসিরুল ইসলামের মেয়ে লামিশা ইসলাম, নাঈম।



