বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করল ডব্লিউএইচও, সতর্কতা জারি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নওগাঁ জেলায় এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে গতকাল শুক্রবার একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে। রাজশাহী বিভাগে নতুন করে সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তবে ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিপাহ ভাইরাস আন্তর্জাতিকভাবে মহামারির রূপ নেওয়ার ঝুঁকি এখনো ‘নিম্ন’ পর্যায়ে রয়েছে।
ডব্লিউএইচওর বিবৃতি অনুযায়ী, মৃত নারী নওগাঁ জেলার ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী। গত ২১ জানুয়ারি থেকে তাঁর শরীরে তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। অবস্থার অবনতি হলে ২৭ জানুয়ারি তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয়। ২৮ জানুয়ারি তাঁর গলা থেকে শ্লেষ্মা ও রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ২৯ জানুয়ারি পরীক্ষার ফলাফলে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়। এর কিছুদিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু ঘটে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, ৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইন্টারন্যাশনাল হেলথ রেগুলেশনস ন্যাশনাল ফোকাল পয়েন্ট (আইএইচআর এনএফপি) সংস্থাটিকে এই সংক্রমণের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওই নারীর সাম্প্রতিক কোনো ভ্রমণের ইতিহাস ছিল না। তবে অসুস্থ হওয়ার আগে তিনি কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন। নিপাহ ভাইরাসের প্রধান বাহক টেরোপাস প্রজাতির ফলাহারি বাদুড়। শীতকালে বাদুড় খেজুরের রস সংগ্রহের হাঁড়িতে বসে রস খাওয়ার সময় তাদের লালা বা মলমূত্রের মাধ্যমে রসে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। সেই কাঁচা রস পান করলে মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৩৪৮ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের প্রায় অর্ধেকের সংক্রমণের কারণ ছিল কাঁচা খেজুরের রস পান। অন্যদের ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির সরাসরি সংস্পর্শে এসে ভাইরাস ছড়িয়েছে।
গত সপ্তাহে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দুজনের শরীরে নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত এলাকায় বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে এশিয়ার কয়েকটি দেশে বিমানবন্দরে আগত যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা জোরদার করা হয়েছে।
তবে ডব্লিউএইচও বলছে, বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে নিপাহ ভাইরাসের বৈশ্বিক ঝুঁকি এখনো কম। সংস্থাটি কোনো দেশ বা অঞ্চলের ওপর ভ্রমণ কিংবা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করেনি।
নিপাহ ভাইরাস একটি জুনোটিক ভাইরাস, যা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এ ভাইরাসের জন্য এখনো কোনো কার্যকর ওষুধ বা ভ্যাকসিন নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি—প্রায় ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত।
ডব্লিউএইচওর প্রধান তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ নজরদারি ও পরীক্ষার পরিধি বাড়িয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং জনগণকে সুরক্ষা বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।’
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধে বিশেষ সতর্কতা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কাঁচা খেজুরের রস পান না করা, বাদুড় বা পাখির খাওয়া ফল বর্জন, আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন রোগীর সংস্পর্শে সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার এবং তীব্র জ্বর বা আচরণগত অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া।
বাংলাদেশে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই এই সময়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।



