Logo
Logo
×

শিক্ষা

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ: যোগ দেওয়ার আগে যে হিসাব জরুরি

Icon

রাবি প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৬ পিএম

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ: যোগ দেওয়ার আগে যে হিসাব জরুরি

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের উদ্যোগে গঠিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ কি যোগ দেবে? বিষয়টি শুধু একটি সামরিক চুক্তিতে অংশগ্রহণের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা বা স্ট্রাটেজিক অটোনমি। 

তাই মক্কা চুক্তিকে শুধু ‘মুসলিম বিশ্বের ঐক্য’ হিসেবে দেখা যেমন ভুল, তেমনি এটিকে সরাসরি বাংলাদেশের জন্য হুমকি হিসেবেও দেখা অতিরঞ্জিত। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই মুহূর্তে যোগ দেওয়া কি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থে সত্যিই প্রয়োজনীয়? 

আমার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের এখনই দ্রুত এই চুক্তিতে যোগ দেওয়া উচিত নয়। এর অর্থ নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রত্যাখ্যান করা নয়; বরং চুক্তিটির প্রকৃতি, বাধ্যবাধকতা এবং সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক পরিণতি পরিষ্কারভাবে বোঝার আগে কোনো স্থায়ী সামরিক অঙ্গীকারে না যাওয়াই অধিকতর বাস্তবসম্মত। 

মক্কা চুক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাবনা। যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ বাংলাদেশ পেতে পারে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। 

কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন আছে—এসব সুবিধা পাওয়ার জন্য কি বাংলাদেশের একটি আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যোগ দেওয়া প্রয়োজন? 

সম্ভবত নয়। 

বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যৌথ সামরিক মহড়া, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময় ও গোয়েন্দা সহযোগিতার মাধ্যমে একই ধরনের অনেক সুবিধা অর্জন করতে পারে। তাহলে এমন একটি চুক্তিতে কেন যাবে, যার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সামরিক বাধ্যবাধকতা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়? 

যদি বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যোগ দেয় তবে ভবিষ্যতে যেসব ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা আছে তা হলো- 

প্রথম ঝুঁকি: বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতা অন্যদের মতো নয়। 

পাকিস্তানের নিরাপত্তা নীতিতে ভারত একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। সৌদি আরবের নিরাপত্তা হিসাব মধ্যপ্রাচ্য, ইরান ও আঞ্চলিক সংঘাতকে ঘিরে। তুরস্কের কৌশলগত বাস্তবতায় সিরিয়া, ইরাক, ককেশাস ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ। 

কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান নিরাপত্তা অগ্রাধিকার ভিন্ন—সীমান্ত, সমুদ্রসীমা, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ঝুঁকি, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জ্বালানি এবং মানবনিরাপত্তা। 

তাহলে প্রশ্ন হলো, অন্য তিন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাস্তবতার সঙ্গে বাংলাদেশের নিরাপত্তা প্রয়োজনকে একই সামরিক কাঠামোয় বাঁধা কতটা যৌক্তিক? 

একটি সামরিক জোটে প্রবেশের আগে এই প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর প্রয়োজন। 

দ্বিতীয় ঝুঁকি: ভারতকে ঘিরে সম্ভাব্য নিরাপত্তা-দ্বিধা।  

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় সম্ভবত ভারত। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত নতুন কিছু নয়। ভবিষ্যতে যদি দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়, তখন বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে? 

বাংলাদেশ কি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকতে পারবে? নাকি চুক্তির কোনো ধারা তাকে পাকিস্তানের প্রতি কোনো ধরনের নিরাপত্তা-সহযোগিতায় বাধ্য করবে? 

এই প্রশ্নের উত্তর অস্পষ্ট থাকলে এখনই যোগ দেওয়া বিপজ্জনক। 

কারণ বাংলাদেশের কূটনীতির বড় শক্তি হলো—একই সঙ্গে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার সক্ষমতা। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, ইরানসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। 

কোনো সামরিক জোটে প্রবেশ করলে এই কৌশলগত নমনীয়তা কিছুটা হলেও সংকুচিত হতে পারে। 

তৃতীয় ঝুঁকি: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে অপ্রত্যাশিতভাবে জড়িয়ে পড়া। 

বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক নাগরিক উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানি করে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। 

মক্কা চুক্তি ভবিষ্যতে কী ধরনের নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিণত হবে, সেটি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। যদি কোনো পর্যায়ে এটি আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে ওঠে, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি স্বার্থও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। 

 

চতুর্থ ঝুঁকি:  নিরাপত্তা দ্বিধা বা সিকিউরিটি ডিলেমা। 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের “সিকিউরিটি ডিলেমা” ধারণাটি এখানেও গুরুত্বপূর্ণ। একটি রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা বাড়াতে সামরিক সক্ষমতা বা জোট বৃদ্ধি করলে অন্য রাষ্ট্র সেটিকে হুমকি হিসেবে দেখতে পারে। ফলে তারাও পাল্টা প্রস্তুতি নেয়। শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষই আগের চেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে। 

বাংলাদেশ যদি নতুন একটি যৌথ সামরিক কাঠামোর অংশ হয়, ভারত বা অন্য আঞ্চলিক শক্তি সেটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে—তা নিশ্চিত নয়। ফলে যে সিদ্ধান্ত নিরাপত্তা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হবে, সেটিই নতুন কৌশলগত সন্দেহ ও প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে স্নায়ু-যুদ্ধ চলাকালীন আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সমরাস্ত্র সমৃদ্ধকরণ প্রতিযোগিতাকে ধরা যেতে পারে।  

পঞ্চম ঝুঁকি: আজকের সিদ্ধান্ত আগামী দশকের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে। 

পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত শুধু বর্তমান পরিস্থিতি দিয়ে বিচার করা যায় না। আজ সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক যতই ভালো হোক, আগামী দশকে আঞ্চলিক রাজনীতির চরিত্র বদলে যেতে পারে। 

সরকার পরিবর্তন হতে পারে, নেতৃত্ব পরিবর্তন হতে পারে, নতুন সংঘাত তৈরি হতে পারে, এমনকি মিত্র রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের সম্পর্কও বদলে যেতে পারে। কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক সামরিক অঙ্গীকার থেকে বেরিয়ে আসা সবসময় সহজ নয়। 

তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত শুধু—“আমরা এখন কী লাভ পাব?” এটা না, বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই চুক্তি আগামী ১০–২০ বছরে আমাদের কী করতে বাধ্য করতে পারে? 

তাহলে কি বাংলাদেশ নিরাপত্তা সহযোগিতা থেকে দূরে থাকবে? 

অবশ্যই নয়। 

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন প্রয়োজন। সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সমুদ্র নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতাও প্রয়োজন। কিন্তু এগুলোর জন্য পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটে যোগ দেওয়া একমাত্র পথ নয়। 

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে শর্তসাপেক্ষ ও সীমিত সম্পৃক্ততা—চুক্তির পূর্ণাঙ্গ কাঠামো ও বাধ্যবাধকতা বোঝা, সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করা; কিন্তু এমন কোনো সামরিক প্রতিশ্রুতিতে না যাওয়া, যা ভবিষ্যতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত করতে পারে। 

এ কারণে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের এখনই দ্রুত যোগ দেওয়ার চেয়ে পর্যবেক্ষণ, আলোচনা ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক মূল্যায়ন বেশি জরুরি। 

চুক্তির প্রতিটি ধারা, বিশেষ করে যৌথ প্রতিরক্ষা, যুদ্ধকালীন বাধ্যবাধকতা, কমান্ড কাঠামো, সদস্যদের প্রতি সামরিক সহায়তার ধরন এবং প্রত্যাহারের সুযোগ—সবকিছু স্পষ্টভাবে জানা প্রয়োজন। পাশাপাশি সংসদ, সামরিক ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ, জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের  মতামতও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। 

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির শক্তি কোনো একটি সামরিক ব্লকের অংশ হওয়া নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। 

তাই মক্কা চুক্তির প্রশ্নে বাংলাদেশের সবচেয়ে বুদ্ধিমান অবস্থান হতে পারে—দরজা বন্ধ না করা, কিন্তু তাড়াহুড়ো করে ভেতরেও ঢুকে না পড়া। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করা সহজ; কিন্তু সেই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক পরিণতি থেকে বেরিয়ে আসা অনেক কঠিন। 

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—“আমরা কার সঙ্গে আছি?” বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—“আগামী দিনের অনিশ্চিত বিশ্বে আমরা কতটা স্বাধীনভাবে নিজের পক্ষে দাঁড়াতে পারব?” 

মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য সুযোগ হতে পারে। কিন্তু সুযোগ গ্রহণের আগে নিশ্চিত হতে হবে, সেই সুযোগের মূল্য যেন বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা না হয়।

ফয়সাল আহমেদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন