Logo
Logo
×

শিক্ষা

ইসলামের পূর্ণতা ও ক্ষমার মহিমান্বিত দিন ‘আরাফাহ’: মনস্তাত্ত্বিক আত্মশুদ্ধি ও সমাজতাত্ত্বিক কোরবানির দর্শন

Icon

মোহাম্মদ মিজান (শিক্ষার্থী), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ০৩:২৪ পিএম

ইসলামের পূর্ণতা ও ক্ষমার মহিমান্বিত দিন ‘আরাফাহ’: মনস্তাত্ত্বিক আত্মশুদ্ধি ও সমাজতাত্ত্বিক কোরবানির দর্শন

আজ ২৬ মে, ২০২৬; হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৯ জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি। আজ পবিত্র ও ঐতিহাসিক ‘আরাফাহর দিন’। বিশ্ব মুসলিমের জন্য এটি এক অনন্য এবং মহাপবিত্র দিন। আজকের দিনেই লাখ লাখ হাজি আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি ও ক্ষমা প্রার্থনায় লিপ্ত হয়েছেন। ইসলামের ইতিহাস ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দিনটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব রূপান্তরের স্মারক।

‘লাব্বাইক’ ধ্বনিতে বিশ্বজনীন সাম্যের মহড়া

আজ আরাফাতের ময়দান মুখরিত এক অভূতপূর্ব ও হৃদয়স্পর্শী ধ্বনিতে— “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক” (হাজির হে আল্লাহ, আমি হাজির! আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির! নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা, নেয়ামত এবং রাজত্ব একমাত্র আপনারই)।

ইসলামি সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এই ‘তালবিয়া’ কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, এটি মানব ইতিহাসের সর্ববৃহৎ সাম্যবাদী স্লোগান। বিশ্বের নানা প্রান্তের, নানা ভাষার এবং নানা বর্ণের মানুষ সমস্ত সামাজিক পদমর্যাদা, রাজকীয় পোশাক ও আভিজাত্য বিসর্জন দিয়ে মাত্র দুই টুকরো সাদা কাপড় (ইহরাম) পরে একই সুরে এই ঘোষণা দিচ্ছেন। এটি মানুষের তৈরি সমস্ত কৃত্রিম ভেদাভেদ ও বর্ণবাদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় এবং প্রমাণ করে যে, আল্লাহর দরবারে সবাই সমান।

ইসলামের পূর্ণতা ও শ্রেষ্ঠ নেয়ামতের দিন

আজকের এই দিনের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক তাৎপর্য হলো, আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে ১০ হিজরির ৯ জিলহজ বিদায় হজের দিন আরাফাতের ময়দানে নাজিল হয়েছিল পবিত্র কোরআনের সেই যুগান্তকারী আয়াত:

“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।” (সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৩)

এই আয়াতের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। গবেষকদের মতে, এটি কেবল একটি ঐশী বাণী নয়, বরং এটি মানবজাতির জন্য একটি সম্পূর্ণ জীবনবিধানের (Complete Code of Life) চূড়ান্ত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এর মাধ্যমে ইসলামকে একটি কালজয়ী, প্রগতিশীল এবং সার্বজনীন দ্বীন হিসেবে সিলমোহর করে দেওয়া হয়েছে।

গুনাহ মাফ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির মহোৎসব

আজকের দিনটি কেবল ইতিহাসের অংশ নয়, বরং বর্তমানের প্রতিটি মুসলমানের জন্য এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক পুনর্জন্মের সুযোগ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আরাফাহর দিনের চেয়ে অন্য কোনো দিনে আল্লাহ তাআলা এত বেশি বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন না।” (সহীহ মুসলিম)।

ইসলামি দর্শনে এই সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা মানুষের অবচেতন মন থেকে অপরাধবোধ (Guilt Complex) দূর করে এক নতুন ইতিবাচক জীবন শুরু করার নৈতিক শক্তি জোগায়। আজ ঘরে বসে যারা রোজা রাখছেন, তাদের বিগত ও আগামী—এই দুই বছরের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।

সর্বোত্তম দোয়া ও আজকের আমল

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও এরশাদ করেছেন, “সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফাহর দিনের দোয়া।” তিনি আজকের দিনে বিশ্ববাসীকে একটি বিশেষ দোয়া বেশি বেশি পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। দোয়াটি হলো:

"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাই'ইন কাদীর।"

(অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব একমাত্র তাঁরই এবং সমস্ত প্রশংসাও তাঁরই। তিনি সব বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান।)

আজকের দিনে এই তাওহীদের বাণী জপ করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা এবং মানব সাম্যের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করা প্রত্যেক মুসলমানের প্রধান কর্তব্য।

আসন্ন কোরবানি: ত্যাগ, ভোগবাদিতা বনাম সমাজতাত্ত্বিক দর্শন

মাত্র দুই দিন পরেই, অর্থাৎ আগামী ২৮ মে দেশজুড়ে উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। ৯ জিলহজের আরাফাহর এই আধ্যাত্মিক প্রস্তুতিই আমাদের নিয়ে যায় ১০ জিলহজের কোরবানির ময়দানে।

হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই মহান ত্যাগের স্মৃতি ধারণ করে মুসলমানরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করবেন। তবে একাডেমিক ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার আলোকেই কোরবানির মূল রূপটি বোঝা প্রয়োজন।

পুঁজিবাদী ভোগবাদের অবসান: আধুনিক অর্থনীতি যখন মানুষকে চূড়ান্ত ভোগবাদী বা 'Consumerist' হতে শেখায়, কোরবানি তখন শেখায় নিজের সম্পদ উৎসর্গ বা 'Sacrifice' করতে। কোরবানি শব্দের মূল ‘কুরবান’ যার অর্থ ‘নৈকট্য’। এই নৈকট্য কেবল আল্লাহর সাথে নয়, বরং ত্যাগের মাধ্যমে মানুষের সাথে মানুষের নৈকট্য সৃষ্টি করে।

সম্পদ বণ্টন ও সামাজিক ভারসাম্য: সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, কোরবানির মাংস তিন ভাগে বণ্টন করার অর্থনৈতিক তাৎপর্য গভীর। এটি সমাজে বিদ্যমান শ্রেণি-বৈষম্য দূর করে এবং প্রান্তিক ও অসচ্ছল জনগোষ্ঠীকে মূল ধারার উৎসবের অর্থনৈতিক ও পুষ্টিগত অংশীদার করে তোলে।

প্রতীকী পশুরূপে ‘ভেতরের পশুত্ব’ নিধন: পবিত্র কোরআনে পরিষ্কার বলা হয়েছে— আল্লাহর কাছে পশুর রক্ত বা মাংস পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় বান্দার ‘তাকওয়া’ বা পরহেজগারি (সূরা হজ, আয়াত: ৩৭)। ফলে, কোরবানি মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক অনুশীলন, যার উদ্দেশ্য হলো মানুষের ভেতরের অহংকার, হিংসা, লোকদেখানো প্রবণতা (রিয়া) এবং পাশবিক প্রবৃত্তিকে প্রতীকী পশুর সাথে জবাই করা。

আরাফাহর দিনে নিজের আত্মাকে গুনাহ ধুয়ে-মুছে সাফ করার পর, আসন্ন কোরবানির মাধ্যমে আমাদের সমাজ থেকে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে হবে। লোকদেখানো বা প্রতিযোগিতামূলক কোরবানি বাদ দিয়ে, ত্যাগের শুদ্ধতম মহিমায় সমাজকে রাঙিয়ে তোলাই হোক এবারের জিলহজ মাসের মূল শিক্ষা।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন