বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী: মতাদর্শের অদৃশ্য বিভাজন
মোহাম্মদ মিজান (শিক্ষার্থী), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১২:০৬ পিএম
বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় মুক্তচিন্তা, যুক্তি ও জ্ঞানচর্চার জায়গা। এখানে একজন শিক্ষার্থী তার মত, চিন্তা ও ব্যক্তিত্ব স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারবে—এটাই একটি সুস্থ শিক্ষাঙ্গনের মূল চেতনা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ মতাদর্শিক বিভাজন, দলীয় প্রভাব এবং অদৃশ্য পক্ষপাতিত্ব শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ককে জটিল করে তুলছে।
বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক মেরুকরণ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একজন শিক্ষার্থীর মেধা বা যোগ্যতার চেয়ে তার “কোন বলয়ের কাছের মানুষ”—এই পরিচয় অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে শিক্ষাঙ্গনে ধীরে ধীরে ভয়ের সংস্কৃতি, মানসিক চাপ এবং নীরব বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ২০২৬ সালে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক গবেষণা Contemporary Student Politics in Bangladesh: Impacts, Trends and Insights from the University of Rajshahi–এ দেখানো হয়েছে যে, দলীয় ছাত্ররাজনীতি ও রাজনৈতিক গ্রুপিং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক Md. Abdul Barik, Professor Mst. Quamrun Nahar এবং Md. Yeasir Arafat। এটি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে Priviet Social Sciences Journal-এ প্রকাশিত হয়। গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক বলয়ভিত্তিক বিভাজনের কারণে ক্লাস-পরীক্ষা ব্যাহত হয়, প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি হয় এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা মানসিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
একইভাবে Evaluating the Impact of Political Factors on Higher Education: A Study at the University of Rajshahi শীর্ষক আরেকটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, দলীয় প্রভাব ও পক্ষপাতমূলক মূল্যায়নের কারণে অনেক যোগ্য শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও একাডেমিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। সেখানে বলা হয়, যখন রাজনৈতিক পরিচয় মেধার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক উদ্দেশ্য—মুক্তবুদ্ধি চর্চা—ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংস্থা (DURS)-এর ২০২৪ সালের জরিপেও একই ধরনের উদ্বেগ উঠে আসে। জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী দলীয় ছাত্ররাজনীতি চায় না এবং ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করে দলীয় রাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—বৈষম্যের অনেক কিছুই দৃশ্যমান নয়। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের অবহেলিত, বিচ্ছিন্ন কিংবা মানসিকভাবে চাপে অনুভব করে।
অনেক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত মতাদর্শ বা রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মিল থাকলে কিছু শিক্ষার্থী বাড়তি সহানুভূতি পায়। অন্যদিকে নিরপেক্ষ বা ভিন্নমতের শিক্ষার্থীরা নিজেদের পিছিয়ে পড়া মনে করে। এই মানসিক প্রবণতাকে
শিক্ষাবিজ্ঞানের ভাষায় “হ্যালো ইফেক্ট” (Halo Effect) বলা হয়।
মনোবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড থর্নডাইকের গবেষণা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির একটি ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য দেখে তার সম্পর্কে সামগ্রিক ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও অনেক সময় দেখা যায়, “টপার”, “ক্লাসে পরিচিত” বা শিক্ষকদের ঘনিষ্ঠ শিক্ষার্থীদের প্রতি অবচেতনভাবে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। ফলে তারা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে অন্তর্মুখী, নিরপেক্ষ বা কম পরিচিত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তৈরি হয় উল্টো প্রবণতা, যাকে “হর্ন ইফেক্ট” বা “ডেভিল ইফেক্ট” বলা হয়।
এই পক্ষপাতিত্ব লিখিত পরীক্ষার চেয়ে ভাইভা, প্রেজেন্টেশন, ল্যাব ও মৌখিক মূল্যায়নে বেশি প্রভাব ফেলে। কারণ এসব ক্ষেত্রে নম্বর দেওয়ার পুরো ক্ষমতা শিক্ষকদের হাতে থাকে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা মতাদর্শিক ঘনিষ্ঠতা কখনো কখনো একাডেমিক ফলাফলেও প্রভাব ফেলে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বিশ্ববিদ্যালয় কি একজন শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় দেখবে, নাকি তার মেধা ও যোগ্যতা?
একজন শিক্ষক অবশ্যই ব্যক্তিগত মতাদর্শ রাখতে পারেন। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে সেই মতাদর্শ যেন শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের মানদণ্ড না হয়ে ওঠে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে ন্যায়সঙ্গত মূল্যায়নের ওপর।
বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ধরনের পক্ষপাত কমাতে “ব্লাইন্ড গ্রেডিং সিস্টেম” চালু রয়েছে। এই পদ্ধতিতে পরীক্ষার খাতায় শিক্ষার্থীর নাম বা পরিচয় গোপন রাখা হয়। ফলে শিক্ষক জানেন না তিনি কার খাতা মূল্যায়ন করছেন। এতে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা পূর্বধারণার প্রভাব কমে আসে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এ ধরনের স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই কোনো দলীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠার জায়গা হতে পারে না। এটি এমন একটি স্থান, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, বিতর্ক থাকবে, মতের সংঘাত থাকবে—কিন্তু সেই ভিন্নমত কখনো বৈষম্য বা প্রতিহিংসার
কারণ হতে পারে না।
কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সৌন্দর্য একরকম চিন্তায় নয়, বরং ভিন্ন চিন্তার সহাবস্থানে। যেখানে একজন শিক্ষার্থী নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারবে, প্রশ্ন করতে পারবে এবং মত প্রকাশ করেও সমান সম্মান পাবে—সেখানেই সত্যিকার অর্থে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি হবে।



