এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তি: রেহমান সোবহান
যুগের চিন্তা ২৪ অনলাইন
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২০ পিএম
বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার কেন্দ্র ধীরে ধীরে এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে এবং এই পরিবর্তন ঠেকাতে উন্নত দেশগুলো যে শুল্ক ও বাজার-হস্তক্ষেপমূলক নীতি গ্রহণ করছে, তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর এক সেশনে তিনি এসব কথা বলেন। ‘দ্য নিউ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ডিজঅর্ডার: ইমপ্লিকেশনস ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা ও বাংলাদেশের করণীয় তুলে ধরেন।
রেহমান সোবহান বলেন, দীর্ঘদিন পর বিশ্ব একটি নতুন অর্থনৈতিক বিন্যাসের দিকে এগোচ্ছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এশিয়া। এ অঞ্চলের দেশগুলো উৎপাদন, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও মূলধন সঞ্চয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আগে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহায়তা ও বিনিয়োগের প্রধান উৎস ছিল পশ্চিমা বিশ্ব। এখন এশিয়ায় তৈরি হয়েছে বিকল্প মূলধনের উৎস। এতে আরও ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিবর্তনের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার পশ্চিমা দেশ নয়, বরং চীন ও অন্যান্য এশীয় অর্থনীতি। প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও চীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), গবেষণা ও উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
সিপিডি চেয়ারম্যানের মতে, বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন শক্তির উত্থানকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মোকাবিলার পরিবর্তে কিছু উন্নত দেশ বাজারে হস্তক্ষেপ, শুল্ক আরোপ এবং অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে। তিনি একে ‘অর্থনীতির অস্ত্রীকরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
রেহমান সোবহান বলেন, এসব পদক্ষেপ সাময়িক চাপ তৈরি করতে পারলেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তির পরিবর্তনের ধারা থামাতে পারবে না। ভবিষ্যতে এশিয়াই বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশের জন্য সুযোগ ও করণীয়
বাংলাদেশের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হওয়া। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও আমদানি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এশিয়ার ভূমিকা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তার মতে, বাংলাদেশকে বিশেষভাবে চীন ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। আগামী দশকে চীন ও ভারত বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর মধ্যে অবস্থান করবে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এ দুই অর্থনীতির মধ্যে সংযোগকারী ভূমিকা পালনের সুযোগও রাখে।
তিনি আরও বলেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা জোরদার করা জরুরি। কাগজে-কলমে বহু পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্বলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
‘বঙ্গোপসাগর নয়, স্থলভাগেও বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব’
বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব শুধু বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক নয়, বরং স্থল যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত বলে মনে করেন রেহমান সোবহান।
তিনি বলেন, পদ্মা ও যমুনা সেতুর মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থলসংযোগের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই সংযোগ অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান আরও বলেন, এশিয়ার সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ভারত ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক। দুই দেশের মধ্যে স্থিতিশীল ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলে তা শুধু এশিয়া নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে।



