‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন’ সংশোধন হচ্ছে
বিতর্কিত ব্যাংক মালিকরা আর ফিরতে পারবেন না
বিশ্বব্যাংকের ১৬৫ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা নিশ্চিত হচ্ছে
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ১১:২৪ এএম
তীব্র জনসমালোচনা এবং বিশ্বব্যাংকের ১৬৫ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ সহায়তা আটকে যাওয়ার শঙ্কায় বিতর্কিত ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন’-সংশোধন করা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ এপ্রিল পাশ হওয়া আইনের ১৮(ক) ধারাটি বাতিল করবে সরকার। এটি আইনে পরিণত হলে ব্যাংক দখলকারী বা আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িত সাবেক শেয়ারহোল্ডারদের ব্যাংকের সম্পদ ও দায় পুনরায় ফিরে পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। দেশের ব্যাংকিং খাত সংস্কারের ক্ষেত্রে এটিকে সরকারের বড় ধরনের পিছু হটা এবং একটি ইতিবাচক সংশোধন হিসাবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
যে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্র করে এই আইনগত জটিলতা, সেগুলোর আর্থিক অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নাজুক। এই পাঁচ ব্যাংক হচ্ছে-এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সীমাহীন ঋণ জালিয়াতি এবং বেনামি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করলেও গ্রাহকদের আস্থা পুরোপুরি ফেরানো সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে আইন সংসদে পাশ হওয়ার সময় এই বিতর্কিত ধারা যুক্ত হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়, ব্যাংকগুলো হয়তো আবারও সেই পুরোনো লুটেরাদের হাতেই ফিরে যাচ্ছে। ফলে গ্রাহকদের আমানত তুলে নেওয়ার একটি প্রবণতা দেখা দেয়।
সংশ্লিষ্ট ধারা বাতিলের সিদ্ধান্তের ফলে এই ব্যাংকগুলোর আমানতকারী ও সাধারণ গ্রাহকদের মাঝে স্বস্তি ফিরবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইনের’ বিশেষ ধারা বাতিলের প্রস্তাবটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আসার পর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এখনো কিছু পায়নি। তবে বিষয়টি আলোচনার মধ্যে রয়েছে। এছাড়া বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়। আমরা সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, নীতিগত সিদ্ধান্তটি ইতোমধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এখন সরকারের অনুমোদনে যে কোনো সময় আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং (আইনি পরীক্ষা) সাপেক্ষে একটি সংশোধনী বিল বা জরুরি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮(ক) ধারাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হবে।
বিতর্কিত সেই ১৮(ক) ধারায় যা বলা হয়েছে : গত ১০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করে বর্তমান সরকার। তবে আইনটি জাতীয় সংসদে পাশের ঠিক আগ মুহূর্তে ১৮(ক) নামে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল-‘কোনো ব্যাংক রেজুলেশনের (পুনর্গঠন বা অবসায়ন) আওতায় যাওয়ার আগে যারা ওই ব্যাংকের শেয়ারধারক বা মালিক ছিলেন, তারা চাইলে পরবর্তী সময়ে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকেও এই সুযোগ দিতে পারবে।’ তবে এই ধারাটি পাশ হওয়ার পরপরই দেশের অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্ট এবং সুশীল সমাজের মধ্যে ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। বলা হয়, বিগত সরকারের আমলে জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের মাধ্যমে ব্যাংক খাত ধসিয়ে দেওয়া বিতর্কিত ব্যবসায়ীগোষ্ঠী এবং সাবেক প্রভাবশালী মালিকদের আবারও ব্যাংকগুলোর মালিকানায় ফিরিয়ে আনতেই এই ধারাটি যুক্ত করা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, এই ধারাটি যখন আইনে যুক্ত করা হয়েছিল, তখনই সেটি চরম ভুল এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। যারা ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করেছে, হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে, তাদেরই আবার সেই ব্যাংকের সম্পদ ও দায় ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা আর্থিক খাতের সুশাসনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। তিনি বলেন, সরকার যে এখন এটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক। ব্যাংক রেজুলেশন আইনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং ব্যাংক লুটেরাদের শাস্তি নিশ্চিত করা, তাদের পুরস্কৃত করা নয়। আশা করি, সরকার দ্রুত এটি চূড়ান্তভাবে বাতিল করবে।
বিশ্বব্যাংকের কঠোর অবস্থান : ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন’ নিয়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ সূত্রগুলো জানায়, এই ধারাটি বহাল থাকলে বিশ্বব্যাংক থেকে বাজেট সহায়তার অংশ হিসাবে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা কমপক্ষে ১৬৫ কোটি ডলার ঋণসহায়তা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত না করে এবং লুটেরাদের ফেরার পথ খোলা রেখে এই বিশাল ঋণছাড় করা সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ মো. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘১৮(ক) ধারাটি আর্থিক খাতের সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ‘পলিসি রিভার্সাল’ বা নীতিগত পশ্চাদপসরণ ছিল। বিশ্বব্যাংক বা যে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা যখন একটি দেশকে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা দেয়, তখন তারা ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সংস্কার ও সুশাসন দেখতে চায়। কিন্তু এই ধারার মাধ্যমে লুটেরাদের আবার পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকার আইনি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল।



