ইতিহাসে প্রথমবার আউন্সপ্রতি ৫০০০ ডলার ছাড়াল স্বর্ণ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৪৬ এএম
ইতিহাসে এই প্রথম স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৫০০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৫ সালে মূল্যবান এই ধাতুর দাম ৬০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যাওয়ার পর বাজারে গড়ল নতুন এক রেকর্ড।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির মধ্যেই স্বর্ণের এই দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী বাণিজ্য নীতি। সম্প্রতি তিনি হুঁশিয়ারি দেন, কানাডা যদি চীনের সঙ্গে কোনো বাণিজ্য চুক্তি করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে।
অনিশ্চিত সময়ে বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণ দীর্ঘদিন ধরেই ‘নিরাপদ বিনিয়োগ’ বা সেফ-হেভেন হিসেবে পরিচিত। এই প্রবণতার প্রমাণ মিলছে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুতেও। গত বছর রূপার দাম প্রায় ১৫০ শতাংশ বেড়েছিল এবং চলতি মাসে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আউন্সপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যবান ধাতুর এই আকাশচুম্বী চাহিদার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি, মার্কিন ডলারের দুর্বলতা, বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ মজুদের প্রবণতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ এ বছর আবারও সুদের হার কমাতে পারে—এমন প্রত্যাশা।
এ ছাড়া ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনাসহ বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা স্বর্ণের দাম বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
স্বর্ণের জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় কারণ হলো এর দুষ্প্রাপ্যতা। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, মানব ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মোট ২ লাখ ১৬ হাজার ২৬৫ টনের মতো স্বর্ণ উত্তোলন করা হয়েছে। এই পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে সর্বোচ্চ তিন থেকে চারটি অলিম্পিক সাইজের সুইমিং পুল ভরানো সম্ভব। যদিও আধুনিক খনি প্রযুক্তির উন্নতির ফলে ১৯৫০ সালের পরই উত্তোলিত হয়েছে মোট স্বর্ণের বড় একটি অংশ।
ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের হিসাব বলছে, মাটির নিচে এখনো প্রায় ৬৪ হাজার টন স্বর্ণ মজুদ রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী বছরগুলোতে স্বর্ণের সরবরাহ একটি নির্দিষ্ট সীমায় গিয়ে থমকে যেতে পারে।
এবিসি রিফাইনারির গ্লোবাল হেড অব ইনস্টিটিউশনাল মার্কেটস নিকোলাস ফ্রাপেল বলেন, স্বর্ণ এমন একটি সম্পদ, যা অন্য কারো ঋণের ওপর নির্ভরশীল নয়। শেয়ার বা বন্ডের মতো বিনিয়োগে যেখানে প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্স গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে স্বর্ণের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি নেই। তার মতে, বর্তমান অস্থির বিশ্বে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে স্বর্ণ অত্যন্ত কার্যকর একটি মাধ্যম।
বিনিয়োগকারীদের এই ঝোঁকের কারণে ২০২৫ সাল স্বর্ণের জন্য একটি ‘ব্লকবাস্টার’ বছর হয়ে উঠেছে। ১৯৭৯ সালের পর এক বছরে স্বর্ণের দামে এমন প্রবৃদ্ধি আর দেখা যায়নি।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট শেয়ারগুলোর অতিমূল্যায়ন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে আর্থিক বাজারের টালমাটাল পরিস্থিতিতে স্বর্ণের দাম বারবার নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে।
মেটালস ফোকাসের গবেষণা প্রধান নিকোস কাভালিসের মতে, মার্কিন নীতি নিয়ে তৈরি হওয়া চরম অনিশ্চয়তাই স্বর্ণের দামের বড় চালিকাশক্তি। সাধারণত অর্থনৈতিক উদ্বেগ ও সুদের হার কমার পূর্বাভাস—দুই ক্ষেত্রেই স্বর্ণের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়।
বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, চলতি বছর ফেডারেল রিজার্ভ দুই দফা সুদের হার কমাতে পারে। অনলাইন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান পেপারস্টোনের রিসার্চ স্ট্র্যাটেজিস্ট আহমেদ আসিরি বলেন, যখন সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ ব্যয় আর লাভজনক থাকে না, তখন বিনিয়োগকারীরা বিকল্প হিসেবে স্বর্ণের দিকেই ঝুঁকে পড়েন।
কেবল ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরাই নন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ব্যাপক হারে স্বর্ণ মজুদ করছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের রিজার্ভে শত শত টন স্বর্ণ যোগ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রবণতাই এই চাহিদা বাড়িয়ে তুলছে।
তবে নিকোলাস ফ্রাপেল সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান স্বর্ণবাজার মূলত সংবাদনির্ভর হওয়ায় যেকোনো সময় দামে হঠাৎ পতনও ঘটতে পারে। ইতিবাচক বৈশ্বিক কোনো খবর বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ভালো হলেও স্বর্ণের বাজারের জন্য তা নেতিবাচক হতে পারে।
এদিকে, বিনিয়োগের বাইরেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ছে। ভারতে দীপাবলি বা বিয়ের মৌসুমে স্বর্ণ কেনাকে শুভ মনে করা হয়। মর্গান স্ট্যানলির তথ্য অনুযায়ী, ভারতের পরিবারগুলোর কাছে বর্তমানে ৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের স্বর্ণ রয়েছে, যা দেশটির জিডিপির প্রায় ৮৯ শতাংশের সমান।
চীনও বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণের বাজার। আসন্ন ফেব্রুয়ারিতে চীনা নববর্ষ ‘ইয়ার অব দ্য হর্স’ শুরু হওয়ার আগে সেখানে স্বর্ণের চাহিদা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। সূত্র : বিবিসি।



