বিকাশ ডিস্ট্রিবিউটরের আড়ালে ২১ হাজার ৯শ কোটি টাকা পাচার
অনলাইন ডেস্ক :
প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:২৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস নেটওয়ার্ক বিকাশের ডিস্ট্রিবিউটরশিপ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক হুন্ডি ও অর্থপাচারের একটি সুসংগঠিত কাঠামো গড়ে ওঠার প্রমাণ পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জেন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামের একটি ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন সংঘটিত হয়েছে, যার বড় অংশ রাতের নির্দিষ্ট সময়ে অস্বাভাবিক গতিতে সম্পন্ন হয়েছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, জেন ইন্টারন্যাশনাল বিকাশের আঞ্চলিক ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে দেশের ১২ থেকে ১৪টি অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই নেটওয়ার্কের আওতায় থাকা ১১৮টি এজেন্টের লেনদেন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতিদিন রাত ১২টার পর থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত প্রতি তিন মিনিট পরপর বড় অঙ্কের ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউট সংঘটিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ধরণের লেনদেন সাধারণ গ্রাহকসেবা বা বাণিজ্যিক কার্যক্রমের স্বাভাবিক আচরণের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিকাশের বিরুদ্ধে বিএফআইইউ এর বিস্তারিত প্রতিবেদনটি প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
সূত্রমতে, বিএফআইইউ তাদের নিজস্ব অনুসন্ধানে সন্দেহজন লেনদেনের তথ্য পাওয়ার পর তা অধিকতর অনুসন্ধানের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) জমা দেওয়া হয়। সিআইডি প্রাথমিক তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে এবং অধিকতর তদন্তে কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিষয়টি স্বীকার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের দায়িত্বশিল কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে বিকাশের অর্থ পাচার ও হন্ডি কারবারে জড়িত থাকার প্রমান পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে অধিক তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের কারনে এখনই বিস্তারিত প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিএফআইইউ এর তথ্য অনুযায়ী, জেন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ২০১৩ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে আমদানি, রপ্তানি, বিতরণ ও সরবরাহ ক্যাটাগরিতে ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ করে। ট্রেড লাইসেন্সে মালিক হিসেবে বাংলাদেশি নাগরিক মো. আবদুল কাইউম তসলিমের নাম উল্লেখ থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিক বা সুবিধাভোগী হিসেবে মালয়েশিয়ান নাগরিক ডা. সিরাজুদ্দিন বিন বদরুদ্দিন ও মহসিন বিন বদরুদ্দিনের নাম উঠে আসে। তারা যথাক্রমে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জেন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড বিকাশ লিমিটেডের আঞ্চলিক ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে বাংলাদেশের ১২ থেকে ১৪টি অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ডিস্ট্রিবিউটরশিপ নেটওয়ার্কের আওতায় থাকা এজেন্টদের লেনদেন বিশ্লেষণ করে ব্যাপক অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করা হয়েছে, যা প্রচলিত মোবাইল আর্থিক সেবার স্বাভাবিক কার্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গোয়েন্দা সংস্থার বিশ্লেষণে চারটি নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ নির্দেশক ব্যবহার করা হয়। এগুলো হলো-উচ্চমাত্রার ক্যাশ-ইন লেনদেন, প্রতি মিনিটে তিনবার বা তার বেশি লেনদেন, রাত ১২টা থেকে সকাল ৫টার মধ্যে সংঘটিত লেনদেন এবং ১৫ হাজার টাকা বা তার বেশি অঙ্কের ঘনঘন লেনদেন। এসব নির্দেশকের আলোকে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরের লেনদেন পর্যালোচনা করা হয়। পর্যালোচনায় দেখা যায়, জেন ইন্টারন্যাশনালের আওতাধীন অন্তত ১১৮টি বিকাশ এজেন্টের লেনদেন হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে বলে প্রতীয়মান হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব এজেন্টের লেনদেন প্যাটার্নে রাতের বেলা ধারাবাহিক ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউট, স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক ট্রানজাকশন এবং প্রায় সমপরিমাণ অর্থ জমা ও উত্তোলনের চিত্র পাওয়া যায়। এই ধরনের লেনদেন সাধারণ গ্রাহকসেবা বা ব্যবসায়িক লেনদেনের তুলনায় অস্বাভাবিক এবং হুন্ডিভিত্তিক সমন্বিত অর্থপ্রবাহের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জড়িত আরও ছয় প্রতিষ্ঠানঃ শুধু জেন ইন্টারন্যাশনাল নয়, এই ডিস্ট্রিবিউটরের সঙ্গে সম্পৃক্ত আরও ছয়টি প্রতিষ্ঠানের নামও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠান হলো সেলিগ্রা সার্ভিসেস লিমিটেড, কমপিউগেটস ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেড, ডিনস রিটেইল লিমিটেড, আইডিই ডিজাইন লিমিটেড, তেলেগ্রা লিমিটেড এবং এমএম সার্ভিসেস লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স বিভিন্ন বাংলাদেশি নাগরিকের নামে ইস্যু করা হলেও চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে একই দুই মালয়েশিয়ান নাগরিক- ডা. সিরাজুদ্দিন বিন বদরুদ্দিন ও মহসিন বিন বদরুদ্দিন-এর নাম পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সিরাজুদ্দিন বিন বদরুদ্দিন ২০০৫ সালে তেলেগ্রা লিমিটেড ও এমএম সার্ভিসেস লিমিটেড এবং ২০০৬ সালে কমপিউগেটস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড সৃষ্টি ও পরিচালনা করেন। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিজ নামে ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ না করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক বা কর্মচারীদের নামে লাইসেন্স নেওয়া হয়। এমনকি জেন ইন্টারন্যাশনালের ট্রেড লাইসেন্সও একজন বাংলাদেশি কর্মচারীর নামে গ্রহণ করা হয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এই পদ্ধতিকে প্রকৃত মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ আড়াল করার কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
২১ হাজার কোটির সন্দেহজনক লেনদেনঃ ব্যাংকিং লেনদেন বিশ্লেষণেও ব্যাপক অস্বাভাবিকতা উঠে এসেছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, সিরাজুদ্দিন বিন বদরুদ্দিন ও মহসিন বিন বদরুদ্দিন এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে বাংলাদেশে বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংকে মোট ১৩৩টি ব্যাংক হিসাব পরিচালিত হয়েছে। এর মধ্যে চলতি, এসএনডি ও সিসি হিসাবসহ অন্তত ৪৩টি হিসাব বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। ২০১২ সাল থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এসব হিসাবে প্রায় ২১ হাজার ৯৭৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা জমা এবং প্রায় সমপরিমাণ অর্থ উত্তোলনের নজির পাওয়া যায়। জমা ও উত্তোলনের অঙ্ক প্রায় সমান হওয়ায় রাউন্ড ট্রিপিং বা সমন্বিত অর্থপ্রবাহের আলামত থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
একই ঠিকানায় ১০৮ প্রতিষ্ঠানঃ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জেন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের শেয়ার মালিকানার বড় অংশ ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত জেটলাইট ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের হাতে রয়েছে। ওপেন সোর্স অনুসন্ধানে জানা যায়, জেটলাইট ইনভেস্টমেন্টের নিবন্ধিত ঠিকানায় আরও অন্তত ১০৮টি কোম্পানি নিবন্ধিত রয়েছে। আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসের (আইসিআইজে) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পানামা পেপারস–সংক্রান্ত তথ্যে ওই ঠিকানার উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে জেটলাইট ইনভেস্টমেন্টকে একটি সম্ভাব্য শেল কোম্পানি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিকাশের পাওনা হুন্ডিতে পরিশোধে সন্দেহঃ বিকাশ লিমিটেড ও জেন ইন্টারন্যাশনালের মধ্যে ২০১২ সালের ১৮ জুলাই ডিস্ট্রিবিউটরশিপ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী জেন ইন্টারন্যাশনালকে ২০১৫ সালের মধ্যে সিকিউরিটি ডিপোজিট হিসেবে ১১ কোটি ২৭ লাখ টাকা জমা দেওয়ার কথা ছিল। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারহোল্ডার মেনাঙ্গ রিসোর্সেস এসডিএন বিএইচডি ও জেটলাইট ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে মাত্র তিনটি রেমিট্যান্স লেনদেনে মোট ২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা বাংলাদেশে আনা হয়। বাকি অর্থ স্থানীয় উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও সেই উৎস সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই অর্থ অবৈধ চ্যানেলে বাংলাদেশে প্রবেশ করে থাকতে পারে এবং হুন্ডি লেনদেনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মালয়েশিয়ায়ও সন্দেহজনক লেনদেনঃ মালয়েশিয়ার ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট থেকে প্রাপ্ত তথ্যেও সন্দেহজনক চিত্র উঠে এসেছে। সিরাজুদ্দিন বিন বদরুদ্দিনের নামে মালয়েশিয়ার সিআইএমবি ব্যাংকে পরিচালিত হিসাবে দেশটির বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল পরিমাণ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত নগদে জমা হয়। ওই হিসাবে একাধিক বাংলাদেশি নাগরিক ‘গিফট’ হিসেবে অর্থ জমা দিয়েছেন বলে লেনদেনের সময় ঘোষণা করা হয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা জমা এবং তার সমপরিমাণ অর্থ বাংলাদেশে স্থানীয় মুদ্রায় পরিশোধ করার একটি সমন্বিত হুন্ডি ব্যবস্থার আলামত এতে থাকতে পারে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সিরাজুদ্দিন বিন বদরুদ্দিন ও মহসিন বিন বদরুদ্দিনের নামে মালয়েশিয়ায় অন্তত ১০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোতেও সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
বিএফআইইউর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বিকাশের মতো বৃহৎ মোবাইল আর্থিক সেবা নেটওয়ার্কে এ ধরনের ডিস্ট্রিবিউটর ও এজেন্ট পর্যায়ের লেনদেন শুধু অর্থপাচারের ঝুঁকিই নয়, বরং সামগ্রিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ধরনের হুমকি তৈরি করে। ডিস্ট্রিবিউটর নির্বাচন প্রক্রিয়া, বেনিফিশিয়ারি ওনারশিপ যাচাই, সিকিউরিটি ডিপোজিটের অর্থের উৎস নির্ধারণ এবং এজেন্ট পর্যায়ের লেনদেন নজরদারির কার্যকারিতা নিয়েও প্রতিবেদনে একাধিক গুরুতর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিকাশের হেড অব কমিউনিকেশনস (জনসংযোগ বিভাগের প্রধান) শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। বিস্তারিত জেনে পরে জানানো হবে।



