গ্যাস সিলিন্ডারের তীব্র সংকট, দ্বিগুণ দামেও মিলছে না
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৫৭ এএম
প্রতিবছর শীত মৌসুমে আবাসিক এলাকায় সরকারি গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বেসরকারি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চাহিদা বাড়ে। সাধারণত এতে এলপিজির দামে সামান্য চাপ তৈরি হয়। তবে চলতি শীতে সেই চাপ রূপ নিয়েছে নৈরাজ্যে। সরকার নির্ধারিত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা হলেও বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকার বেশি দামে। কোথাও আবার অতিরিক্ত দাম দিয়েও সিলিন্ডার পাচ্ছেন না ভোক্তারা।
আমদানিকারক ও অপারেটররা বলছেন, এবারের সংকটের পেছনে রয়েছে মূলত দুটি কারণ। প্রথমত, শীতের কারণে সাপ্লাই গ্যাস কমে যাওয়ায় এলপিজির চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। সাধারণত বছরে এলপিজির চাহিদা ৫ থেকে ৭ শতাংশ বাড়লেও এ বছর তা আরও বেশি। দ্বিতীয় ও বড় কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করছেন জাহাজের সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়া, যার ফলে এলপিজি আমদানিতে মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব)-এর সভাপতি ও ডেলটা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, শীত মৌসুমে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির চাহিদা বাড়ে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে জাহাজের সংকট ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি। তবে তিনি দাবি করেন, তাদের সংগঠনের কোনো সদস্য সরকার নির্ধারিত দামের বাইরে এলপিজি বিক্রি করছে না। খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামের বিষয়টি সরকারের দেখার কথা।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, এলপিজি আমদানিতে সাময়িক সমস্যা তৈরি হয়েছে, যার মূল কারণ জাহাজের সংকট। তিনি জানান, দেশে মাসিক এলপিজির চাহিদা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার টন হলেও গত ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে মাত্র ৯০ হাজার টন। ফলে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তবে দ্রুত সংকট কাটিয়ে ওঠার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এলপিজি আমদানির পর তা বিভিন্ন কোম্পানি প্রক্রিয়াজাত করে সিলিন্ডারে ভরে ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে সরবরাহ করে। সেখান থেকে পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে তা ভোক্তার হাতে পৌঁছায়। এই দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে অস্বাভাবিক মুনাফা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
গত ডিসেম্বর মাসে বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৪ টাকা নির্ধারণ করলেও বর্তমানে অনেক এলাকায় তা ২ হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ভোক্তারা বলছেন, পরিবহন খরচ যোগ করলে দাম ১ হাজার ৪৫০ টাকা পর্যন্ত যৌক্তিক হতে পারে, কিন্তু বর্তমান বাজারদর সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক।
রাজধানীর মানিকনগরের গৃহিণী মারজানা বেগম বলেন, বাসায় গ্যাসের লাইন থাকলেও পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় তাকে প্রতি মাসে এলপিজি ব্যবহার করতে হয়। সম্প্রতি একটি সিলিন্ডার অর্ডার দিলে সরবরাহকারী ২ হাজার টাকা দাবি করেন। অনেক জায়গায় খোঁজ নিয়েও কম দামে পাননি তিনি।
লোয়াবের তথ্যমতে, নিয়মিত এলপিজি পরিবহনে ব্যবহৃত ২৯টি জাহাজ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং চাহিদা অনুযায়ী জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। গত নভেম্বর পর্যন্ত যেখানে গড়ে মাসে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হতো, সেখানে ডিসেম্বরে আমদানি কমে দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার টনে। অর্থাৎ এক মাসেই আমদানি কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
এদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এলপিজির এই মূল্যবৃদ্ধিকে অযৌক্তিক ও নৈরাজ্যমূলক বলে অভিহিত করেছে। সংগঠনটির জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, চাহিদা বাড়ার অজুহাতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সরকার নির্ধারিত দামের অনেক বেশি নিচ্ছেন। আমদানিকারক ও পরিবেশকদের কারসাজির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি। তার অভিযোগ, বিইআরসি দাম নির্ধারণ করলেও কার্যকর তদারকির অভাবে তা বাস্তবে মানা হচ্ছে না।
আমদানিকারকদের সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্টেই সম্ভাব্য এলপিজি সংকটের বিষয়টি সরকারকে জানানো হয়েছিল। সে সময় লোয়াব জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে জানায়, জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর কয়েকটি কোম্পানি এলপিজি আমদানি বন্ধ করে দেয়। আমদানি ও বিতরণ সক্ষমতা বাড়াতে একাধিক কোম্পানি অনুমতির আবেদন করলেও এখনো কার্যকর সিদ্ধান্ত আসেনি। এমনকি ডেলটা এলপিজির বোতলজাতকরণ ক্ষমতা বাড়ানোর আবেদন গত নভেম্বরে বাতিল করা হয়।
আজ এলপিজির দাম নির্ধারণে বৈঠক
চলতি জানুয়ারি মাসের জন্য এলপিজির দাম নির্ধারণে আজ রোববার বৈঠকে বসছে বিইআরসি। সংস্থাটি জানিয়েছে, সৌদি আরামকোর ঘোষিত জানুয়ারির সৌদি সিপি অনুযায়ী এলপিজির দাম সমন্বয় করা হবে। বিকেল ৩টায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন দাম ঘোষণা করা হবে।
এর আগে ডিসেম্বরে বিভিন্ন ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা থেকে শুরু করে ৪ হাজার ৬৯৯ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল।



